ধর্ষণ: মামলা করতে দেরি হলে সমস্যা কোথায়?

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় দেখা যায়, ধর্ষণে অভিযোগে ঘটনার দীর্ঘদিন পরে মামলা দায়ের করা হয়। গতকালই বাংলাদেশে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা তারই একজন ঊর্ধ্বতন সহকর্মীর বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষনের অভিযোগ তুলেছেন।
দুজনে বিদেশে কর্মরত অবস্থায় প্রায় দুই বছর আগে এবং পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসার পর এই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে বেশি দেরি হলে তদন্ত এবং প্রমাণ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়।
মামলায় দেরি হলে সমস্যা কোথায়?
ধর্ষণের মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফরেনসিক এভিডেন্স, যেটি আসে ভিকটিমের মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে।
সেজন্য ঘটনার পর অতিদ্রুত অভিযোগ দায়ের এবং মেডিকেল টেস্টের পরামর্শ দেয়া হয় ভিকটিমদের।
নারী নির্যাতনের বিভিন্ন মামলা নিয়ে আদালতে লড়েছেন আইনজীবী আইনুন নাহার।
তিনি বলেন, ধর্ষণের কিছু আলামত থাকে। মেডিকেল টেস্ট করাতে দেরি হলে আলামত নষ্ট হয়ে যায়।
আদালত সাজা দেয় সাক্ষ্য-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে। তবে আইনের দৃষ্টিতে পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং প্রমাণ বলে একটি বিষয় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইনুন নাহার।
এর মাধ্যমেও অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব বলে তিনি বলেন।
ধর্ষনের পুরনো ঘটনার তদন্ত করা পুলিশের জন্য কঠিন হলেও সেটা অসম্ভব নয়।
তদন্তকারীরা কতটা দক্ষতার সাথে তদন্ত করে আদালতের সামনে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভিকটিমের শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অপরাধীর সাজা দেয়া সহজ হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান।
"ফরেনসিক এভিডেন্সকে বলা যায় কনক্লুসিভ প্রুফ। অন্য কিছু দিয়ে প্রমাণ করার চাইতে ফরেনসিক রিপোর্ট দিয়ে অপরাধ প্রমাণ করা সহজ হয়ে যায়। মামলাটা নিষ্পত্তি করতেও সহজ হয়ে যায়," বলেন মি. রহমান।
তবে যে কোন অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে ফরেনসিক এভিডেন্স একমাত্র বিষয় নয় বলে উল্লেখ করেন পুলিশের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে অপরাধের ধারাবাহিকতা সাজিয়ে বিশ্বাসযোগ্য-ভাবে আদালতের সামনে উপস্থাপন করা যায়। এক্ষেত্রে পুলিশকে অনেক দক্ষতার পরিচয় দিতে হয় বলে উল্লেখ করেন মি. রহমান।

ছবির উৎস, Getty Images
অভিযোগ দেরিতে আসে কেন?
বাংলাদেশে ধর্ষণের অভিযোগে যত মামলা হয়, তার মধ্যে সাজা হয় হাতে গোনা কিছু।
বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসাবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে এই সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের।
এই গবেষণাটি পরিচালনার জন্য সংস্থাটির তরফ থেকে থানা, হাসপাতাল এবং আদালত - এ তিনটি জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা।
তার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, নারীদের অনেকে জানেনই না যে ধর্ষণের শিকার হলে কিভাবে অগ্রসর হতে হবে। তাছাড়া শারীরিক এবং মানসিক ধকল সামাল দিতে তার সময়ের প্রয়োজন হয়। সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন।
"একজন রেইপ ভিকটিম শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকে। ভিকটিমের পরিবার বিষয়টি প্রকাশ করতে চায়না। তারা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চায়," বলেন অধ্যাপক রেজিনা।
"মেয়েটা কি চায় না যে ধর্ষকের শাস্তি হোক? নিশ্চয়ই চায়। কিন্তু সে তার পরিবারের কথা চিন্তা করে। তখন ব্যাপারটা তার চেপে যেতে হয়।"

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং আইনজীবীরা বলছেন, অপরাধ কখনো পুরনো হয়ে যায় না।
ভিকটিম চাইলে যে কোন সময় অভিযোগ সামনে আনতে পারেন।
তবে ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে নারীরা যাতে দ্রুত আইনের আশ্রয় নিতে পারেন সেজন্য বাংলাদেশে বিভাগীয় শহরগুলোতে পুলিশের একটি বিভাগ রয়েছে যেটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার।
সেজন্য ঘটনার পরপরই দ্রুত অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দিচ্ছেন কর্মকর্তারা।




