মুক্তিযোদ্ধা তালিকা: এ নিয়ে এত অনিয়ম ও বিতর্ক কেন?

    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে আসন্ন স্বাধীনতা দিবসে প্রথমবারের মত একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ঘোষণা করা হবে। তার আগে আগামী সপ্তাহেই প্রকাশ করা হবে খসড়া তালিকা।

সরকার বলছে পূর্ণাঙ্গ তালিকা হবে এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যতগুলো তালিকা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে তার সমন্বয়ে তৈরি একটি তালিকা।

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেছে। এর মধ্যে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ অন্যতম।

সরকার বলছে, অনিয়ম ঠেকাতে নানা ধরণের যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় দশ হাজারের মত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ তালিকা নিয়ে অনিয়ম বিতর্ক

ফরিদা খানম সাকী ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে ডামি রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার চাটখিল গ্রামের বাসিন্দা সাকী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর মে মাসে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের আগরতলায় গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন।

তিনি সহ সেই দলে মোট আটজন নারী সদস্য ছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে মোট তিনটি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। আক্ষেপ করে সাকী বলছিলেন, তাদের গ্রামে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদের কমবেশি সবাইকে তারা চেনেন। অথচ তাদের গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন অনেক অ-মুক্তিযোদ্ধা।

"আমরা যখন যুদ্ধে যাই এত মুক্তিযোদ্ধা দেখি নাই। আমাদের গ্রামে একটা বাড়িতে ১ বা দুইজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল, সেটাকে ১১ জন বানানো হয়েছে। এটা সাম্প্রতিক ঘটনা না, ২০০৪ সালে করা হয়েছে। ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি অ-মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় জায়গা দেয়া হইছে।"

ফরিদা খানম সাকী বাংলাদেশ মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যুগ্ম-সম্পাদক।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এখন ওই তালিকা যাচাই বাছাই হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরে ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন ডা. মাহফুজুর রহমান।

তিনি বলছিলেন ২০২০ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামের মুজিব বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডার মহানগর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার মাত্র এক চতুর্থাংশ মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতে পেরেছেন।

"আমরা ১০/১২ জন কমান্ডার মিলে বসছিলাম চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে, সেখানে ৬৫০ জনের মধ্যে আমরা দেড়শো জনকে চিনছি।

এখন আমাদের চেনার বাইরে মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারে। কিন্তু চাইলে খুব সহজে চিহ্নিত করা যায়, কারণ যে দাবি করছে, সে তো কোন না কোন কমান্ডে যুদ্ধ করেছে। চট্টগ্রাম শহরে মোট ২৩টা গ্রুপ ছিল, এর কোন না কোনটার সদস্য তো সে হবে!"

ডা. রহমান বলেছেন এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে চিঠি লেখা হয়েছে, কিন্তু যাচাই হবে এমন আশ্বাসের বাইরে ফলাফল তেমন পাওয়া যায়নি।

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী এই মূহূর্তে সরকারি ভাতা ভোগ করছেন এমন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লক্ষ ৫ হাজার ২০৬ জন। এর মধ্যে ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৭৭৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম এমআইএস নামে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি ভাতা পাঠানো হচ্ছে।

১৫ই ফেব্রুয়ারি এই নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, তালিকার বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিলিয়ে সংযোজনের কাজ চলছে।

পরিষ্কার তথ্য নেই

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেছে।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঢুকে পড়েছে, এমন অভিযোগ সরকার নিজেও স্বীকার করে।

কিন্তু বাংলাদেশে ভুয়া বা অ-মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ঠিক কত, সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য নেই মন্ত্রণালয়ের কাছে।

গবেষকেরা মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনিয়ম এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহণের যে অভিযোগ রয়েছে, তার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণ রয়েছে।

গবেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিতর্ক হওয়ার পেছনে রাজনীতির সাথে কিছু কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে।

"বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র ছিল কিছুটা ইন-ফর্মাল। ইন-ফর্মাল যুদ্ধের সমস্যা হচ্ছে সেখানে রেকর্ড বড় বিষয় থাকে না। এখন মুক্তিযুদ্ধে মোট কত লোক অংশ নিয়েছে সেটা কেউ হিসেব করে বলতে পারবে না। এমনকি ক্যাম্পে গিয়ে কত লোক ছিল, তার কিছুটা বলতে পারবে, কিন্তু সবটা পারবে না।"

