আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইসরায়েল ও গাযার রক্তক্ষয়ী লড়াই নিয়ে আইন কী বলে
- Author, অধ্যাপক গুইয়েলমো ভারদিরামে
- Role, ওয়ার স্টাডিজ বিভাগ, কিংস কলেজ, লন্ডন
আধুনিক সময়ের প্রায় সব যুদ্ধের মতই ইসরায়েল এবং হামাসের লড়াইয়ের আইনগত নানা দিক নিয়ে নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। আগেও এমন বিতর্ক হয়েছে।
আত্মরক্ষা
গাযায় আগের সমস্ত সামরিক অভিযানের মত এবারও ইসরায়েল যুক্তি দিচ্ছে - আত্মরক্ষার্থে তাদের এই অভিযান।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারায় বলা আছে - আত্মরক্ষার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি।
এই মূল নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সশস্ত্র হামলা হলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার যে কোনো রাষ্ট্রেরই রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেই সশস্ত্র হামলার মাত্রা কত হলে কোনো রাষ্ট্র আইনগতভাবে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আঘাত করতে পারবে?
সিংহভাগ আন্তর্জাতিক আইনজীবী মনে করেন বেসামরিক এলাকায় রকেট ছুঁড়ে কোনো দেশের একটি অংশের স্বাভাবিক সামাজিক জীবন ব্যাহত করলে তা সশস্ত্র হামলা বলে বিবেচিত হবে এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারা তা সমর্থন করে।
কিন্তু কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তেমন আত্মরক্ষা আইনত বৈধ হবে তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কোনো সংঘাতে কে আত্মরক্ষা করছে এবং কে আগ্রাসী - তা নিয়ে পক্ষগুলো সবসময় বিতর্কে লিপ্ত হয়। ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি সংঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়।
এখানে ইসরায়েলি অবস্থানের সমালোচকরা দুটো আইনি বিধান তুলে ধরেন।
প্রথমতঃ কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে শুধুমাত্র অন্য একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। কিন্তু গাযার মত ভূখণ্ড যেটি কোনো রাষ্ট্র নয় সেখানে এই অধিকার প্রয়োগ করা যাবে না।
দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে গাযা এখনও ইসরায়েলের অধিকৃত একটি ভূখণ্ড কারণ এই ভূখণ্ডটির অনেক কিছু চারদিক থেকে ইসরায়েলই নিয়ন্ত্রণ করে।
ইসরায়েল অবশ্য এই যুক্তি মানে না। তাদের কথা: ২০০৫ সালে তারা গাযা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সেখানে তাদের কোনো অবস্থানই এখন নেই।
আত্মরক্ষা ‘ব্ল্যাংক চেক‘ নয়
তবে মোদ্দা কথা হলো, আত্মরক্ষার অধিকার কোনো ‘ব্ল্যাংক চেক‘ নয়। আন্তর্জাতিক আইনে আত্মরক্ষার অধিকার দেয়া হয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র উপযুক্ত প্রেক্ষাপটে তা প্রয়োগ করা যাবে।
উপরন্তু, যতটুকু শক্তি প্রয়োগ না করলেই নয় শুধুমাত্র ততটাই প্রয়োগ করা যাবে, অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগের মাত্রা হতে হবে সঙ্গতিপূর্ণ, আনুপাতিক এবং তাতে ভারসাম্য থাকতে হবে।
আত্মরক্ষার্থে আনুপাতিক সেই শক্তি-প্রয়োগ কতটা হওয়া উচিৎ তা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন - ‘চোখের বদলে চোখ‘ অর্থাৎ ‘একটি রকেটের বদলে আরেকটি রকেট‘ বা ‘একটি মৃত্যুর বদলে আরেকটি মৃত্যু‘ - এটাই বোধ হয় আনুপাতিক শক্তি-প্রয়োগ।
কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে এমন প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো এখতিয়ার কাউকে দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, কোনো হামলার বিপরীতে ‘প্রয়োজনীয় এবং আনুপাতিক‘ সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর শক্তি-প্রয়োগ আইনগতভাবে গ্রাহ্য হতে পারে। কিন্তু অতিমাত্রায় শক্তি-প্রয়োগ যে আত্মরক্ষা নিশ্চিত করে না তার অনেক প্রমাণ রয়েছে।
