কোভিড: করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যেভাবে কাজ করছে বাংলাদেশের পুলিশের সদস্যরা

গুলশান থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম
ছবির ক্যাপশান, গুলশান থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

ঢাকার গুলশান থানায় নিজের কক্ষে বসে থাকা ওসি-তদন্ত আমিনুল ইসলামের নিজের কক্ষে বেশিক্ষণ একা বসে থাকার সুযোগ নেই।

একটু পরে পরেই কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নানা মানুষ কাজের জন্য আসছেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর যেসব পেশার মানুষকে সম্মুখসারিতে থেকে কাজ করতে হয়েছে, তারই একটি পেশা পুলিশ।

আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, সাড়ে তের বছরের এই পেশাজীবনে করোনাভাইরাসের মতো আর কোন চ্যালেঞ্জ এতো দীর্ঘসময় তার মোকাবেলা করতে হয়নি।

''প্রতিদিনই আমাদের জনগণের বা মানুষের ক্লোজ কন্টাক্টে যেতে হচ্ছে। কাজটা আসলেই চ্যালেঞ্জিং। একটা আতঙ্ক তো সবসময়েই কাজ করে। তারপরেও আমরা বসে থাকতে পারি না বা বসে থাকার সুযোগও নেই।''

চব্বিশ ঘণ্টা কাজ

তিনি জানান, করোনাভাইরাসের এই পরিস্থিতি পুলিশকে এখন দুইটি ভাগে কাজ করতে হচ্ছে।

তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসাবে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, মামলার তদন্ত করা কাজটি করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট সরকারের নানা বিধিনিষেধ, নির্দেশনা বাস্তবায়নে শুরু থেকেই পুলিশকে মাঠ পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে গত মার্চ মাসে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সম্মুখসারিতে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জন সাধারণকে কোভিড থেকে সচেতনতা ও সুরক্ষায় বাধ্য করার কাজটিও করছে এই বাহিনী।

পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এই চ্যালেঞ্জের অংশ হতে হচ্ছে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও।

আরও পড়ুন:

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমিনুল ইসলাম

ছবির উৎস, Family Album of Aminul Islam

ছবির ক্যাপশান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, ''আমি যখন কাজ শেষে বাসায় ফিরে যাই, তখন কিন্তু প্রথমেই গোছল করে, স্যানিটাইজার ব্যবহার করে, ফ্রেশ হয়ে তারপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিশি। তারপরেও একটা ভয় থেকে যায় যে, আমি যদি ফ্লু-টাকে বহন করে বাসায় নিয়ে যাই, আমার মাধ্যমে তারাও আক্রান্ত হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে একটা অজানা আতঙ্ক সবসময়েই থেকে যায়।''

তারপরেও তার কাজের ক্ষেত্রে পরিবার কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলে তিনি বলছেন।

কিন্তু পরিবারের একজন সদস্য যখন এ ধরনের কাজে বের হয়, তখন অন্য সদস্যদের কী পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়?

আমিনুল ইসলামের স্ত্রী ডা. তানহা তাসনুভা বলছিলেন, ''প্রথমত আমরা সবাই তাকে নিয়ে চিন্তায় থাকি যেন তিনি সুস্থ থাকেন, তাকে যেন এই ভাইরাস অ্যাটাক না করে। দ্বিতীয়ত বাসায় আমার ছোট বাচ্চারা আছে, সঙ্গে আমার বয়স্ক বাবা-মা থাকেন। তাদের শারীরিক জটিলতা আছে। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরাও একটা চিন্তায় থাকি।''

দায়িত্ব পালনে আক্রান্ত

বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে র‍্যাব ও পুলিশ মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২০৭৫৩ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জনের।

পেশাগত কাজ করতে গিয়ে গত বছর নিজেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় মি. ইসলামকে। সুস্থ হওয়ার পরদিনই তাকে আবার কাজে ফিরে আসতে হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, ''গত সেপ্টেম্বরে কাজ করতে গিয়েই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলাম। সুস্থ হতে আমার ২০দিনের বেশি সময় লেগেছে। সুস্থ হয়ে কিন্তু আমি আবার আমার কাজে যোগদান করেছি এবং আগের মতোই আমার কাজ করছি।''

ডা. তানহা তাসনুভা
ছবির ক্যাপশান, ডা. তানহা তাসনুভা

সেই সময়টা পরিবারের সবার জন্য একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি গিয়েছিল বলে বলছেন তানহা তাসনুভা।

''এটা ওর যেমন কষ্ট, তেমনি আমার কষ্ট, আমার বাচ্চাদের জন্যও ভয়াবহ কষ্টের ছিল।'' তিনি বলছিলেন।

সেই সময় তিনি এবং তার একটি সন্তান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।

পুলিশ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলছেন, শুধু করোনাভাইরাসের ঝুঁকি নয়, সেটি নিয়ে কাজ করতে গিয়েও তাদের অন্য ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে হচ্ছে।

''অনেকে সরকারি নির্দেশনা, আমাদের অনুরোধ সহজেই মানে ন। আবার একাংশ মানুষ রয়েছেন, যারা স্বাস্থ্যবিধি মানতে চান না। তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে ঘোরাফেরা, মার্কেটে যাওয়া ইত্যাদি করছেন। তবে আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি,'' তিনি বলছেন।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এই রকম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সম্মুখসারিতে যাদের কাজ করতে হচ্ছে, কিছুদিন পরপর তাদের কাজ থেকে বিরতি দেয়ার সুযোগ দেয়া হলে সেটি তাদের নিজের ও পরিবারের ঝুঁকি হয়তো কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।