বাংলা সিনেমা: চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন সরকারি বরাদ্দ, দর্শকদের আশা 'পয়সা উসুল' ছবি

ঢাকায় সিনেমার পোস্টার।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় সিনেমার পোস্টার।
    • Author, ফারহানা পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য এক হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছেন।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নয়নের জন্য অল্প সুদে এই তহবিল ঘোষণা করেন। ।

একই সাথে পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা যায় এমন সিনেমা বানানোর জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন নির্মাতাদের কাছে।

বাংলা সিনেমার গল্প, অসাধারণ অভিনয় এবং সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়ে দর্শকদের অভিযোগ রয়েছে বরাবরই, কিন্তু সিনেমার প্রযোজক যারা রয়েছেন তারা বিষয়গুলো নিয়ে কতটা কাজ করেন?

দর্শকরা কেমন সিনেমা দেখতে পছন্দ করে

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করেন বাংলাদেশে সিনেমার স্বর্ণযুগ থেমে গেছে নব্বই এর দশকের পর থেকেই।

এরপর থেকেই সিনেমার গল্প, চরিত্র, সংলাপ, অভিনয় এবং সবশেষে সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই দর্শকদের।

ঢাকার মধুমিতা সিনেমা হলের আগের মত রমরমা ব্যবসা এখন আর নেই

ছবির উৎস, MADHUMITA/FACEBOOK

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার মধুমিতা সিনেমা হলের আগের মত রমরমা ব্যবসা এখন আর নেই

ঢাকায় ডেমরার বাসিন্দা কামরুন নাহার। একটা কলেজে শিক্ষকতা করছেন। দুটি সন্তান আছে তার।

তিনি বলছিলেন, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যারা আছেন তাদের রুচির সঙ্গে যায় এমন সিনেমা এখন একেবারেই বানানো হয় না।

কামরুন নাহার বলছেন "আমার দুই সন্তান, ও স্বামীকে নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে পারি যেটা হবে বিনোদনে ভরপুর। তবে সেটা অবশ্যই হতে হবে সুস্থ বিনোদন। পরিবারের সাথে একটা ভাল সময় যাতে কাটে সেটা নিশ্চিত করতে হবে ঐ ২/৩ঘন্টা।''

আবার কেউ কেউ বলছেন বর্তমান সমাজের বিভিন্ন ইস্যুকে সিনেমাতে তুলে এনে সামাজিক বার্তামূলক চিত্রনাট্য হলে সেটা অনেকেই দেখতে চাইবেন।

মাসুমা লিনা ঢাকার সেগুনবাগিচায় থাকেন। তিনি বলছেন "পরিবার নিয়ে সিনেপ্লেক্সগুলোতে যখন যাই তখন ইংরেজি সিনেমাই বেশি দেখা হয়। কারণ সিনেপ্লেক্সে খুব কম বাংলা সিনেমা দেখানো হয়। আর হলেও অত টাকা খরচ করে বাংলা সিনেমা দেখতে ইচ্ছা করে না। কারণ একটা বাংলা সিনেমা শুরু হলে গল্পের শেষে কী হবে তা আগেই আঁচ করা যায়।"

তিনি বলছিলেন "গল্পের মধ্যে টান টান কোন উত্তেজনা বা শিল্পীদের অসাধারণ অভিনয় দেখতো পাবো এমন কোন আশা থাকে না।"

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিলন মোস্তাফিজ। তিনি বলছিলেন "আমি বন্ধুদের নিয়ে এমন সিনেমা দেখতে চাই, যেটা হবে অ্যাকশন এবং বিনোদন নির্ভর। যেটাকে বলে পয়সা উসুল সিনেমা।"

সিনেমা হল কমে যাওয়া

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির হিসেব অনুযায়ী সারা দেশে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তের'শ সিনেমা হল ছিল।

এর পরেই সিনেমা হল কমতে শুরু করে। এর কারণ কী?

সিনেমা হলের স্থানে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয় বেশি লাভের আশায়।

কিন্তু যে সংখ্যায় সিনেমা হল ভেঙ্গে ফেলা হয় সে সংখ্যায় সিনেমা হল আর তৈরি করা হয় না।

বর্তমানে আছে ১৯৫টা সিনেমা হল। এরমধ্যে নিয়মিত সিনেমা রিলিজ হয় ৬০/৬৫ টা সিনেমা হলে।

একটা সময় ঢাকার সিনেমায় অশ্লীল সংলাপ এবং দৃশ্য নিয়েও প্রচুর সমালোচনা হয়েছে।

শিল্পীদের অসাধারণ অভিনয় দেখতে চান অনেক দর্শক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিল্পীদের অসাধারণ অভিনয় দেখতে চান অনেক দর্শক

অশ্লীলতা এবং পাইরেসি

কাটপিস (অন্য সিনেমার অশ্লীল দৃশ্য) ব্যবহার করা হয় সিনেমাতে।

২০০১ সাল থেকে এই প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করে।

২০০৭ সালে সিনেমা জগতে নানা অভিযোগের ভিত্তিতে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যার প্রধান কাজ ছিল চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা এবং পাইরেসি দূর করা ।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলছিলেন "যে অবস্থা তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে আস্তে আস্তে ঘুরে আসার চেষ্টা করছে কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার সেটা আগেই হয়েছে।"

কেউ কেউ বলছেন সিনেপ্লেক্সে বেশিরভাগ ইংরেজি সিনেমা দেখেন

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/GETTY

ছবির ক্যাপশান, কেউ কেউ বলছেন সিনেপ্লেক্সে বেশিরভাগ ইংরেজি সিনেমা দেখানো হয়

"এখানে একটা গ্যাপ হয়ে গেছে। যেসব দর্শক পরিবার নিয়ে হলে আসতো তারা বলছে সিনেমাতে অশ্লীলতা আছে অতএব যাওয়া যাবে না। আসলে এখন সিনেমায় কোন অশ্লীলতা নেই। আবার যারা এইসব কাটপিস দেখার দর্শক তারা হলে যেয়ে দেখে সিনেমায় কোন কাটপিস নেই। এইরকম অবস্থা থেকেও সিনেমা হলের দর্শক কমে গেছে," বলছেন মি. খসরু।

সিনেমায় লগ্নি

"এই কয়টা সিনেমা হলে সিনেমা চালিয়ে আসলে পোষানো যায় না," বলছিলেন প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

বছরে ২/১টা সিনেমা তৈরি হয় যেটার এক শ্রেণির দর্শক তৈরি হয়েছে।

তবে মূল ধারার বাণিজ্যিক সিনেমার প্রযোজকরা সেটাকে সিনেমা না বলে 'পূর্ণদৈর্ঘ্য নাটক' বলতে চান।

কিন্তু যখন এক শ্রেণির দর্শক তৈরি হয়েছে তাহলে কেন সেখানে অর্থ লগ্নি করছেন না প্রযোজকরা?

"আমরা যখন দেখবো অনেকগুলো সিনেমা হলে সিনেমাটা দেখানো হবে এবং আমার টাকাটা উঠে আসবে তখন অবশ্যই আমি অর্থ লগ্নি করবো। কিন্তু আমার কাছে সেই মানের, সেই সংখ্যায় সিনেমা হলই নেই," বলছেন মি. খসরু।

"আমরা এক সময় বলতাম প্রডিউসার বাঁচলে চলচ্চিত্র বাঁচবে। সেই আমরাই এখন বলছি, হল বাঁচলে প্রডিউসার বাঁচবে, প্রডিউসার বাঁচলে চলচ্চিত্র বাঁচবে," বলছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: