মুসলিম হত্যার হুমকি: হরিয়ানায় এধরনের হুমকি দিয়ে পার পাচ্ছেন কট্টর হিন্দু নেতা

ছবির উৎস, Suraj Pal Amu
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতের হরিয়ানাতে গত মাসে একজন মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের খালাস করিয়ে আনার দাবিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক 'মহাপঞ্চায়েত' বা জনসমাবেশ আয়োজিত হয়েছে।
দিনদশেক আগে এরকমই একটি সমাবেশ থেকে মুসলিমদের হত্যা করার ডাক পর্যন্ত দেওয়া হয় - যে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ার পর হরিয়ানা পুলিশ এখন কিছুটা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে।
যিনি এই ডাক দিয়েছেন তিনি রাজপুতদের সংগঠন কার্নি সেনার শীর্ষ নেতা। নিজেই তিনি ভিডিওটি নিজস্ব ফেসবুক পেজে পোস্ট করেছেন। কিন্তু পুলিশ কাউকে এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করেনি।
ওই কট্টর হিন্দু নেতা সুরজ পাল আমুর ফেসবুক পেজের দাবি অনুসারে তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপিরও নানা পদে আছেন।
ওদিকে মহাপঞ্চায়েতগুলো থেকে ক্রমাগত হুমকি আসতে থাকায় রাজ্যের মুসলিম সমাজ আতঙ্কে সিঁটিয়ে আছেন।
বিবিসি বাংলার আরও খবর:

ছবির উৎস, Sunil Bainsla
গত মাসের ১৬ তারিখে হরিয়ানার খলিলপুর খেডা গ্রামের বাসিন্দা আসিফ খান তার বাড়ি থেকে একটু দূরে সোহনা শহরে ওষুধ কিনতে এসেছিলেন, তখন তার গ্রামেরই জনাকয়েক বাসিন্দা তাকে ঘিরে ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে।
পেশায় জিম ট্রেনার আসিফ খানের হত্যাকে পুলিশ অবশ্য লিঞ্চিংয়ের ঘটনা বলে মানতে চায়নি, তারা এটিকে ব্যক্তিগত শত্রুতার পরিণাম বলেই বর্ণনা করছে।
মামলার এফআইআরে মোট ১৪জনের নাম করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলে এলাকায় পরিচিত।
তাদের মুক্তির দাবিতে লকাডাউনের মধ্যেই রাজ্যে একের পর এক মহাপঞ্চায়েত ডাকা হতে থাকে।
গত ৩০শে মে নূহ-র কাছে মেওয়াট জেলার ইন্দ্রি গ্রামে এমনই একটি সমাবেশে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান থেকেও বহু মানুষ এসেছিলেন, কারফিউর মধ্যেও প্রায় ৫০ হাজার লোকের ভিড় হয়েছিল সেখানে।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
পরে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কার্নি সেনা সংগঠনের প্রধান সুরজ পাল আমু সেখানে বলছেন, "নিহত আসিফ খান আমাদের মেয়েদের, মা-বোনদের অশ্লীল ভিডিও বানাত, তো কেন ওকে মার্ডার করা হবে না?"
"ও ওর কর্মের সাজা পেয়েছে। ওদেরকে একশোবার মারব, মায়ের দুধ খেয়ে থাকলে আমাদের আটকাক দেখি!"
এই ধরনের চরম বিদ্বেষমূলক ভাষণের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে মিছিল, সমাবেশও করতে থাকে।
আরও পড়তে পারেন :
হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ভারতমাতা বাহিনীর সদস্যরা ও বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা সে সব ভিডিও ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে পোস্টও করতে থাকেন।
কার্নি সেনার প্রধানের নিজের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মহাপঞ্চায়েতে ভাষণই শুরু করছেন ''আপনারা কি সত্যিকারের হিন্দু না কি পাকিস্তানের বাচ্চা'' বলে।
এই ধরনের বিদ্বেষ ও আতঙ্ক ছড়ানোর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করে হরিয়ানার মুসলিম রক্ষা দল, প্রতিবাদে সরব হন হায়দ্রাবাদের এমপি আসাদুদ্দিন ওয়াইসি।

ছবির উৎস, Getty Images
নিহত আসিফ খানের পরিবারের পক্ষ থেকেও এফআইআর করা হয়।
নিহত আসিফের মা আইমান নিশো বলছিলেন, "আমার ছেলের কী দোষ ছিল? ওষুধ আনতে গিয়েছিল শুধু, ওকে ঘিরে ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলল।"
"এখন যারা ওকে মারল, তাদেরই ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে!"
দিল্লিতে সুপরিচিত অ্যাক্টিভিস্ট ফারাহ নাকভি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এখানে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি হিংসায় উসকানি দেওয়া হয়েছে।"
"এই বক্তাদের গ্রেপ্তার করার মতো আইনের কিন্তু দেশে অভাব নেই, কিন্তু তারপরও কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।"
"এগুলো কিন্তু হেইট স্পিচের চেয়েও মারাত্মক, কারণ এই মহাপঞ্চায়েতগুলো বা এই ভিডিওগুলোতে হত্যার অধিকারের ডাক দেওয়া হয়েছে - যা যুক্তি-বুদ্ধির অতীত!"

ছবির উৎস, Getty Images
মিস নাকভি মনে করেন, ভারত ক্রমশ এমন একটা পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইন আর সমান নয়।
মেওয়াটের মুসলিম নেতা ইশা মিও-ও তার সঙ্গে একমত।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "গরু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে আগে যেমন রাকবর খান বা পহেলু খানকে পিটিয়ে মারা হয়েছে কিংবা জুনেইদ খানকে মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকাতেই আর একটি নাম আসিফ।"
"অথচ তার হত্যার বিচারের জায়গায় আমরা দেখছি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হচ্ছে এদেশে শুধু একটি শ্রেণিরই থাকার, বলার অধিকার আছে - অন্যদের কিছু নেই।"
মেওয়াটের পুলিশ প্রধান রাজ্য জুড়ে এই সব বিতর্কিত মহাপঞ্চায়েত নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি, তিনি শুধু জানিয়েছেন আসিফ খানের হত্যাকান্ডের তদন্ত নিজস্ব গতিতেই এগোচ্ছে।








