মামুনুল হক: হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব সাত দিনের রিমাণ্ডে

হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক
ছবির ক্যাপশান, হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক

বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের আলোচিত নেতা মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের পরদিন আজ ঢাকার একটি আদালতে হাজির করে সাত দিনের পুলিশী রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে।

সহিংসতার অভিযোগে মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সাত দিনের রিমাণ্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল।

পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বিবিসিকে জানিয়েছেন, মি. হকের জামিনের আবেদন নাকচ করে পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করে তাকে সাত দিন রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আদেশ দিয়েছে আদালত।

তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরে ভাংচুর ও সহিংসতার যে অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই মামলাতেই তাকে এখন রিমাণ্ডে নেয়া হচ্ছে।

তবে মামুনুল হকের আইনজীবী বলেছেন, একজন ব্যক্তিকে মারধর করে মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার ঘটনায় মি. হকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতেআঘাত দেয়ার মামলা হয়, সেই মামলাতেই তাকে রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে।

জামিন না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন মি. হকের আইনজীবী।

সকাল ১১টার দিকে কড়া পুলিশী পাহারায় তাকে গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি কার্যালয় থেকে আদালতে নেয়া হয়। আদালতকে ঘিরেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

মি. হকের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সহিংসতা, ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে সহিংসতাসহ মোট আঠারোটি মামলা আছে।

রোববার দুপুরে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মি. হক হেফাজতে ইসলামের যুগ্ন মহাসচিব এবং খেলাফত মজলিশ বাংলাদেশের মহাসচিব।

রোববার আটকের সময় মামুনুল হক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোববার আটকের সময় মামুনুল হক

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত তেসরা এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রিসোর্টকাণ্ডের পর থেকেই মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন মামুনুল হক। সেই সময় থেকেই পুলিশ তার ওপর নজর রাখছিল।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ ও তেজগাঁও বিভাগের শতাধিক পুলিশ ওই মাদ্রাসাটা ঘিরে ফেলে।

মাদ্রাসার দোতলার একটি কক্ষ থেকে মামুনুল হককে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।

গ্রেপ্তারের পর প্রথমে তাকে মোহাম্মদপুর থানায় নেয়া হয় এবং রাতেই সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয় তাকে।

বিতর্কের কেন্দ্রে মামুনুল

হেফাজত ইসলামের নেতা হলেও মামুনুল হক আলোচিত হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

"আমাদের সকলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ঘোষণা হল আমরা দেশে রাষ্টীয় পর্যায়ে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হলে, ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়িত ত হলে ভাস্কর্য সরিয়ে না ফেলার কোন অবকাশ থাকবে না" সেই সময় বলছিলেন মামুনুল হক।

তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ মন্তব্য করেছিলেন 'হেফাজত নতুন রাজাকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে', যার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস এর মহাসচিব মামুনুল হক, একই সাথে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন ভাস্কর্য বিরোধিতার সাথে রাজাকার হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই।

হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY

ছবির ক্যাপশান, হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের নেয়া কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে হেফাজতের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংস রূপ ধারণ করে, এবং সেই সহিংসতায় কমপক্ষে ১৭ জনের মৃত্যু হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় গত ২৬শে মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে।

হাটহাজারী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের থানা আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার নানা ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি হয়েছে কমপক্ষে ১৭জনের।

সেই সহিংসতার পর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে একজন নারীসহ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের অবস্থান করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

গত তেসরা এপ্রিল সোনারগাঁও এলাকায় একটি রিসোর্টে মামুনুল হককে ঘেরাও করে রাখে স্থানীয় কিছু লোক এবং ক্ষমতাসীন দল-সম্পৃক্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মামুনুল হক একজন নারীকে নিয়ে রিসোর্টে ঘুরতে গিয়েছেন। অন্যদিকে মামুনুল হক বলেন, মহিলাটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর হেফাজতে ইসলামের সমর্থক এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে সেখান থেকে মি.হককে নিয়ে যায়।

এরপর সংসদে দেয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শনিবার মামুনুল হক 'অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে' ধরা পড়েছেন।

"এরা ধর্মের নামে এত কথা বলে, পবিত্রতার নামে এত কথা বলে, এখন অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে ধরা পড়েছে দলটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এখন সেটা ঢাকার জন্য নানা রকম চেষ্টা করছে তারা।"

প্রধানমন্ত্রী সংসদে তার ভাষণে বলেন, "এত আগুন জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি (মামুনুল হক) বিনোদন করতে গেলেন রিসোর্টে, একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে। এরা ইসলাম ধর্মের নামে কলঙ্ক। এরা ইসলাম ধর্মকে ছোট করে দিচ্ছে।"

ভিডিওর ক্যাপশান, হেফাজত-সরকার সম্পর্ক কি ভেঙ্গে গেলো?

"এরা ধর্মকে কলুষিত করে দিচ্ছে, ধর্মের নামে ব্যবসা শুরু করেছে। বিনোদনের এত অর্থ কোথা থেকে আসে?" এমন প্রশ্নও তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

জনগণের সম্পত্তি নষ্ট করা এবং ধর্মের নাম নিয়ে 'অধর্মের' কাজের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে মামুনুল হক পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী না জেনে অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন'। আর হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা 'বিব্রত ও হতভম্ব'।

হেফাজত ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর সরকার

২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের পর থেকেই কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এক সংগঠনটির সঙ্গে সরকারের একধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহাবস্থান থাকলেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফর ঘিরে সহিংসতা আর মামুনুল হকের রিসোর্ট কাণ্ডের পর থেকেই কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে সরকার।

সংঘাতের জন্য হেফাজত তাদের ভাষায় সরকারি দল ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর আক্রমণকে দায়ী করছে। অন্যদিকে সহিংসতার পর কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারী দিচ্ছে সরকার।

এর মধ্যেই সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীব এবং সহকারী মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মহানগরীর ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা জুবায়ের আহমেদসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে ২০১৩ সালে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।