পাকিস্তানে চীনের স্বার্থকে কারা লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, কেন চীনাদের টার্গেট করছে?

গোয়াদার বন্দর পাহারা দিচ্ছে পাকিস্তানি সৈন্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গোয়াদার বন্দর পাহারা দিচ্ছে পাকিস্তানী সৈন্য
    • Author, শাকিল আনোয়ার
    • Role, বিবিসি বাংলা

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজে যাওয়ার সময় সন্দেহজনক এক সন্ত্রাসী হামলায় বুধবার নয়জন চীনা প্রকৌশলী এবং শ্রমিকের নিহত হওয়ার খবর জানার পর চীন পাকিস্তানের কাছে তাদের ক্ষোভ এবং উদ্বেগ জানাতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি।

ঘটনাচক্রে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী আঞ্চলিক এক বৈঠকের সূত্রে বুধবার তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে ছিলেন। চীনের সরকারি মুখপাত্র হিসাবে পরিচিত গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, চীনা নাগরিকদের মৃত্যুর খবর জানার সাথে সাথে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বৈঠক করেন যেখানে মি. ওয়াং পাকিস্তানের মন্ত্রীকে বলেন যে সন্ত্রাস প্রমাণিত হলে অপরাধীদের ধরে চরম শাস্তি দিতে হবে।

“এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। চীন-পাকিস্তান সহযোগিতা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে,“ চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে লিখেছে গ্লোবাল টাইমস।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলা হলেও পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয় যে বাসটি সম্ভবত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে খাদে পড়ার পর তাতে বিস্ফোরণ হয়েছে।

চীনারা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় এবং চীন থেকে ঘটনা তদন্তে একটি দল পাকিস্তান যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

ওই ঘটনায় চীনের ভেতর সন্দেহ ঢোকা খুব অযৌক্তিক কিছু নয়, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে চীনা কোম্পানি, চীনা প্রকল্প এবং চীনা নাগরিকদের টার্গেট করে বেশ কতগুলো হামলা হয়েছে।

পাকিস্তানে চীনের রাষ্ট্রদূতও হামলার টার্গেট ছিলেন

এসব হামলার মধ্যে গোটা পাঁচেক হামলা ছিল বেশ বড় মাপের - যার মধ্যে দুটো হামলায় পাকিস্তানে চীনা রাষ্ট্রদূত এবং চীনের একটি কনস্যুলেটকে টার্গেট করা হয়।

এ বছর ২১শে এপ্রিল বালোচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটায় এক সফরের সময় চীনা রাষ্ট্রদূত নং রং এবং করাচীতে চীনা কনসাল জেনারেল যে হোটেল ওঠেন সেখানে এক সন্ত্রাসী হামলায় পাঁচজন মারা যায়। চীনা কূটনীতিকরা প্রাণে বেঁচে যান, কারণ ভাগ্যচক্রে হামলার সময় তারা হোটেলে ছিলেন না।

এর আগে, ২০১৮ সালের নভেম্বর করাচী শহরে চীনা কনস্যুলেটে বোমা হামলায় চারজন নিহত হয়।

কোয়েটার হোটেল

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ২১শে এপ্রিল কোয়েটায় চীনা রাষ্ট্রদূতের হোটেলে সন্ত্রাসী হামলায় পাঁচজন মারা যান, তবে তিনি তখন হোটেলে ছিলেন না

২০১৮ সালের অগাস্টে একজন আত্মঘাতী হামলাকারী বালোচিস্তানের দালবাদিনে চীনা প্রকৌশলীদের বহনকারী একটি বাসকে টার্গেট করেছিল। আর ২০১৯ সালের মে মাসে বালোচিস্তানেই চীনের তৈরি গোয়াদার সমুদ্র বন্দরের খুব কাছে পার্ল কন্টিনেন্টাল হোটেলে এক সন্ত্রাসী হামলা হয়, যাতে পাঁচজন মারা যায়।

গত বছর করাচীতে পাকিস্তানে স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনে হামলায় চারজন নিরাপত্তা রক্ষী মারা যায়। অনেকের ধারণা, করাচীতে ওই স্টক এক্সচেঞ্জের ৪০ শতাংশ মালিকানা চীনা তিনটি কোম্পানির হাতে রয়েছে, তাই সেটিকে টার্গেট করা হয়।

পাকিস্তানে চীনা স্বার্থকে টার্গেট করে এসব হামলার পেছন কারা?

