বাংলাদেশে গিয়েও দাঙ্গা বাঁধিয়ে এসেছেন মোদী : অভিযোগ মমতা ব্যানার্জির

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক সফরকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে তর্কবিতর্ক চরমে উঠেছে।
সে রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করেছেন, অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে গিয়েও "নরেন্দ্র মোদী সেখানে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়ে এসেছেন"।
ওই সফরে গিয়ে মি মোদী আসলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারই চালিয়েছেন, মিস ব্যানার্জি এর আগেও এই অভিযোগ করেছিলেন।
বিজেপি অবশ্য যথারীতি এই অভিযোগ নস্যাৎ করছে এবং প্রকাশ্যেই বলছে, বাংলাদেশের অত্যাচারিত হিন্দুদের জন্য সহমর্মিতা দেখানোতে কোনও অন্যায় নেই।
মাত্র দু'দিনের রাষ্ট্রীয় সফর সেরে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসেছেন তাও প্রায় দিনদশেক হতে চলল - কিন্তু ওই সফরকে ঘিরে এখনও আলোড়িত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতি।

ছবির উৎস, Getty Images
মি. মোদীর সফরের সময় বাংলাদেশের নানা প্রান্তে যে সহিংস বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়েছে, তার প্রতি ইঙ্গিত করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা ব্যানার্জি রবিবার বিকেলে হুগলী জেলার খানাকুলে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আপনি আগে দিল্লি গিয়ে দিল্লিটা সামলান তো! দিল্লির তো সর্বনাশ করে দিয়ে এসেছেন!"
"তিনদিনের জন্য বাংলাদেশ গিয়েছিলেন। ওখানে গিয়েও দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে এসেছেন। আগে নিজেকে সামলান!"
"আর আপনি নিজেকে কী ভাবেন? অতিমানব না কি ঈশ্বর? দাঙ্গা করে, খুন করেই আবার আপনাদের চোখ দিয়ে জল পড়ে! ভালো নাটকও করতে জানেন আপনারা!" বলেন মিস ব্যানার্জি।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
এর আগেও মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী আসলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন - তাই তার সে দেশের ভিসা বাতিল করা উচিত।
যশোর ও গোপালগঞ্জে হিন্দুদের দুটি মন্দিরে মি. মোদীর সফরের পটভূমিতেই তিনি ওই মন্তব্য করেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সিনিয়র নেতা ও মুখপাত্র ও শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য দাবি করছেন, বিদেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ রাজনীতির তাস খেলেছেন, মানুষ সে কথা বিশ্বাস করবেন না।
মি. ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ডিএনএ-তে রাজনীতি আছে। তারা খুব ভালই জানেন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন কোনও বিদেশ সফরে থাকেন, তখন তাদের কোনও পদক্ষেপ নিয়ে দেশের ভেতরে প্রশ্ন তোলা বা বিবৃতি দেওয়া যায় না।"
"কিন্তু তৃণমূল এসব রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কোনও ধার ধারে না।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আর আমি তো পাল্টা প্রশ্ন তুলব, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গিয়ে কোন দাঙ্গা বাঁধিয়েছেন? বরং তৃণমূলই এখন পশ্চিমবঙ্গে যে কোনওভাবে একটা দাঙ্গা বাঁধাতে চাইছে।"
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের যশোরেশ্বরী মন্দির কিংবা মতুয়া তীর্থস্থান ওড়াকান্দিতে মি. মোদীর সফর কি এড়ানো যেত না? শমীক ভট্টাচার্য সে কথা মানেন না।
তিনি সরাসরি বলছেন, "প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গিয়ে হিন্দু মন্দিরে যাবেন না তো কি চীনে গিয়ে মন্দির দর্শন করবেন?"
"সেখানে যে হিন্দুরা রয়ে গিয়েছেন, তাদের জীবন-যৌবন, মানসম্ভ্রম, ধনসম্পত্তি, ধর্মবিশ্বাস-ধর্মস্থান সব লুঠ হয়ে যাচ্ছে। এই মানুষগুলোর জন্যই আমরা সেই '৫২ সাল থেকে লড়াই করছি।"
"শত অত্যাচার সয়েও যে হিন্দুরা সেখানে আজও আছেন তাদের আমরা অস্বীকার করতে পারি না - কারণ তারা আমাদের রক্ত, আমাদের ভাই।"

ছবির উৎস, Getty Images
"তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ও দেশের ভেতরেও আমরা সদা সচেষ্ট থাকব", বলছেন শমীক ভট্টাচার্য।
বিজেপি নেতৃত্ব হিন্দুদের প্রতি সংহতির কথা বললেও কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা কিন্তু তাদের সম্পাদকীয়তে সরাসরি লিখেছে, তার 'কোভিডকালীন প্রথম বিদেশ সফরকে নরেন্দ্র মোদী যে ঘরোয়া রাজনীতির স্বার্থেই' ব্যবহার করেছেন - তা একেবারে স্পষ্ট।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অভীপ্সু হালদারও বিবিসিকে বলছিলেন, বিজেপি যে দেশের ভেতরে এই সফরের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে তাতে কোনও ভুল নেই।
অধ্যাপক হালদারের কথায়, "পশ্চিমবঙ্গের যে কেন্দ্রগুলোতে মতুয়া হিন্দুদের ভোট আছে, প্রধানমন্ত্রীর মতুয়া তীর্থদর্শন সেগুলোতে তাদের ভাবাবেগ বা সেন্টিমেন্ট কাছে টেনে বিজেপিকে সুফল এনে দেবে, এমনটা ভাবা যেতেই পারে।"
"দ্বিতীয়ত হল ভারতের ইমিগ্রেশন পলিসি বা অভিবাসন নীতি। দেশের শাসক দল যে এই নীতি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে এবং এর নৈতিকতা খতিয়ে দেখছে সেটাও আমরা জানি।"

ছবির উৎস, Getty Images
"সেই ভাবনারই প্রতিফলন হল ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন। সেটারই সূত্রে কিন্তু সার্বিকভাবে বাংলাদেশ নিয়ে বা মতুয়াদের নিয়ে ভোটে এত মাতামাতি হচ্ছে বলে আমার ধারণা।"
"জাতপাত ও ধর্ম নিয়ে একটা রাজনৈতিক মেরুকরণ যে চলছে, তারও একটা ব্যাখ্যা আমরা এখানে পেতে পারি", বলছিলেন অভীপ্সু হালদার।
মূলত এই ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি আর অভিবাসন বিতর্কের কারণেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এবারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এত প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে।
রাজ্য প্রথম পর্বের ভোটগ্রহণের দিনে মি. মোদী সশরীরে বাংলাদেশে থাকায় সে আলোচনা যথারীতি আরও ইন্ধন পেয়েছে।
বিবিসি বাংলায় আরো খবর:








