কাদের মির্জা বনাম খিজির খান: বসুরহাটে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে প্রাণহানীর পর চলছে ধরপাকড়

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় একজন নিহত হওয়ার পর ওই এলাকায় আজ ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছি।

এই ঘটনায় ২৮ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক রনি।

তিনি বলেন, বুধবার সারাদিন বসুরহাট এলাকায় ১৪৪ ধারা রয়েছে। সেখানে কাউকে সমাবেশ, জমায়েত করতে দেয়া হবে না। পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মঙ্গলবারের ঘটনায় পুলিশের কাজে বাধা, জন সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগে ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিসহ মোট দেড়শো জনের বিরুদ্ধে বুধবার মামলা করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবারের ওই সংঘর্ষে আলাউদ্দিন নামের একজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন।

একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ওসি জাহিদুল হক।

আরও পড়তে পারেন:

ঘটনাস্থল থেকে সাংবাদিক ইকবাল হোসেন জানাচ্ছেন, পুরো বসুরহাট এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি রয়েছে। গুটিকয়েক খাবারের দোকান ছাড়া আর সব দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। ১৪৪ ধারা থাকায় মানুষজনের চলাচলও অনেক সীমিত।

তিনি বলছেন, স্থানীয় মানুষজন উভয় পক্ষের ওপরেই বিরক্তি আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এতদিন ধরে বসুরহাটে উত্তেজনা চলছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে যেমন এটি অবসানে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জোরালো কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

ঘটনার শুরু হয় গত সোমবার, যখন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির খান পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে মারধর করার অভিযোগ তোলেন।

তার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকালে বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে সমাবেশ চলছিল।

সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে পৌর ভবন থেকে একদল লোক বেরিয়ে ওই সমাবেশের লোকজনকে ধাওয়া করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।

রাত ১০টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি, হাতবোমা বিস্ফোরণ, দোকানপাট ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত আর অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

এর আগেও কোম্পানীগঞ্জে দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েকদফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের বিরোধ

বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এর আগে নির্বাচনী ব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং নোয়াখালী অঞ্চলের আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-অসংগতি নিয়ে বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রেখেছেন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। আব্দুল কাদের মির্জা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই।

নির্বাচনের আগে প্রচারণায় আবদুল কাদের মির্জার যে বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তিনি তাতে বলেছিলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিন-চারটি আসন বাদে তাদের অন্য এমপিরা পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।

নির্বাচনে মেয়র হওয়ার পরও তিনি বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রেখেছেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে তার বিরোধী অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এবং এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধেই মি. মির্জার নানা অভিযোগ।

একটি জেলার কোন্দলকে কেন্দ্র করে উপজেলার একজন নেতার বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

মি. চৌধুরীও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরতে গিয়ে আব্দুল কাদের মির্জার ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছেন।

যদিও মি. চৌধুরী ওবায়দুল কাদেরের ব্যাপারে বক্তব্য নিয়ে পরে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু একইসাথে তিনি কাদের মির্জার বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিবদমান দু'টি গোষ্ঠীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে ছয়জন গুলিবিদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা সেখানে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাই আব্দুল কাদের মির্জার সমর্থক এবং তার বিরোধী গ্রুপ আওয়ামী লীগের আরেকজন নেতা মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বাধীন অংশের মধ্যে সংঘর্ষের পর দু'পক্ষই ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে।

মূলত স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানকার আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই এই বিরোধের তৈরি হয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরে গত কয়েকমাসে উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: