চালের ঘাটতি কাটাতে বোরো মৌসুমে কি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারি ও প্রলম্বিত বন্যার কারণে চালের উৎপাদনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টনের যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে - তা বোরো মৌসুমে পুষিয়ে নিতে না পারলে বড় ধরণের চালের ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ঘাটতি এড়াতে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি শুরু হলেও বোরো মৌসুমের ফলন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
ঘাটতি মেটাতে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো চাষ করা হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড, আব্দুর রাজ্জাক।
উৎপাদন বাড়াতে ২ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ফলন করা হবে বলেও তিনি জানান।
হাইব্রিড বীজের দাম বেশি হওয়ায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে চাষাবাদের জন্য এরই মধ্যে কৃষককে ৭৩ কোটি টাকার বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
এই দুই লাখ হেক্টর জমি থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টন ধানের উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করছেন মি. রাজ্জাক।
তবে তার আগ পর্যন্ত ঘাটতি মেটাতে ৬ থেকে ৭ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে তিনি জানিয়েছেন।
এবারে বেসরকারি ভাবেও চাল আমদানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে অতিরিক্ত আমদানি ঠেকাতে এবারে ১০ লাখ টন আমদানির সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে জানা গেছে যে, কয়েক দফা বন্যায় ৩৫ জেলার আমনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরে সচিবালয়ের এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী জানান যে, প্রলম্বিত বন্যায় এক লাখ হেক্টরেরও বেশি জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ধানের উৎপাদন কম হয়েছে - যার প্রভাব পড়েছে চালের দামে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, চালের দাম গত বছরের এই সময়ের চাইতে ১০-৩৫% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে।
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ১০ মাস ধরে আর্থিক অনটনের মধ্যে আছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এরমধ্যে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে।
দিনমজুর পারুল বেগম বলেন, "কমদামী চালের দামও বেশি। চাল কিনা তো কভার করতাম পারতাসি না। সংসারে ছয়জনরে খাওয়াইয়া আমার দিনে দুই কেজি চাল লাগে। সব কিনা সাইরা সংসার চালাইতে কষ্ট হইতেসে। উপায় কি, ভাত ছাড়া চলে?"
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
করোনাভাইরাস মহামারী ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে বিপুল পরিমাণ চাল বিতরণ এবং সরকারি গুদামে চালের মজুদ কমে যাওয়া ঘাটতির আরেকটি বড় কারণ বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
এবারে চালের মজুদ সাত লাখ টনে নেমে এসেছে যেটা আগের বছর প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
এজন্য এবার বাজার স্থিতিশীল রাখতে খোলাবাজারে নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে কমদামে চাল বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।
কারণ গত বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান-চাল কৃষি অধিদফতর বা কৃষি মন্ত্রণালয় কেনার আগেই মিল মালিক ও আড়তদাররা সব কিনে নেয়।
এ কারণে পাইকারি ও খুচরা দুটি বাজারই মিল মালিক ও আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে তিনি জানান।
এমন পরিস্থিতিতে বাজার মনিটরিং করা এবং কৃষকদের বিনামূল্যে সার বীজ দেয়ার পাশাপাশি শস্য-বীমার সুবিধা দিয়ে অধিক ফলনের ব্যাপারে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে মূলত আউশ, আমন ও বোরো-এই তিন জাতের ধানের আবাদ হয়ে থাকে।
জুন-জুলাই মাসে অর্থাৎ বর্ষায় আমন ধান বোনা হয় এবং নভেম্বর মাসে বা হেমন্তে সেই ধান কাটা হয়।
অন্যদিকে বোরো ধান শীতকালীন রবিশস্য। আমনের মৌসুম শেষ হবার পরে অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই ধানের সময় চলে।
বোরো ও আমন ধানের মৌসুমের মাঝে যে সাত মাসের ব্যবধান, এই সময়ে আউশ ধানের ফলন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বপন কুমার পাল।
আউশের মৌসুম মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ ৯০থেকে ১০০ দিনের মতো থাকে।
এই সময়ে ধান উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পুষিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন মি. পাল। এর পাশাপাশি তিনি বোরোর বীজতলা ও চারার পরিচর্যার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
মি. পাল বলেন, "আবহাওয়ার কারণে বোরো মৌসুমে উৎপাদন অন্যান্য মৌসুমের চাইতে বেশি। কিন্তু যেসব অঞ্চলে ঠাণ্ডা বেশি পড়ে সেখানে বোরোর চারা ও বীজতলার ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। সেজন্য পরিচর্যা করতে হবে। তাহলে ফসলের ইনজুরি হবে না। ফলন বেশি হবে।"

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
এক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রথমত, এই শীতের মৌসুমে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
বিকেলে বীজতলায় পানি দেয়া এবং সকালে ওই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। বীজতলায় নিয়মিত সার প্রয়োগ করা।
এছাড়া চারার ওপর জমে থাকা শিশির দড়ি দিয়ে টেনে নাহলে ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দিতে হবে।
চারা বোনার আগে জমিতে জিংক এবং পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে যেন চারাগুলো সুস্থ সবল হয়।
ফলনের পুরো সময় জুড়ে সুষ্ঠু সেচ ব্যবস্থাপনার ওপরেও জোর দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের হাওড় এলাকাসহ কয়েকটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আগাম বন্যা আঘাত হানার আশঙ্কা থাকে।
এই বিষয়টি মাথায় রেখে ওইসব এলাকায় আগাম ফলনশীল বীজ ও চারা রোপণের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।








