দুদক: 'সরল বিশ্বাসে' করা ভুলের জন্য দায়ী তদন্তকারীরা যেভাবে পার পেয়ে যান

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের ভুল তদন্তের কারণে ১৫ বছরের সাজা হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিয়ে সেই সাজা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন নিরাপরাধ মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম।
দুদকের তদন্তের ভুল প্রমাণ হওয়ায় বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ঐ সাজা বাতিল করেছে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।
ভুল তদন্তের ব্যাপারে দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, তদন্তকারী কর্মকর্তা ''সরল বিশ্বাসে'' ভুল করেছেন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, সংশ্লিষ্ট আইনে থাকা 'সরল বিশ্বাসে ভুলের' কথা তুলে ধরে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটিয়ে তদন্তকারীদের অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
'সরল বিশ্বাস' কীভাবে প্রমাণ করা সম্ভব- এই প্রশ্নও রয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের।
আরও পড়ুন:
মামলায় নামের ভুল বা ঠিকানা ভুল থাকার কারণে নিরাপরাধ ব্যক্তির বছরের পর বছর গ্রেপ্তার থাকার বেশ কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
মোহাম্মদ কামরুল ইসলামকে বিচার পেতে ১৮ বছর ধরে পুলিশ-তদন্ত এবং কোর্টকাছারিতে ঘুরতে হয়েছে।
অবশেষে তিনি হাইকোর্টে এসে দুদকের তদন্তের ভুল প্রমাণ করে মামলার সাজা থেকে রেহাই পেলেন।
নোয়াখালীতে এসএসসির নম্বরপত্র জালিয়াতির অভিযোগে একজন যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেই অভিযুক্তের ঠিকানা ভুল দেয়া হয়েছিল মামলায়।
মামলা হওয়ার ১০ বছর পর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিট দিয়েছিলেন এবং এত বছরের তদন্তের পরও অভিযুক্তের ঠিকানায় ভুল থেকে যায়।
অভিযুক্তের নাম এবং ঠিকানার সাথে মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের নাম-ঠিকানা মিলে যাওয়ায় অপরাধ না করেও নোয়াখালীর আদালতে তার সাজা হয়েছিল।
মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেছেন, হাইকোর্ট থেকে অব্যাহতি পেয়ে তিনি এখন নতুন জীবন পেয়েছেন বলে মনে করছেন।
"ঠিকানা ভুল করাতে এবং আসল আসামীর ঠিকানা যাচাই না করে আমাকে হয়রানি করা হয়। আমি আসলে অর্থনৈতিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি হাইকোর্টে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে আমি রিলিফ পেয়েছি। আমি খুব খুশি।"

ছবির উৎস, Getty Images
জাহালম মামলা
এর আগেও দুদকের মামলায় বিনা দোষে নরসিংদীর একজন পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর জেলে থাকার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিলে।
একটি ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় অভিযুক্তের নামের সাথে না মিললেও জাহালমকে সাজা দেয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে খবর আসার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের নির্দেশে তিন বছর জেল খাটার পর জাহালম মুক্তি পান ২০১৯ সালে।
তখন দুর্নীতি দমন কমিশন ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু আজও সেই তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি।
এখন মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের ঘটনায় তদন্তের ভুলের জন্য হাইকোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে।
দুদকের একজন কমিশনার ড: মো: মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, ভুল অনিচ্ছাকৃত কিনা- তা খতিয়ে দেখা হবে।
"যে এই কাজের জন্য দায়ী হয়েছে, তার এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। তবে আমরা এটা খতিয়ে দেখবো, এই অনিচ্ছাকৃত ভুল আসলে কতটা হয়েছে।"
দুদকের কমিশনার আরও বলেছেন, "এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আমাদের তদন্তকারীদের পরামর্শ দেব যে ভবিষ্যতে যেন এমন ভুল আর না হয়। তারা যেন যত্নবান হয়।"

এখন দুদকের ভুল তদন্তের বিষয় আবারও আলোচনায় এসেছে।
সর্বশেষ ঘটনায় হাইকোর্টে শুনানিতে দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, তদন্তকারী কর্মকর্তা 'সরল বিশ্বাসে' ভুল করেছেন।
তদন্তকারীদের রক্ষাকবচ?
মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বলেছেন, 'সরল বিশ্বাসে' ভুল হতে পারে-এই বিষয়টি দুর্নীতি দমন আইনে যুক্ত করা হয়েছে। আর এর সুযোগ নিয়ে একের পর এক নিরাপরাধ ব্যক্তির হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটলেও তদন্তকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।
"অনেকজনকে নামের ভুল, বাবার নামের ভুল বা ঠিকানা মিলে যাওয়ায় আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে ওরফে ওরফে দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই যে আইন পরিবর্তন করে সরল বিশ্বাস শব্দটা দিয়ে তদন্তকারীদের রক্ষা করা হয়েছে, এর ফলে আরেকজনও তদন্ত করে বলতে পারে সরল বিশ্বাসে ভুল হয়েছে। তাহলেতো তদন্তের প্রয়োজন ছিল না," তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি মনে করেন, এই সরল বিশ্বাসের যথাযথ ব্যাখ্যা করা বা প্রমাণ করা যায় না।
তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ভুল তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদন্তকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনে কোন বাধা নেই।
"আজকাল কিন্তু প্রায় সব আইনেই আমাদের দণ্ডবিধি আছে, তাতে মিথ্যা মামলা করলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। আর এই ঘটনায় তদন্তে ভুল হলে ব্যবস্থা নিতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।"
মন্ত্রী আরও বলেছেন, "সরল বিশ্বাসে ভুল হয়েছে কিনা-সেটা আগে দেখা দরকার। তা না করে সরল বিশ্বাসে ভুল বলাটা আমি মনে করি ভয়ংকর বিষয়। আর 'সরল বিশ্বাসে ভুল' যেটার কথা আইনে বলা আছে, সেই ব্যাখ্যা এখানে দেয়া যায় না," তিনি বলেন।
মানবাধিকার কর্মীরা দুদকের তদন্তের ক্ষেত্রে দক্ষতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।