সশস্ত্র সংঘাতের আইন
শক্তি-প্রয়োগ এবং যুদ্ধ সম্পর্কিত যেসব আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে তার ভেতরেই আত্মরক্ষার কথা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ বা লড়াই শুরু হয়ে যাওয়ার পর কোন পক্ষ কতদূর যেতে পারবে, কী করতে পারবে আর পারবে না - আইনে তার আওতা বেঁধে দেয়া আছে। সেই যুদ্ধ দেশে-দেশে হতে পারে, দেশের অভ্যন্তরেও দুই পক্ষ বা বিভিন্ন পক্ষের হতে পারে।
কোন পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দেশ বা গোষ্ঠী শক্তি প্রয়োগ করছে সেই বিবেচনা এই আইন করবে না। যে কারণে বা প্রেক্ষাপটে কোনো পক্ষ শক্তি-প্রয়োগ করুক না কেন, যুদ্ধ সম্পর্কিত আইন তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। পেছনে যত যুক্তিই থাকুক, যুদ্ধ শুরুর পর শত্রুর চেয়ে শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার অধিকার বেশি থাকবে না।
আরো পড়তে পারেন:
সশস্ত্র সংঘাত সম্পর্কিত আইনে সংঘাত চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে (যেমন - বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা, যুদ্ধবন্দীর প্রতি আচরণ, অধিকৃত ভূমিতে দখলকারীর আচরণ) কী করা যাব আর কী করা যাবে না তার নির্দেশনা রয়েছে।
চারটি মুল নীতির ওপর ভিত্তি করে এসব আইন-কানুন বিধি-নিষেধ তৈরি করা হয়েছে - মানবতা ও সামরিক প্রয়োজনীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ও আনুপাতিক।
মানবিকতা এবং সামরিক প্রয়োজনীয়তা
অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা এবং জনজীবনে দুর্ভোগ এড়ানোর জন্য লড়াইয়ের পক্ষগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে এর বিরুদ্ধে যুক্তি হলো - সামরিক লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
ব্রিটেনের সেনাবাহিনী যে আইন অনুসরণ করে তাতে বলা আছে - ‘সামরিক প্রয়োজনীয়তা‘ কোনো রাষ্ট্রকে শক্তি-প্রয়োগের অধিকার দেয়। বলা আছে যে “সংঘাতের মূল লক্ষ্য অর্জনে - যেমন যতটা সম্ভব কম ব্যয়ে এবং কম প্রাণহানি করে শত্রুকে পুরোপুরি অথবা আংশিক পরাস্ত করতে অধিকতর শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে, এবং তা বৈধ।“
ফলে, অনেকেই এই যুক্তি দেন যে গাযায় ইসরায়েলের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ অর্থহীন কারণ এতে গাযা থেকে রকেট ছোঁড়া বন্ধ করা যায়নি।
কিন্তু সামরিক প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে ইসরায়েলের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয় যে ভবিষ্যতে রকেট হামলা নিরস্ত করতে এটা প্রয়োজন। তবে এটা অনস্বীকার্য যে আইনগত-ভাবে যদি সিদ্ধ হয়ও, কিছু সামরিক ব্যবস্থা “রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে, নৈতিকতার দিক থেকে এবং কৌশলগতভাবেও“ ক্ষতিকারক।
তবে যে কোনো ক্ষেত্রেই সামরিক প্রয়োজনীয়তার যুক্তি দিয়ে কিছু বিধিনিষেধ (যেমন - বেসামরিক লোকজনের নিরাপত্তা এবং কিছু সুনির্দিষ্ট স্থাপনাকে টার্গেট করা) অগ্রাহ্য করা যাবে না।
স্বাতন্ত্র্য এবং আনুপাতিক
যে কোনো সশস্ত্র সংঘাতের প্রধান একটি শর্ত হলো- লড়াই চলাকালে সবসময় পক্ষ এবং প্রতিপক্ষের যোদ্ধাদের যেন বোসামরিক লোকজনের থেকে আলাদা করা যায়। বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেট করা সবসময়ই নিষিদ্ধ। শুধু যোদ্ধা এবং তাদের সহযোগীদের এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে হামলার টার্গেট করা যেতে পারে।
বেসামরিক লোকজনকে আতঙ্কিত করা, হুমকি দেওয়া, সন্ত্রস্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে আইনে।
কিন্তু কখন একটি স্থাপনা বৈধ সামরিক সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে?