তিনি বলছেন স্বাধীনতার পরে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে কেউ ভাবত না।

"তখন সনদ ছিল, কিন্তু কোন ভাতা ছিল না। কিন্তু জিয়াউর রহমান আসার পরে পুরো বিষয়টার পুনর্বিন্যাস করা হয়। জিয়াউর রহমান সেসময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করলেন, যেখানে তার নিজের লোকেদের নিয়োগ দেয়া হল। এই রাজনীতি-করণটা তখন শুরু হয়," বলছেন আফসান চৌধুরী।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ কবে থেকে

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতিকীকরণের শুরু ৭৭ সালের পরে শুরু হলেও, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ প্রথম নেয়া হয় ১৯৮৪ সালে, এরশাদ সরকারের সময়।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ছয়বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে। আর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে অনেকবার।

উনিশশ বাহাত্তর সালে জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যেকোন সংগঠিত দলের সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

সে হিসাবে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর স্বাক্ষরযুক্ত সনদ যাদের কাছে ছিল, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

পরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এমন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতে শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, লেখক, সাংবাদিক, এবং দেশে বা বিদেশে বিভিন্নভাবে অবদান রাখা ব্যক্তিরাও।

তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়সের সীমাও কয়েকবার নির্ধারণ করা হয়েছে।

সর্বশেষ এখন সরকারের নির্ধারিত বয়স হচ্ছে ১৯৭১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধার বয়স ন্যূনতম সাড়ে ১১ বছর হতে হবে। বয়স নিয়েও বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেছে।

রাজনৈতিক ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তার পেছনে মূলত রাজনৈতিক ও আর্থিক সুযোগ সুবিধার অংশীদার হওয়াটাই প্রধান কারণ, যেমনটি বলছিলেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরিন।

"বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, কিন্তু এখন সেটা হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধ-কেন্দ্রিক রাজনীতি।

এর পাশাপাশি আর্থিক সুবিধা ও সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ে এবং পরবর্তীতে নাতিনাতনি পর্যন্ত যে কোটার ব্যবস্থা ছিল, তার কারণে বিভিন্ন সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে ও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে অনিয়ম হয়েছে।"

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল, পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সব ধরনের চাকরি থেকে কোটা তুলে দেয়া হয়।

এই মূহূর্তে একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা সম্মানী পান। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহেই অর্থাৎ ১৫ই ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতার পরিমাণ ২০ হাজার করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকে।

সরকারি হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধারা বিনা মূল্যে সব রকম স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারেন।

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ও আসনের পাওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা আছে।

এমনকি করোনাভাইরাস ঠেকাতে ভ্যাকসিন দেবার ক্ষেত্রেও মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছেন।

এর বাইরে ২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীদের চাকরির বয়স-সীমা প্রথমে দুই বছর এবং পরে আরও এক বছর বাড়ানো হয়।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে অনিয়ম সেসময় বেড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

অনেকে সেসময় কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক সচিবও ছিলেন, পরে সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় যাকে পদত্যাগ করতে হয়।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় এ ধরণের অনিয়মের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজে ঢিলেঢালাভাব এবং দুর্নীতিকে দায়ী করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

সরকার কী বলছে?

এখন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে অনিয়মের এসব অভিযোগ স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, এসব অনিয়মের ব্যাপারে যাচাই বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজারের মত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে। সর্বশৈষ জানুয়ারির ১০ তারিখে মোট ৫২ জন মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলের সুপারিশ করেছে।

"অভিযোগ যখনই পাই আমরা, ব্যবস্থা নেয়া হয়, কিন্তু অনেক সময় যাচাই-বাছাই করতেও সময় লাগে। ইতোমধ্যে প্রায় দশ হাজারের মত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে, এবং তাদের দেয়া সুযোগ সুবিধাদি ফেরত দিতে বলা হয়েছে।

এই অনিয়মের জন্য কারো কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও ভাবছি আমরা।"

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হবার পর এ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ নেই বাংলাদেশে।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মি. হক বলেছেন, এখন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভিন্ন ভিন্ন তালিকা ছিল, অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক তালিকা, ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রণীত মুক্তিবার্তায় অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা সকলের নাম এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

২৬শে মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং এ মাসেই খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে।