ইরানের এব্রাহিম রাইসি: কী এই নতুন প্রেসিডেন্টের পরিচয়

তেহরানে এব্রাহিম রাইসির নির্বাচনী প্রচারাভিযানে পোস্টার হাতে এক নারী ১৪ই জুন ২০২১

ছবির উৎস, ATTA KENARE/AFP

ছবির ক্যাপশান, তেহরানে এব্রাহিম রাইসির নির্বাচনী প্রচারাভিযান

ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা এব্রাহিম রাইসি।

ষাট বছর বয়সী মি. রাইসি নিজেকে তুলে ধরেছেন ইরানে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির শাসনামলে চলা দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হিসাবে।

তিনি দেশটির শীর্ষ বিচারপতি এবং তার মতাদর্শ অতি-রক্ষণশীল।

বহু ইরানি এবং মানবাধিকার কর্মী ১৯৮০র দশকে রাজনৈতিক বন্দীদের গণহত্যায় মি. রাইসির ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের কথা তুলছেন।

আরও পড়ুন:

মি. রাইসি (মাঝখানে) এবং বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি (ডান থেকে দ্বিতীয়) ২০২০এর একটি স্মরণ অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাচ্ছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনিকে

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, মি. রাইসি (মাঝখানে) এবং বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি (ডান থেকে দ্বিতীয়) ২০২০এর একটি স্মরণ অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাচ্ছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনিকে

কী তার পরিচয়?

এবাহ্রিম রাইসির জন্ম ইরানের দ্বিতীয় বড় শহর মাশাদে ১৯৬০ সালে। ইরানের পবিত্রতম শিয়া দরগাটি রয়েছে এই শহরে। মি. রাইসির বাবা ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা। এব্রাহিম রাইসির বয়স যখন পাঁচ তখন তার বাবা মারা যান।

শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি ইসলামের নবীর বংশধরদের মত কালো পাগড়ি পরেন। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি ১৫ বছর বয়সে পবিত্র কুম শহরে এক শিয়া মাদ্রাসায় যোগ দেন।

সেখানে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়, তিনি পশ্চিমা সমর্থিত শাহ-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেন।

অবশেষে ১৯৭৯ সালে আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ-এর শাসনের পতন ঘটে।

ইরানে ১৯৭৯এর বিপ্লবের সময় আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির ব্যানার হাতে এক শিয়া ধমীয় নেতা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৯র বিপ্লবের পর ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয় এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতোল্লা খোমেইনি

বিপ্লবের পর তিনি যোগ দেন বিচার বিভাগে এবং আয়াতোল্লা খামেনির কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে বেশ কয়েকটি শহরে কৌঁসুলির দায়িত্ব পালন করেন। আয়াতোল্লা খামেনি ১৯৮১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হন।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে মি. রাইসি তেহরানের ডেপুটি কৌঁসুলি নিযুক্ত হন।

যে চারজন বিচারককে নিয়ে ১৯৮৮ সালে "ঘাতক কমিটি" নামে পরিচিত হয়ে ওঠা গোপন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন সেই চারজনের একজন।

যে হাজার হাজার বন্দী তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইতোমধ্যেই জেল খাটছিলেন, ওই ট্রাইব্যুনাল তাদের "পুনর্বিচার" করে।

এদের বেশিরভাগই ছিলেন বামপন্থী বিরোধী দল মুজাহেদিন-ই-খাল্ক (এমইকে)র সদস্য। এই গোষ্ঠী পিপলস মুজাহেদিন অর্গানাইজেশন অফ ইরান বা পিএমওআই হিসাবেও পরিচিত ছিল।

ফ্রান্সে পিএমওআই এর প্রতিনিধিরা ১৯৮৮ সালে ইরানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক বন্দীর ছবি প্রদর্শন করে প্যারিসে অক্টোবর ২০১৯ সালে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, মি. রাইসি বলেন ১৯৮৮ সালের মৃত্যুদণ্ড আয়াতোল্লা খোমেইনির জারি করা ফতোয়া অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত ছিল। ফ্রান্সে পিএমওআই এর প্রতিনিধিরা ১৯৮৮ সালে ইরানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক বন্দীর ছবি প্রদর্শন করে প্যারিসে অক্টোবর ২০১৯ সালে

'প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধ'

ঠিক কতজনকে ওই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সেই সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলে, প্রায় ৫০০০ পুরুষ ও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল এবং অজ্ঞাত গণকবরে তাদের মাটি দেয়া হয় - যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে তারা তুলে ধরে।

ইসলামি এই প্রজাতন্ত্রের নেতারা ওই গণহত্যার কথা অস্বীকার করেন না। তবে সেইসব ঘটনার বিস্তারিত বা বৈধতার বিষয় তারা কখনও আলোচনা করেন না।

ওই মৃত্যুদণ্ডে তার ভূমিকার কথা মি. রাইসি বারবার অস্বীকার করেছন। তবে তিনি একথাও বলেছেন যে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির জারি করা ফতোয়ার কারণে ওই মৃত্যুদণ্ডাদেশ যুক্তিসঙ্গত ছিল।

পাঁচ বছর আগে মি. রাইসি, বিচার বিভাগের বেশ কয়েকজন সদস্য এবং তৎকালীন ডেপুটি সুপ্রিম নেতা আয়াতোল্লা হোসেইন আলি মন্তাযেরির মধ্যে ১৯৮৮ সালের এক বৈঠকের কথোপকথনের টেপ ফাঁস হয়। ওই টেপে মি. মন্তাযেরিকে বলতে শোনা যায় দণ্ডিতদের হত্যা "ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধ"। এর এক বছর পর আয়াতোল্লা খোমেইনির মৃত্যুর পর তার পূর্ব-নির্ধারিত উত্তরসূরী আয়াতোল্লা খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হবার পর মি. মন্তাযেরিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

ইরানের মাশাদে শিয়া ইমাম রেজার দরগা (২০১৩)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মি. রাইসি ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মাশাদে শিয়া ইমাম রেজার দরগার দায়িত্বে ছিলেন

বিশাল তহবিলের দায়িত্ব

তেহরানের কৌঁসুলির দায়িত্বে বসানো হয় মি. রাইসিকে, এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পরিদর্শক সংস্থার প্রধান হন, দেশটির বিচার বিভাগের প্রথম উপ-প্রধান পদে নিযুক্ত হন এবং ২০১৪ সালে ইরানের মহা কৌঁসুলি (প্রসিকিউটার জেনারেল) পদের দায়িত্ব পান।

দু বছর পর আয়াতোল্লা খামেনি ইরানের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্পদশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আসতান-ই কুদস্-ই রাজাভি দেখাশোনার সব দায়িত্ব তুলে দেন মি. রাইসির হাতে।

এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাশাদে অষ্টম শিয়া ইমাম রেজার দরগাটির রক্ষণাবেক্ষণ করে। এছাড়াও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের বহু দাতব্য এবং অন্যান্য সংস্থা পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের হাতে।

আমেরিকা বলছে নির্মাণকাজ, কৃষি, বিদ্যুত জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও আর্থিক ব্যবস্থাসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব এই সংস্থার হাতে রয়েছে। .

ইরানে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলির সদস্যরা - ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২১- মাঝখানে সভাপতি আহমাদ জান্নাতি এবং বামে মি. রাইসি

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, মি. রাইসি ইরানে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলির সহ সভাপতি। এই মণ্ডলি দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে থাকে

২০১৭ থেকেই নির্বাচনের মাঠে

মি. রাইসির ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছিল।

ওই নির্বাচনে আরেকজন ধর্মীয় নেতা হাসান রুহানি প্রথম দফার ভোটাভুটিতে ৫৭% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান।

মি. রাইসি নিজেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক যোদ্ধা হিসাবে তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু মি. রুহানি বলেন বিচার বিভাগের ডেপুটি প্রধান হিসাবে দুর্নীতির মামলা এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তিনি প্রায় কিছুই করেননি। মি. রাইসি ৩৮% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আসেন।

তবে ওই পরাজয় তার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারেনি এবং ২০১৯ সালে আয়াতোল্লা খামেনি তাকে দেশটির বিচার বিভাগের ক্ষমতাশালী পদে অধিষ্ঠিত করেন।

এর পরের সপ্তাহেই তিনি অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ মণ্ডলির ডেপুটি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দেশটির পরবর্তী সবোর্চ্চ নেতা নির্বাচন করে থাকে ৮৮ ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এই মণ্ডলি।

বিচার বিভাগের প্রধান হিসাবে মি. রাইসি কিছু সংস্কার সাধন করেছেন যা ফলে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা কমেছে এবং অবৈধ মাদক সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়েছে কম।

এরপরেও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরিসংখ্যানে বিশ্বে চীনের পরই স্থান ইরানের।

ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য বিচার বিভাগ নিরাপত্তা বিভাগের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করা অব্যাহত রেখেছে এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন বহু ইরানি এবং বিদেশে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি আছে এমন ইরানিদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে মামলা করেছে।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানে মি. রাইসির সমর্থকরা - ৬ই জুন ২০২১

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনী প্রচারণায় মি. রাইসি নিজেকে তুলে ধরেন দুর্নীতি বিরোধী এক যোদ্ধা হিসাবে

এব্রাহিম রাইসি যখন ২০২১এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থী হবার ঘোষণা দেন, তখন তিনি বলেন "রাজনীতির মঞ্চে তিনি একজন নিরপেক্ষ প্রার্থী। তিনি দেশটির নির্বাহী পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবেন এবং দেশটিতে দারিদ্র, দুর্নীতি, অবমাননা এবং বৈষম্য দূর করাই হবে তার লক্ষ্য।''

মি. রাইসির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। শুধু এটুকুই জানা যায় যে তার স্ত্রী জামিলে তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, এবং তাদের দুটি সন্তান আছে।

তার শ্বশুর আয়াতোল্লা আহমাদ আলামোলহোদা। তিনিও একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা এবং মাশাদে জুম্মার নামাজ তিনি পরিচালনা করেন।