ভেজাল মদ: বাংলাদেশে কেন হঠাৎ তৈরি হয়েছে বিদেশি মদের সংকট?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে গত বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশি মদের সংকট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি নকল মদ বিক্রেতা চক্র।
এরকম চক্রের ছয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করার পর ঢাকার পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়্যারহাউজগুলো থেকে মদ বিক্রিতে কড়াকড়ি থাকায় বাজারে মদের সংকট তৈরি হয়েছে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি ভেজাল মদ তৈরির কারখানা গড়ে তোলে। এই মদ তারা খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি করতো।
এরকম ভেজাল মদ খেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩০ জনের বেশি মানুষ।
কিন্তু হঠাৎ করে মদ খেয়ে অসুস্থ হওয়া আর বিদেশি মদের সংকটের কারণ কী?
বাংলাদেশে যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন, এরকম বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর থেকেই বিদেশি মদ অনেকটা দুর্লভ হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের মদ এবং আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিয়ার তৈরি করে থাকে। কিন্তু দেশীয় এসব পণ্যের বাইরে বিদেশি মদেরও বিপুল চাহিদা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার একজন নিয়মিত মদ্যপানকারী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আগে বিভিন্ন বার, ওয়্যারহাউজ থেকে সহজেই মদের বোতল কেনা যেতো।
"কিন্তু এখন বেশি টাকা দিয়েও সেখান থেকে মদ কেনা যায় না। তাই আমরা অনেকেই পরিচিত ডিলার বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে মদ নিয়ে থাকি। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনার পর সেটাও বন্ধ করে দিয়েছি," বলেন তিনি।
মদ বিক্রি করে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েকমাস ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে মদ বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে ওয়্যারহাউজগুলো। সেই সঙ্গে বারের মদ আমদানিও অনেক কমে গেছে।
আরও পড়ুন:

ঢাকার একটি বার ব্লু মুন রিক্রিয়েশন ক্লাবের কর্মকর্তা মোঃ শাহজাদা মিয়া বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''বাংলাদেশে বিদেশি মদ আমদানিতে অনেক বিধিনিষেধ আছে, অনেক টাকা কর দিতে হয়। ফলে আমাদের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, তার খুব সামান্যই আমদানি করতে পারি। এরই সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র। তারা নকল মদ তৈরি করে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে।''
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, মদ্যপানের লাইসেন্স ব্যতীত মদ কেনা, বহন বা সংরক্ষণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ নিয়মিত মদ্যপান করেন।
একাধিক বারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে বিভিন্ন ওয়্যারহাউজ বা ক্লাব থেকে অনেকে কম দামে মদ কিনতেন। কিন্তু সম্প্রতি শুল্ক বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে ওয়্যারহাউজ বা ক্লাব থেকে বিদেশি নাগরিক ছাড়া মদ বিক্রি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলে যারা বিদেশি মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, তারা এখন বিভিন্ন সূত্র থেকে মদ কেনার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশে বিয়ার ও ওয়াইন আমদানি করতে হলে সাড়ে চারশ শতাংশ কর দিতে হয়। আর হুইস্কি বা ভদকার মতো পানীয় আমদানিতে শুল্কের হার ছয়শ শতাংশের বেশি।
শুল্ক কর্মকর্তাদের অভিযোগ ওয়্যারহাউজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব পানীয় বিক্রি করছে। যার ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার অনেক বার ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।
ফলে গত দুইমাস ধরে ঢাকার অনেক বারে বিদেশি মদ একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব বারে বিক্রি হয়, সেখানেও দাম কয়েকগুণ বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে দেশীয় মদও পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এই সুযোগে একটি অপরাধী চক্র বিদেশি মদের বোতলে ভেজাল মদ ভরে বিক্রি করছে, যা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেছেন, যারা বিদেশি মদের নামে নকল মদ তৈরি করছে, তারা যথাযথভাবে রাসায়নিক মিশ্রণ করছে না।
"অনেক সময় রাসায়নিক কাজে ব্যবহৃত মিথানল ব্যবহার হচ্ছে। ফলে সেটি বিষাক্ত হয়ে উঠছে, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে," বলেন তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''নিয়ম মেনে যারা লাইসেন্স চায় বা মদ আমদানির জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চায়, আমরা সেটা দিয়ে থাকি।''
মদের সংকটের কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, ''একটা কারণ হতে পারে যে মহামারির সময়ে বারগুলো বন্ধ ছিল। প্রায় দুইমাস আগে বারগুলো খোলা হয়েছে, তারা হয়তো যথেষ্ট পরিমাণে আমদানি করতে পারে নাই।''
''অথবা সরকারের অন্যান্য দপ্তরের নজরদারিও বাড়তে পারে। হয়তো সেখানে তারা রাজস্ব ঠিক মতো দিচ্ছে না। তাছাড়া অবৈধভাবে মদ বিক্রির বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থাও আছে।''