চীনা নাগরিক, স্থাপনা বা কোম্পানিতে হামলার সিংহভাগ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে বালোচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। তবে কোয়েটার হোটেলে এপ্রিল মাসে হামলার দায় স্বীকার করে তেহরিকে তালেবান অব পাকিস্তান বা টিটিপি, যারা পাকিস্তানী তালেবান নামে পরিচিত।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. হাসান আসকারি রিজভী বলেন, পাকিস্তানে সন্ত্রাস ১০ বছর আগের তুলনায় কমলেও এখনও তা চলে যায়নি, এবং বিএলএ বা টিটিপি ছাড়াও ছোটোখাটো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও বিচ্ছিন্নভাবে এসব হামলার পেছনে রয়েছে।

“এদের মূল লক্ষ্য পাকিস্তানের সরকারকে বিব্রত করা। কখনও তারা নিজেদের এজেন্ডা মত কাজ করে, আবার কখনও বাইরের উস্কানিতে কাজ করে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা মহলের দৃঢ় বিশ্বাস যে অনেক হামলার পরিকল্পনা এবং নির্দেশ আসে দেশের বাইরে থেকে,“ বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. রিজভী।

কোথা থেকে বা কাদের কাছ থেকে চীনের স্বার্থকে টার্গেট করার নির্দেশ আসে? - এই প্রশ্নে তিনি বলেন, দুটো দেশ - যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত – চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বি আর আই) বিরুদ্ধে কথা বলছে।

পাকিস্তানের সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বলা হয় বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীীদের অন্যতম মদদ দাতা ভারতের গুপ্তচর সংস্থা 'র'। আফগানিস্তানে কান্দাহারের ভারতীয় কনস্যুলেট থেকে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) সাহায্য সহযোগিতার অনেক পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন করা হয় বলে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের বিশ্বাস।

এর পক্ষে তারা মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রমাণও হাজির করেন। যেমন, পাকিস্তানের কারাগারে ২০১৭ সাল থেকে আটক রয়েছেন এমন একজন ভারতীয় এক নাগরিক সম্পর্কে পাকিস্তানের দাবি যে তিনি ভারতীয় একজন গুপ্তচর, যাকে বালোচিস্তান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ৫০ বছর ধরে বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত ৫০ বছর ধরে বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে

মি রিজভী অবশ্য বলেন, বালোচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বহুদিন ধরেই আফগানিস্তান থেকে তৎপরতা চালিয়েছে যেটা, তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।

বালোচ ফ্যাক্টর

তবে বালোচিস্তান রাজ্য এবং বালোচ জনগোষ্ঠীর সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের এবং বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরোধ বহুদিনের।

আয়তনে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রাজ্য হলেও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে সবচেয়ে অনগ্রসর বালোচিস্তানে ১৯৭০ সাল থেকেই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদের সূচনা হয়। ১৯৭৩ সালে কঠোর এক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সেই বিদ্রোহ দমনের চেষ্টার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা সেখানে আরও জোরদার হয়েছে।

বালোচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মনে করে যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপেক) অংশ হিসাবে যেসব প্রকল্প হচ্ছে তাতে তাদের কোনো ফায়দা নেই, বরঞ্চ তাতে পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়ছে। বিএলএ-র অনেক নেতা প্রকাশ্যে সিপেক-কে প্রতিরোধের কথা বলেছেন।

চীনের উদ্বেগ সেখানেই, কারণ অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকে সিপেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্প পড়েছে বালোচিস্তানে - যার অন্যতম গোয়াদার গভীর সমুদ্র বন্দর।

গোয়াদার বন্দর এবং চীন

গোয়াদার বন্দরটি শুধু সিপেকের নয়, বরং চীনের পুরো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প, বিবিসি বাংলাকে বলেন কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী।

তিনি বলেন, “সিপেকের বিভিন্ন প্রকল্পে চীন মোট ৬২ বিলিয়ন ডলার (ছয় হাজার ২০০ কোটি) ডলার খরচ করবে। এর প্রায় সবটাই ঋণ। কিন্তু গোয়াদার সমুদ্র এবং গোয়াদার বিমানবন্দর চীন নিজের পয়সায় তৈরি করছে। ওই কয়েকশো' কোটি ডলার চীনের অনুদান।“

এর কারণ হিসেবে ড. আলী বলেন যে গোয়াদার বন্দরের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত গুরুত্ব চীনের কাছে অপরিসীম।

তাদের জ্বালানি নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য চীনকে প্রধানত নির্ভর করতে হয় মালাক্কা প্রণালীর ওপর। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী প্রায় ছয়শ মাইল দীর্ঘ এই জলপথের ওপর এখনও চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ নির্ভরশীল।

২০১৮ সালের নভেম্বর করাচী শহরে চীনা কনসুলেটে সন্ত্রাসী হামলা

ছবির উৎস, Anadolu Agency/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৮ সালের নভেম্বর করাচী শহরে চীনা কনস্যুলেটে সন্ত্রাসী হামলা হয়

চীন এই জলপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে উদগ্রীব, কারণ যুক্তরাষ্ট্র গত ১৫ বছর ধরে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যে চীনের সাথে সম্ভাব্য যেকোন সামরিক সংঘাতের শুরুতেই তারা মালাক্কা প্রণালী অবরোধ করে চীনের অর্থনীতির সর্বনাশ করার চেষ্টা করবে।

“এই কারণে চীন বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরি নিয়ে ভীষণভাবে উদগ্রীব। চীনের বিআরআই-এর মূল তাড়নাই সেটি, “বলেন ড. মাহমুদ আলী।

গোয়াদার বন্দর চীনকে তার সেই লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ সুবিধা দেবে। পারস্য উপসাগরের দেশগুলো থেকে পাকিস্তানের আরব সাগরের তীরের এই বন্দরের দূরত্ব বেশি নয়। এখানে তেল-গ্যাস আমদানি করে এনে ট্রেনে করে বা পাইপলাইন বসিয়ে চীন তা সহজেই তাদের পশ্চিমাঞ্চলে নিয়ে যেতে পারবে।

শুধু জ্বালানি নয়, তাদের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানির জন্য গোয়াদারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

ফলে বালোচিস্তানের গোয়াদার অঞ্চল এবং বিশেষ করে গোয়াদার শহর এবং বন্দর এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে চীন বিশেষভাবে চিন্তিত।

পশ্চিমা গোয়েন্দাদের বিশ্বাস যে চীন গোয়াদারের নিরাপত্তার জন্য সেখানে নৌঘাঁটি করবে এবং সেই পথে তারা এগুচ্ছে। কিন্তু ড. মাহমুদ আলী মনে করেন, গোয়াদার এবং সিপেকের নিরাপত্তার জন্য চীন এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানের ওপরই নির্ভর করছে।

“আমি মনে করি না চীন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরা নেবে। সেটা তাদের জাতীয় নীতির বিরোধী। তারা বরং পাকিস্তানকে চাপ দিচ্ছে যে নিরাপত্তার দায়িত্ব তোমাদের, তোমাদের কী সাহায্য দরকার আমাদের বলো, আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করবো।“

সিপেকের প্রকল্পগুলোর কাজ শুরুর পর থেকে সন্ত্রাস-বিরোধী তৎপরতায় চীন পাকিস্তানকে অর্থকড়ি, অস্ত্র এবং প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে।

পাকিস্তান কতটা ভরসা দিতে পারছে?

“আপনি যদি লাহোর বিমানবন্দরে নামেন, দেখবেন শুধু চীনাদের জন্য একটি নিরাপত্তা ডেস্ক রয়েছে। পাকিস্তানে নামার পর থেকে তাদের দেখে রাখা শুরু হয় ... সিপেক এবং চীনাদের জন্য ভিন্ন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে,“ বলেন ড. হাসান আসকারি রিজভী।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-য়ের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৯ সালে বেইজিং সফরের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-য়ের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

বছর দুয়েক আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিপেকের বিভিন্ন প্রকল্প এবং সেসব জায়গায় কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তায় ১৫ হাজার সদস্যের একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করে। মেজর জেনারেল পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এই ইউনিটের দায়িত্বে রয়েছেন।

গোয়াদার বন্দরের কাছে হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার পর বন্দরের মূল এলাকাটি উঁচু তারকাটা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। শুধু বন্দর এলাকাই নয়, পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনের এক রিপোর্ট অনুযায়ী গোয়াদার শহরের ২৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা তারকাটা দিয়ে ঘিরে ফেলার একটি প্রকল্প কেন্দ্রীয় সরকার হাতে নিয়েছে।

তবে তারকাটার বেড়া এবং ১৫ হাজার সৈন্য বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ৬২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ও শতশত চীনা কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি-না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে। কারণ বিশেষ এই সেনা ইউনিট গঠনের পরও সিপেক প্রকল্পে এবং চীনাদের টার্গেট করে হামলা হয়েছে।

চীন যে ভরসা পাচ্ছে না বুধবারের ঘটনার পর তা আবারও প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

তবে ড. রিজভী বলেন, সিপেক নিয়ে পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন ‍শুরুর আগেও পাকিস্তানের ভেতর সন্ত্রাসী তৎপরতার কথা চীনের অজানা ছিল না। মাঝেমধ্যে এসব হামলা নিয়ে তাদের অসন্তোষ ও প্রতিক্রিয়া একটি সীমার ভেতরে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

বালোচিস্তানে রাজনৈতিক মীমাংসা

গোয়াদার বন্দর বা সিপেকের বড় প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বালোচিস্তানে একটি রাজনৈতিক সমাধানের কথা নতুন করে উঠতে শুরু করেছে পাকিস্তানে।

গত ৫ই জুলাই গোয়্দার শহরে এক সফরে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন যে তিনি বালোচিস্তানের বিদ্রোহীদের সাথে কথা বলবেন।

এর দু'দিন পরই ৭ই জুলাই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে তিনি বালোচিস্তানের প্রয়াত বিদ্রোহী নেতা নওয়াব আকবর শাহবাজ খান বুগতির নাতি নবাবজাদা শাজাইন বুগতিকে তার বিশেষ সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত করেন।

এরও আগে গত মে মাসে ইমরান খান কোয়েটাতে গিয়ে বালোচিস্তানের বৈষম্য ঘোচাতে তার সরকারের অঙ্গীকারের কথা বলেন। বালোচিস্তানকে অবজ্ঞা করার জন্য আগের সরকারগুলোরও সমালোচনা করেন তিনি।

লাহোর মেট্রো সার্ভিস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লাহোর মেট্রো সার্ভিস, যেটি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের একটি প্রকল্প

ড. মাহমুদ আলী মনে করেন, চীনও বালোচিস্তানে রাজনৈতিক মীমাংসা সমর্থন করবে।

“চীন নিজেও জাতিগত অসন্তোষ-বিদ্রোহ মোকাবেলা করেছে, এখনও করছে। রাজনৈতিকভাবে এবং সেইসাথে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে সেই সমাধান তারা তিব্বতে করেছে, অন্যত্র করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানকেও চীন তেমন পরামর্শ দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।“

‘গোয়াদার হবে সিঙ্গাপুর‘

গোয়াদার বন্দর বালোচিস্তানের অর্থনীতির চেহারা আমূল বদলে দেবে বলে ইতিমধ্যেই প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে গোয়াদার হবে দক্ষিণ এশিয়ার সিংগাপুর বা দুবাই।

গোয়াদার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (জিডিএ) মহাপরিচালক শাহজেব খান কাকার ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের নির্মাণ ব্যবসায়ীদের সাথে এক বৈঠকে বলেন যে ২০৪০ সাল নাগাদ গোয়্দারের জিডিপি হবে ৩০ বিলিয়ন ডলার। শহরের জনসংখ্যা বর্তমানের ৮০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২০ লক্ষে, আর ১২ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

সিপেক বালোচিস্তানের সাধারণ মানুষের অবস্থা বদলে দেবে – এমনই একটি বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে এখন।

কিন্তু গত ৫০ বছরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে বালোচিস্তানের বিশাল জনগোষ্ঠীর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তাতে সরকারে কথায় তারা কতটা ভরসা করবে তা এখনও বলা শক্ত।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: