হেফাজতে ইসলাম: গ্রেপ্তার অভিযানের মুখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে সংগঠনটি

গত ২৬শে মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ করে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা। (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত ২৬শে মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ করে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা। (ফাইল ফটো)
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের নেতারা অভিযোগ করেছেন, এ পর্যন্ত তাদের সংগঠনের মামুনুল হকসহ নয় জন কেন্দ্রীয় নেতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রায় দু'শো নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে সংগঠনটির নেতাদের অনেকে বলেছেন, তাদের সংগঠনের নেতৃত্বে মুরব্বী এবং অরাজনৈতিক নেতা যারা আছেন, তাদের মাধ্যমে সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তারা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতার ঘটনাগুলোর ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কোন ছাড় না দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।

গত ২৬শে মার্চ থেকে তিন দিন ধরে হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং হাটহাজারীসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সহিংসতা হয়, সেই সহিংসতার ঘটনাগুলোর ব্যাপারে একশোটির মতো মামলা রয়েছে।

এছাড়াও ২০১৩ সালে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে যে সহিংসতা হয়েছিল, সেই মামলাগুলোও এখন সামনে আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদী বলেছেন, পুরো পরিস্থিতি হেফাজতকে সংকটে ফেলেছে। এখন তারা গ্রেপ্তারকৃতদের জন্য আইনী লড়াই চালাবেন এবং একইসাথে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন।

"গ্রেপ্তার যে অব্যাহত রাখা হয়েছে, তাতে কেন্দ্রীয় নেতা বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে গেছে। অনেককেতো ২০১৩ সালের মামলার আসামী বানাইছে। অনেককে বর্তমান মামলায় আসামী করা হয়েছে। সংকট হয়ে গেছে। এখন এগুলো আইনগতভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা চলতেছে" বলেন নুরুল ইসলাম জেহাদী।

রোববার আটকের সময় মামুনুল হক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোববার আটকের সময় মামুনুল হক

হেফাজতের নেতৃত্ব আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বললেও সংগঠনটির এখনকার নেতৃত্ব নিয়েই সরকার এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতিবাচক মনোভাব বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে।

সরকার বিরোধী বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলের নেতারা হেফাজতের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ।

তবে হেফাজতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাদের সংগঠনে ইসলামপন্থী বিভিন্ন দলের নেতা যারা আছেন, সরকারের সাথে আলোচনার চেষ্টায় তাদের সামনে আনা হচ্ছে না।

ঐ নেতা জানিয়েছেন, হেফাজতে তাদের মুরব্বী এবং অরাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে।

হেফাজতের এই নেতা আরও জানিয়েছেন, সংগঠনটির এমন কয়েকজন নেতা সোমবার পুলিশের উর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে দেখা করে সংকট সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে এই আলোচনা সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

হেফাজত নেতা নুরুল ইসলাম জেহাদী বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের আশা তারা করছেন।

"সার্বিক বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে একটা সুরাহা হবে বলে আশা করি। পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করে যদি একটা ভুল বোঝাবুঝির নিরসন হয়, সেটাতো খারাপ না," তিনি মন্তব্য করেন।

হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY

ছবির ক্যাপশান, হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

একদিকে সহিংসতার অভিযোগে গ্রেপ্তার অভিযানে হেফাজত নেতৃত্ব চাপে পড়েছে।

অন্যদিকে একটি রিসোর্টে একজন নারীকে নিয়ে মামুনুল হকের অবস্থানের ঘটনাও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে সহিংসতা এবং মামুনুল হকের ঘটনার দায় নিয়ে হেফাজতের ভিতরেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন বলে এর একাধিক নেতা জানিয়েছেন।

হেফাজতের নায়েবে আমীরের পদ থেকে কয়েকদিন আগে পদত্যাগ করেছেন আব্দুল্লাহ মো: হাসান। তিনি বলেছেন, সংগঠনটির কিছু নেতার ভুলের কারণে এখনকার সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন, জ্বালাও পোড়াও বা সহিংসতা সমর্থন না করার কারণে তিনি হেফাজত থেকে পদত্যাগ করেছেন।

"আপনারা নিশ্চয়ই দেখছেন যে, হরতাল-জ্বালাও-পোড়াও, এগুলোসহ সহিংসতা হয়েছে। এ কাজগুলো আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ এবং সমর্থন করি না। এটাতো (হেফাজত) একক কোন সংগঠন নয়। অনেকগুলো দল নিয়া এটা করা হইছিল। তো একেক জনের একক মত," বলেন আব্দুল্লাহ মো: হাসান।

তিনি আরও বলেছেন, "কিছু হুজুরদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজকে কিন্তু গোটা আলেম সমাজ এবং গোটা কওমী মাদ্রাসার ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে। আমরা কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করবো। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা জ্বালাও, পোড়াও, হরতাল হবে- এগুলোতো ঠিক না।"

এদিকে, সিনিয়র মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় সহিংসতা করা হয়েছে, এর স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকার আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

"রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং মানুষের জীবনের ওপর যেভাবে আক্রমণ করেছে, এসব ঘটনার পরে মামুনুল হককে উদ্ধার করার জন্যে তারা যেভাবে রাজপথে গাড়িতে আগুন দিয়েছে বা ভাঙচুর করেছে-এগুলো কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য না।

''কাজেই এই দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। সেজন্য আইনের আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যে ধ্বংস করা যায় না-এটি তাদের বোঝাতে হবে," বলেন ড: রাজ্জাক।

তিনি আরও বলেছেন, পরিস্থিতির বিবেচনায় হেফাজতের অনেক নেতাদের মধ্যেও চিন্তায় পরিবর্তন আসবে বলে তারা মনে করছেন।