বাংলাদেশে গ্যাস কূপ খননে বিদেশি কোম্পানির দরকার হয় কেন

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রডাকশন কোম্পানি বা বাপেক্স বাংলাদেশের সিলেটের জকিগঞ্জে আরও একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে যা দেশের ২৮তম গ্যাস ক্ষেত্র এবং সবকিছু ঠিক থাকলে এ কূপ থেকে ৪৮বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা যাবে, যার টাকার মূল্য প্রায় ১২৭৬ কোটি টাকা।

বাপেক্স ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অনেকে বলছেন, দেশের স্থলভাগে গ্যাস কূপ খনন ও অনুসন্ধানের জন্য এখন বাপেক্সই যথেষ্ট। কিন্তু তারপরেও এ খাতে বিদেশি কোম্পানিকে কেন ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন।

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বাপেক্স সফল হচ্ছে এটি ঠিক। কিন্তু তিন হাজার মিটারের নীচে খনন বা হাই প্রেশার জোনে কাজ তো বাপেক্স করতে পারছে না।

"গ্যাসের চাহিদা অনেকগুণ বেড়ে গেছে শিল্প বাড়ার কারণে। বাপেক্সের খনন রিগগুলো সব কাজে অকুপাইড হয়ে আছে। আরও যেখানে দরকার হচ্ছে সেখানে বাপেক্সকে অন্যদের সহায়তা নিতে হচ্ছে, যেমন ভোলায় গ্যাজপ্রম কাজ করছে। আবার অফশোরে অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সহায়তা নিতে হচ্ছে।"

বাংলাদেশে এর আগে দেশে মোট ২৭টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয়েছিলো যেগুলোর মোট মজুদ ২৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং এর মধ্যে প্রায় বিশ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহার করা হয়েছে বলে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে।

বাপেক্স বলছে, তারা দেশের সর্বত্রই অনুসন্ধান চালাবে এবং জরিপে পাওয়া গেলে যে কোন জায়গা থেকেই গ্যাস উত্তোলনের জন্য কূপ খননের সক্ষমতা তাদের আছে।

"আমাদের জরিপ করা থেকে উত্তোলন পর্যন্ত সব কাজ করার প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লোকবল এবং দক্ষতাও আমাদের আছে। আমাদের যেখানে কাজ করতে বলা হবে সেখানে এককভাবেই এটি করতে সক্ষম। তবে অফশোরে কাজ করতে আমাদের আরও প্রস্তুত হতে হবে," বলছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

সংস্থাটি মূলত জ্বালানী বিভাগের আওতায় থাকা একটি কোম্পানি এবং এর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ মূহুর্তে ১২টি অনুসন্ধান কূপ, ১৭টি উন্নয়ন কূপ, নয়টি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র এবং সাতটি উৎপাদনক্ষম গ্যাসক্ষেত্র এই কোম্পানির আছে।

তবে বাপেক্সকে কতটা কাজ করতে দেয়া হয় তা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন উঠে সরকারের বাইরে থেকে।

বিশেষজ্ঞরাও অনেকে বলেন যে বাপেক্সকে দিয়ে আরও কাজ করানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও 'নানা স্বার্থে' বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়।

তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর জাতীয় রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলছেন, সরকার চাইলে বাপেক্সের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার আরও উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশের গ্যাস কূপ খননের সব কাজ এই সংস্থাকে দিতে পারে কারণ তাদের দক্ষতা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।

"শেভরন ও গ্যাজপ্রমের মতো কোম্পানি এখানে আছে। নতুন করে ভারত ও চীনের কোম্পানি ছাড়াও জাপানও এ খাতে আসতে চাইছে। অথচ বাপেক্সকে দিয়েই এগুলো করানো সম্ভব," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১০৮টি কূপ খননের একটি পরিকল্পনা ছিলো বাপেক্সের। তবে বিস্ময়কর হলো এ পরিকল্পনায় থাকা বেশ কিছু কূপ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছে বিদেশি কোম্পানি।

আবারও কোন কোন জায়গায় সম্ভাবনা থাকার পরেও কূপ খননের অনুমতি চেয়ে পায়নি এই সংস্থাটি, যদিও কূপ খননের পর সে এখন গ্যাস না পাওয়া সরকারি অর্থের বড় অপচয়ের অভিযোগও বাপেক্সের বিরুদ্ধে কেউ কেউ করে থাকেন।

অবশ্য বাপেক্স বলছে, তারা যেসব কূপ খনন করেছে তার প্রতি তিনটির একটিতে গ্যাস পেয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে ভালো।

জানা গেছে, দেশে এখন ২৬টি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলছে এবং দুটি বিদেশি কোম্পানি একাধিক ব্লকে এই কাজে জড়িত আছে এবং বাপেক্সের চেয়ে তাদের ব্যয়ও অনেক বেশি।

আবার ২০০৮ সালে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিতে বিদেশি কোম্পানির জন্য গ্যাস রপ্তানিরও সুযোগ দেয়া হয়েছিলো।

যদিও পরে ২০১২ সালে যখন সমুদ্রের ব্লক ইজারা দেয়া হয় তখন রপ্তানির সুযোগ বন্ধ করা হয়। পরে ২০১৭ সালে আবার রপ্তানির সুযোগ দেয়া হয়।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

আবার ২০১০ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় কেয়ার্ন এনার্জি তাদের ইজারা প্রাপ্ত একটি গ্যাস ব্লক থেকে সরকারের বাইরে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ পেয়েছিলো।

এর আগে নব্বইয়ের দশকে বিদেশি কোম্পানিকে গ্যাস অনুসন্ধান কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনোকল সিলেটের মাগুরছড়ায় এবং ২০০৫ সালে কানাডার নাইকো ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাস কূপে কাজের সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। ২০১২ সালে রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম ১০টি কূপ খননের কাজ পায়।

আবার ২০১৭ সালে খাগড়াছড়ি, নোয়াখালি, জামালপুরে তিনটি কূপ খননের কাজ পায় আজারবাইজানের একটি কোম্পানি। পরে তারা সফল না হওয়ায় দু'বছর পর তাদের সাথে চুক্তিও বাতিল করে বাপেক্স।

অন্যদিকে বাপেক্স ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাজের ক্ষেত্রে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

বাপেক্স কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাজপ্রম একটি অনুসন্ধান কূপ খনে খরচ করছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। সেখানে জকিগঞ্জের কূপ খননে বাপেক্স ব্যয় করেছে ৭৫ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

জ্বালানী বিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলছেন, দেশের স্থলভাগে কূপ অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সই যথেষ্ট তবে সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য বিদেশি কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে।

"সমুদ্র বা পার্বত্য এলাকার মতো জটিল জায়গায় অনুসন্ধান ও কূপ খননের জন্য বিদেশি কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা হয়তো আছে। তবে স্থল ভাগে অন্য জায়গাগুলোতে বাপেক্স প্রতি বছর অন্তত তিনটি করে অনুসন্ধান কাজ চালাতে পারে। সে দক্ষতা তাদের আছে। কিন্তু তাদের দিয়ে নিয়মিত ভিত্তিতে সেটি করানো হয় না," মি. ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক কারণে হাই প্রেশার জোনেও অনুসন্ধানের কাজ বিদেশি অভিজ্ঞ কোম্পানিকে দিয়েই করাতে হবে কারণ বাপেক্সের এ ধরণের জোনে কাজ করার যথেষ্ট সক্ষমতা এখনো হয়নি।

তবে আনু মুহাম্মদ বলছেন, বাপেক্সকে যথাযথ গুরুত্ব দিলে যে কোন জায়গায় কাজ করার জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব স্বল্প সময়েই।

"বাপেক্সকে তো সেই গুরুত্বই দিচ্ছে না সরকার। এখানে বিদেশি কোম্পানিগুলো আসলে কারা কনসালটেন্সি করে, কারা এসব কোম্পানির হয়ে কাজ করে এগুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে কেন বিদেশি কোম্পানি নিয়ে এতো আগ্রহ।"