কোভিড ভ্যাক্সিন: করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মুখ থুবড়ে পড়া টিকা কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কী?

ছবির উৎস, NurPhoto
বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনই করোনাভাইরাসে শনাক্তের নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে দেশটির সরকার।
ছয় মাস ধরে যে টিকার কার্যক্রম চলছে, সেখানেও এখন পর্যন্ত অর্ধ কোটি মানুষকেও দুই ডোজের টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি।
ফেব্রুয়ারি মাসের সাত তারিখ থেকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু ছয় মাস পার হওয়ার পরেও এখন পর্যন্ত মাত্র পৌনে এক কোটি মানুষকে প্রথম ডোজের টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছে।
দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র আড়াই শতাংশ।
বিশেষ করে গ্রাম এলাকার অনেকই রয়ে গেছেন এই কর্মসূচির বাইরে।

ছবির উৎস, Getty Images
গ্রামের মানুষ কি জানেন কীভাবে টিকা পাবেন?
বিবিসির সঙ্গে আলাপে রাজবাড়ীর একটি গ্রামের বাসিন্দা তাহেরা সুলতানা বলছিলেন, টিকা নিতে কি করতে হবে, সেটাই তাদের জানা নেই।
তিনি বলছিলেন, ''আমরা তো গ্রামদেশে থাকি, আমরা তো জানি না কোথায় কি করতে হয়?
''টিকার জন্য কার কাছে যেতে হয়? কম্পিউটারে নাকি কিসব করতে হয়। আমরা তো সেগুলো কেউ বুঝি না।
''আমাদের গ্রামের কেউ টিকা নিছে বলেও শুনি নাই।''
এমনকি রাজধানী ঢাকার সব বাসিন্দাদেরও আনা যায়নি টিকার আওতায়।
শহরের মানুষের অভিজ্ঞতা কী?
ঢাকার একজন বাসিন্দা ফারহানা খালিদ বলছেন, তিনি অনেকবার চেষ্টার পরেও টিকা নেয়ার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেননি।
''আমি কয়েকবার নাম রেজিস্টার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি তো এখন চাকরি করি না, তাই যেভাবেই চেষ্টা করেছি, প্রতিবার উত্তর এসেছি, দুঃখিত, সম্ভব নয়।
''কিন্তু আমার চেয়ে বয়সে ছোট অনেকে টিকা পেয়েছে। সব মিলিয়ে একটু উদ্বেগে আছি।'' তিনি বলছেন।
কতজন টিকা পেয়েছেন?
টিকা দেয়ার জন্য প্রথমে ৫৫ বছর ঊর্ধ্ব বয়স নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফায় তা কমিয়ে সর্বশেষ ৩০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে আভাস দেয়া হয়েছে, শীঘ্রই তা কমিয়ে ১৮ বছর করা হবে।
দেশটিতে ১৮ বছর ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি, কিন্তু টিকার কার্যক্রম ছয়মাস ধরে চলার পরেও এখন পর্যন্ত দেশে দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন অর্ধ কোটিরও কম মানুষ।
সরকারের হাতে এখনো মজুত রয়েছে প্রায় এক কোটি টিকার ডোজ।
এমন পরিস্থিতিতে টিকাদান বাড়াতে সামনের মাসে দেশজুড়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ছবির উৎস, Getty Images
সরকারের টার্গেট কী?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মোঃ মিজানুর রহমান বলছেন, তারা অগাস্ট মাসের সাত তারিখ থেকে ক্যাম্পেইন শুরু করতে চান।
''মানুষ যাতে এতে সম্পৃক্ত হয়, তাদের উদ্বুদ্ধ করা, টিকার উপকারিতা তুলে ধরা, টিকা নেয়ার সুবিধা বোঝানোর চেষ্টা করা হবে,'' তিনি বলেন।
তিনি জানান, প্রতিমাসে অন্তত এক কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তাদের।
তবে অভিযোগ রয়েছে যে, টিকা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা এখনো কাটেনি।
অনেকেই নিবন্ধন করে টিকা নেয়ার বার্তা পাচ্ছেন না অথবা অসম্পূর্ণ বার্তা আসছে, টিকার সনদে ক্রুটি থাকছে।
তা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা আশা করছেন, সামনের বছরের শুরু নাগাদ দেশে অন্তত ২১ কোটি টিকা আসবে।
বাংলাদেশে এখন অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাশাপাশি ফাইজার, মর্ডানা ও সিনোফার্মের টিকা দেয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে দৈনিক দেয়া হচ্ছে সোয়া দুই লাখ টিকা।
এখন স্বাস্থ্য বিভাগ দৈনিক টিকা দেয়ার হার আরও বাড়াতে চাইছে।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, BBC BANGLA
টিকা কাভারেজ বাড়াবে কীভাবে?
জনস্বাস্থ্যবিদ ড. শারমীন ইয়াসমিন বলছে, টিকার কাভারেজ বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে বেশ কয়েকটি দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
''সরকার এককভাবে তো এটা করতে পারবে না। এখানে কম্যুনিটিকে কাজে লাগাতে হবে।'' তিনি বলছেন।
ড. ইয়াসমিন বলেন, অনেকের টিকার প্রতি অনীহা আছে, তারা টিকার উপকারিতা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না।
''তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতন করতে হবে। সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
প্রয়োজনে তাদের যাতায়াতে সহযোগিতা, টিকা না দিলে শাস্তি, প্রণোদনা হিসাবে উপহার দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে,'' বলছেন শারমীন ইয়াসমিন।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দৈনিক টিকা দেয়ার হার ১০ থেকে ১৫ লাখে নিয়ে যেতে হবে।