যুদ্ধের বৈধ টার্গেট সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আইনে বলা আছে, শত্রুপক্ষের “যেসব বস্তু বা স্থাপনা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় এবং যেটির পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস সামরিক সুবিধা নিশ্চিত করে“ সেটি বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ট্যাংক বা বিমান অথবা হামাসের রকেট লঞ্চার এই সংজ্ঞার ভেতরে পড়তে পারে। তবে দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধন করে এমন টার্গেট নিয়ে বিতর্ক বাঁধে। ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধে সার্বিয়ান টিভি স্টেশনের ওপর নেটো বিমান হামলার পর যেমন বিতর্ক হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন রকেট লঞ্চার বা গোলা-বারুদের ডিপো - যেগুলোকে টার্গেট করা আইনসিদ্ধ - সেগুলো যখন বেসামরিক স্থাপনা বা জনবসতির খুব কাছে থাকে।
গাযার মত ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকায় যে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেট করতে হলে এই সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য। এবং এসব ক্ষেত্রেই আনুপাতিক সামরিক ব্যবস্থার নীতির প্রশ্ন চলে আসে। আনুপাতিক সাড়ার বিষয়টি যুদ্ধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যখনই বেসামরিক লোকজনের জান এবং মালের ঝুঁকি তৈরি হয়, তখনই সংঘাতের পক্ষগুলোকে প্রাণহানি এবং সামরিক সুবিধা অর্জনের ভেতর ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আইনেও সেটাই বলা আছে।
আন্তর্জাতিক আদালতের একটি রায়ে আদালতের সাবেক প্রধান বিচারপতি রোজালিন হিগিনস্ লিখেছিলেন, “বৈধ একটি সামরিক টার্গেট যদি অতিমাত্রায় বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করে, সামরিক সুবিধা অর্জনের যুক্তিতে সেটিকে টার্গেট করা যাবে না।“
এমনকি হামলা চলার সময়ও যদি হামলাকারী বুঝতে পারে যে বেসামরিক মানুষজনের প্রতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাহলে তৎক্ষণাৎ হামলা বন্ধের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার ওপর।
ইসরায়েল যুক্তি দেয় যে কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের আগে তারা বেসামরিক লোকজনকে অগাম সতর্ক করেছে, কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক বলেন সেটি অনেকসময় অর্থহীন কারণ তাতে প্রাণহানি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় এবং মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ধ্বংস এড়ানো যায় না।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বেসামরিক এলাকায় সামরিক সাজ-সরঞ্জাম রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে হামাস মানুষের জান-মাল হুমকিতে ফেলছে। সেটা সত্যি হলেও, বেসামরিক লোকজনের জানমাল রক্ষায় দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ ইসরায়েলের নেই।
সমস্ত আধুনিক সেনাবাহিনীর মতো ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতেও আইন বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন যারা পরামর্শ দেন কোনটি বৈধ টার্গেট আর কোনটি নয়।
তবে কোনো লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করার বিষয়টি কতটা আইনসম্মত হবে তা নির্ভর করে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর - সত্যিই কি সেটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল? বেসামরিক প্রাণহানি এড়িয়ে সেটিকে আঘাত করা কি সম্ভব ছিল? ঐ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে হামলাকারী কতটুক জানতো বা তার জানা উচিৎ ছিল?
লড়াই চলাকালে বা লড়াই শেষ হওয়ার পরও এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া সহজ নয়।
মানবাধিকার
আন্তর্জাতিক আদালত বহুবার বায় দিয়েছে যে যুদ্ধের সময় মানবাধিকার আইন স্থগিত হয়ে যায়না। বলা হয়েছে, মানবাধিকার নিশ্চিত করতেই মূলত যুদ্ধ সম্পর্কিত আইন করা হয়েছে।
তবে বাস্তবে, বিশেষ করে লক্ষ্যবস্তু টার্গেট করার সিদ্ধান্তে তা কতটুক অনুসরণ করা হয় তা নিয়ে বিস্তর উদ্বেগ রয়ে গেছে।
ইসরায়েলের ভেতর আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যে সংঘাত চলছে তার বেলায় যুদ্ধ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন কার্যকরী হবে না। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ তখন বিবেচিত হবে মানবাধিকার আইনের আওতায়।
তবে প্রধান কথা হলো- যুদ্ধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন হয়তো যুদ্ধের বিভীষিকা কমানোর জন্য কিছুটা কাজ করতে পারে, কিন্তু এই আইন পুরোপুরি মেনে কোনো যুদ্ধ যদি কখনো হয়ও, তার পরিণতিও হবে ভয়াবহ।