অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড: হামলার দিন যা ঘটেছিল

২০১৫ সালে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়।
ছবির ক্যাপশান, ২০১৫ সালে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়।
    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে প্রায় ছয় বছর আগে দায়ের হওয়া আলোচিত লেখক অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় আগামীকাল (মঙ্গলবার) দেবার কথা রয়েছে ঢাকার একটি আদালতের।

এই রায় এমন এক সময় আসছে, যার মাত্র কয়েকদিন আগেই অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার দায়ে ৮ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

২০১৫ সালে ঢাকায় বইমেলা থেকে বের হবার পর প্রকাশ্য রাস্তায় যেভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অভিজিৎ, সেটা বাংলাদেশ তো বটেই, দেশের বাইরেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।

সেদিন যা ঘটেছিলো

দিনটি ছিলো ২৬শে ফেব্রুয়ারি। বইমেলা জমজমাট হয়ে উঠেছে।

সেই বইমেলা থেকে বেরিয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেট পার হতেই হঠাৎ পেছন থেকে হামলার সম্মুখীন হন ব্লগার, লেখক অভিজিৎ রায়।

সেই সময় ঘটনাস্থলের অদূরে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ভেতরেই ছিলেন ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তিনি এভাবেই বর্ণনা করেছেন। "হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার। আচমকা কাউকে জোরে আঘাত করলে যেরকম চিৎকার করে মানুষ সেরকমই। তখনো আমি বুঝি নাই বড় কিছু ঘটেছে। কিন্তু আমি ঘটনা দেখতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ভেতর থেকে বাইরে আসলাম।"‍‍‌‌

‌‌‍"কাছে গিয়ে ভীড় ঠেলে দাঁড়াতেই দেখি মাটিতে একজন পড়ে আছে, আরেকজন মহিলা পাশে মোটরসাইকেলের উপর পড়ে আছে। চারদিকে রক্ত। পাশে থেকে মানুষজন বলতেছিলো, চাপাতি দিয়া কোপাইছে।"

জীবন আহমেদ বলছেন, ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।

কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সকল মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো সব। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সাহায্য করার।

"আমি প্রথমে মহিলাকে ডাকলাম। তিনবার ডাকার পর তার চেতনা ফেরে। তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু চেতনা আসতেই যখন তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে ফিরলেন, আমি একটা শক খাইলাম। মুখে-শরীরে-হাতে ভয়াবহভাবে রক্ত লেগে আছে।"

জীবন আহমেদ পরে জানতে পেরেছিলেন মহিলার নাম রাফিদা আহমেদ বন্যা।

জীবন আহমেদ জানান, চেতনা ফেরার পর বন্যা প্রথমে বুঝতে পারেননি কী হয়েছে। পরে তাকে জানানো হলে তিনি চিৎকার করে অভিজিতের দিকে ছুটে যান।

এরপর হাসপাতালে নিতে মানুষের সাহায্য চাইতে থাকেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে নি।

পরে জীবন আহমেদই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

অভিজিতের স্ত্রী বন্যা সেদিন গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, অভিজিতের স্ত্রী বন্যা সেদিন গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

জীবন আহমেদ বলছেন, রাফিদা আহমেদ বন্যা সিএনজিতে ওঠার পরই সিটে হেলান দেয়া অবস্থায় জ্ঞান হারান। কিছুক্ষণ পরই জ্ঞান ফিরে পান। কিন্তু তখন জীবন আহমেদকে আর চিনতে পারছিলেন না। বরং তাকে হত্যাকারীদের সহযোগী ভাবছিলেন।

"জ্ঞান ফিরতেই তিনি খুব উচ্চস্বরে বলতেছিলেন, আপনি কে? এখানে কেন? কী চান? আমি বললাম, আমি আপনাদের মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। উনি বলতে থাকলেন, আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি। আমাদের কেন মারতেছেন? আপনার কত টাকা লাগবে? আমাদের ছেড়ে দেন ইত্যাদি।"

জীবন আহমেদ বলছেন, এরপরই বন্যা আবারো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

একপর্যায়ে তাদের সিএনজি ঢাকা মেডিকেলে পৌছে যায়।

সে রাতে হাসপাতালেই মারা যান অভিজিৎ। গুরুতর আহত তার স্ত্রী বন্যা দীর্ঘ চিকিৎসার পর সেরে ওঠেন।

বাংলাদেশের ব্লগিং জগতে অভিজিৎ রায় ছিলেন পরিচিত নাম। বিজ্ঞান, নাস্তিকতা এবং ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি একাধিক বইও লিখেছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে 'মুক্তমনা' নামে একটি কমিউনিটি ব্লগিং প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তিনি।

সিরিজ ব্লগার হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের বছর দুয়েক আগে ২০১৩ সালে প্রথম খুন হন ব্লগার রাজীব হায়দার।

কিন্তু দুইবছর পর অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই মূলত: সিরিজ ব্লগার, লেখক হত্যা শুরু হয়।

অভিজিৎ হত্যার একমাস পরই ৩০শে মার্চ খুন হন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু।

ঐ বছরে এভাবে মোট ৫ জন ব্লগার, লেখক কিংবা প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী এসব হামলার দায় শিকার করে।

পরের বছরও হত্যা অব্যাহত থাকে। ব্লগার নাজিমুদ্দীন সামাদ এবং সমকামী অধিকার পত্রিকা 'রূপবানে'র সম্পাদক জুলহাজ মান্নান খুন হন এপ্রিল মাসে।

এসব ঘটনায় জঙ্গিগোষ্ঠীর দায় স্বীকারের প্রেক্ষাপটেই ঘটে পহেলা জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা।

অভিজিৎ হত্যায় মামলা যেভাবে এগুলো

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরদিনই তার বাবা অধ্যাপক অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছিলেন।

ঘটনাটি বাংলাদেশে তো বটেই বাংলাদেশের বাইরেও ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

অভিজিৎ ছিলেন আমেরিকান নাগরিক। ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই'র একটি প্রতিনিধি দলও বাংলাদেশ সফর করে।

শুরুতে ডিবি পুলিশের হাতে তদন্তকাজ থাকলেও ২০১৭ সালে তদন্তভার পায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

চার বছরের তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয় ১৩ই মার্চ, ২০১৯। চার্জশিটে ৬ জনকে আসামী করা হয় যাদের মধ্যে দুইজন পলাতক। বাকিরা কারাগারে।

আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ হলে বিচার শুরু হয় ঐ বছরেরই ১লা আগস্ট, ২০১৯।

চলতি বছরের চৌঠা ফ্রেব্রুয়ারি আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানী শেষ হলে আদালত এটি রায়ের জন্য দিন ধার্য্য করেন।

১৬ই ফেব্রুয়ারি বহুল আলোচিত এই মামলার রায় হবে।