ইরানে সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে গিয়ে চরম বিপাকে যে তরুণী

সাহার তাবার ছদ্মনামে ইনস্টাগ্রাম পোস্ট

ছবির উৎস, Instagram

ছবির ক্যাপশান, ইনস্টাগ্রামে সাহার তাবার ছদ্মনামে অভিনব পোস্ট দিয়ে ফতেমা খিশভান্দ সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান

ইরানে বড় হয়ে ওঠা উনিশ বছরের ফতেমা খিশভান্দ তার বয়সী আর পাঁচটা তরুণীর মতই বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন। ইনস্টাগ্রামে নানা কায়দার সেলফি পোস্ট করে জনপ্রিয় হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চাওয়া তার জন্য কীভাবে কাল হল লিখেছেন বিবিসি নিউজের জশুয়া নেভেট।

ফতেমার সেলফিগুলো আর পাঁচজনের মত ছিল না। সেটাই ছিল আর পাঁচটা তরুণীর সাথে তার তফাত।

নানা কায়দাকানুন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি তার সেলফিতে মুখের চেহারা বদলে দিতেন- কখনও গাল তোবড়ানো, কখনও বিকৃত চেহারা আবার কখনও চড়া মেক আপ দিয়ে বদলে দিতেন নিজের চেহারা।

'সাহার তাবার' এই ছদ্মনামে নিজের ছবিগুলো পোস্ট করতেন তিনি। ছবিগুলো এতই নজর কাড়া যে ২০১৭ সালে প্রথম প্রকাশ পরার পর থেকে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সাড়া ফেলে দেয় তার সেলফিগুলো।

কোন কোন ছবিতে তার চেহারার সাথে হলিউড তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জলির এতই মিল ছিল যে গুজব রটে মিস খিসভান্দ হলিউড অভিনেত্রীর মত চেহারা করাতে ৫০ বার অস্ত্রোপচার করিয়েছেন।

ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে এবং দ্রুত তার অনুসারী সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখে।

জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি তার জোটে ঠিকই, কিন্তু চড়া মূল্যে।

Short presentational grey line

Iইরানে সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্ট করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কী পোস্ট করা যাবে বা যাবে না, তা নিয়ে দেশটিতে কঠোর আইন আছে।

ইরানের কর্তৃপক্ষ মিস খিশভান্দের পোস্টগুলোকে এক কিশোরীর ফটোশপ নিয়ে খেলা বা পরীক্ষা হিসাবে না দেখে বরং এটাকে একটা অপরাধ বলে গণ্য করে।

এবং এর পরে ২০১৯ এর অক্টোবরে বেশ কিছু অভিযোগ এনে মিস খিশভান্দকে গ্রেফতার করা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া, সহিংসতায় ইন্ধন জোগানো, ধর্মীয় পোশাক পরিচ্ছদের অবমাননা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দুর্নীতি উস্কে দেয়া।

তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এক বছরের বেশি সময় তাকে বিনা জামিনে কারাগারে কাটাতে হয়।

এরপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি আদালত - যা গোপনীয়তার কারণে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রায় প্রদানের কারণে সুপরিচিতি - সেই আদালত ফতেমাকে গত বছর ডিসেম্বর মাসে দশ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

সাহার তাবার নামে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবি

ছবির উৎস, Instagram

ছবির ক্যাপশান, হলিউড তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জলির সাথে মিল আছে এমন মুখমণ্ডলে একটা 'ভূতুড়ে' অভিব্যক্তি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে নজর কাড়েন মিস খিশভান্দ

শাস্তির কঠোরতা বহু মানুষকে বিস্মিত করেছে এবং এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

"ইসলামী এই প্রজাতন্ত্রে নারীদের নাচগান করা, বা বাধ্যতামূলক হিজাব খোলা, স্টেডিয়ামে ঢোকা, মডেলিং করা এসব কারণে গ্রেফতার হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ফটোশপ ব্যবহার করে ছবিতে চেহারা পরিবর্তনের জন্য সাজা?" টু্‌ইটারে পোস্ট করা এই ভিডিও বার্তায় মন্তব্য করেছেন ইরানের বিশিষ্ট সাংবাদিক মাশি আলিনেজাদ।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

1px transparent line

অনেকেই মিস খিশভান্দের এই সাজাকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি ইরানী কর্তৃপক্ষের কঠোর মনোভাবের নতুন একটা দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখছেন।

ইরানে ইন্টারনেট অপরাধ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে ইরানের মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্দোলনকারীদের একটি দল বলছে তাদের গবেষণা অনুযায়ী ২০শে ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে ইন্টারনেট কর্মকাণ্ডের জন্য ইরানে অন্তত ৩৩২জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০৯জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ইনস্টাগ্রামে তাদের পোস্টের কারণে, গোষ্ঠীটি জানাচ্ছে ।

1px transparent line

ইরানে ইনস্টাগ্রামই একমাত্র সবচেয়ে বড় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যেটি দেশটির সরকার নিষিদ্ধ করেনি এবং তরুণ ইরানীদের জন্য মত প্রকাশের এটি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।

সরকারের জন্য এটা একটা উভয় সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দিলে তা অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ এটা বন্ধ করতে চায় না। অনেক ব্যবসায়ী বিজ্ঞাপনের জন্য ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। নাগরিকদের সাথে যোগাযোগের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে সরকার এই মাধ্যমকে এখন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

"বহু দিন ধরেই ইরান সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে,"বিবিসিকে বলছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইরান বিষয়ক গবেষক তারা সেপেহরি ফার।

"ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে মতামত প্রভাবিত করার অভিযোগে বেশ কিছু মানুষক ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।"

এর মধ্যে ২০১৪ সালে ছয়জন ইরানীকে একটি গানের সাথে তাদের নাচের ভিডিও পোস্ট করার জন্য স্থগিত কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয় এবং তাদের বেত্রাঘাত করা হয়।

এরপর ২০১৮ সালে একজন তরুণী জিমনাস্টকে পপ গানের সাথে নাচার ভিডিও পোস্ট করার জন্য গ্রেফতার করা হয়।

প্রতিটি ঘটনাতেই ইনস্টাগ্রামে ভিডিও বা ছবি পোস্ট করার কারণে তাদের হয়রানি করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে এসে তাদের বিরুদ্ধে আনা অপরাধের অভিযোগ "স্বীকার" করে নিতে হয়েছে, বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

একই ঘটনা ঘটেছে মিস খিশভান্দের ক্ষেত্রেও। তাকেও গ্রেফতার করার দু সপ্তাহ পর "অ্যাঞ্জেলিনা জলির ভূতুড়ে মুখ"এর আদলে নিজের মুখমণ্ডল দেখানোটা যে ন্যক্কারজনক এবং সে কারণে তার জীবন কীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে সেটা ইরানী এক টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয় তার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে।

2px presentational grey line

আরও পড়তে পারেন:

2px presentational grey line

সেঈদ আহমদ মঈনশিরাজী, যার বয়স ৪২, তিনি এবং তার ৩৮ বছর বয়স্ক স্ত্রী শবনম শাহরোখি কীভাবে ইরানী কর্তৃপক্ষের কঠোর সামাজিক মাধ্যম বিধিনিষেধের শিকার হয়েছেন তাও বেরিয়ে এসেছে বিবিসির এই প্রতিবেদনে।

ইনস্টাগ্রামে তারা নিয়মিত তাদের মতামত দিয়ে পোস্টিং দিতেন এবং ফলে আইনের কাছে তাদের ধরা খেতে হয়।

মি. মঈনশিরাজী বলছেন, ২০১৮ সাল থেকে সাইবার পুলিশ তাকে ভীতিপ্রদর্শন করতে শুরু করে। তাকে জেরার জন্য তারা ডেকে পাঠায় এবং তার কাছে লিখিতভাবে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দাবি করে।

তিনি বলেন, এক ঘন্টা ধরে চলা জেরার মুখে তাকে বারবার হুমকি দিয়ে বলা হয় তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হবে। এবং তাকে তার অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু পোস্ট সরিয়ে নেবার নির্দেশ দেয়া হয়, বিশেষ করে যেসব পোস্টে তার স্ত্রীকে হিজাব ছাড়া দেখা যাচ্ছে।

শবনম শাহরোখি (বামে) এবং সেঈদ আহমদ মঈনশিরাজী (ডানে)

ছবির উৎস, @picassomo on Instagram

ছবির ক্যাপশান, শবনম শাহরোখি এবং সেঈদ আহমদ মঈনশিরাজীর ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা কয়েক লক্ষ

"তারা (ইরানী কর্তৃপক্ষ) বলেন এইসব পোস্টের মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতি দিয়ে ইরানকে কলুষিত করা হয়েছে, " বিবিসিকে বলেন মি. মঈনশিরাজী, যিনি অবসরপ্রাপ্ত মুষ্টিযোদ্ধা এবং পিকাসো মঈন নামে বেশি পরিচিত।

এসব পোস্ট তাদের অনুরোধ রেখে সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু তারপরেও হয়রানি চলতে থাকে এবং ২০১৯ সালে ওই দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয় এবং দুই লাখ ডলার জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।

দুই সন্তানের পিতা মি. মঈনশিরাজী বলেন, তাদের কপালে যে দীর্ঘ কারাবাস আছে সেটা তাদের আইনজীবী একরকম নিশ্চিত করার পর, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০১৯ এর সেপ্টেম্বর মাসে তারা গোটা পরিবার তুরস্কে পালিয়ে যান।

সেঈদ আহমদ মঈনশিরাজী এবং শবনম শাহরোখি

ছবির উৎস, @picassomo on Instagram

ছবির ক্যাপশান, এই দম্পতি একসাথে মুষ্টিযুদ্ধের অনুশীলনের ভিডিও প্রায়শই সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছন

কৌঁসুলিরা তাদের পালিয়ে যাওয়ায় খুবই ক্ষিপ্ত হন এবং তাদের অনুপস্থিতিতে ১৬ বছরের কারাদণ্ড, ৭৪বার বেত্রাঘাত এবং জরিমানার সাজা দেন।

মি. মঈনশিরাজী বলেন সরকার এই শাস্তিকে দৃষ্টান্তমূলক হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছে, ঠিক যেটা ঘটেছে মিস খিশভান্দের ক্ষেত্রেও।

ইরান সরকারের ঘনিষ্ট বলে মনে করা হয় এমন একটি বেসরকারি বার্তা সংস্থা 'রোকনা'কে দেয়া সাক্ষাৎকারে মিস খিশভান্দ তার সাজার কথা বলেছেন। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তবে তিনি আশা করছেন সরকার তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করবেন।

ইতোমধ্যে, রোকনাতে মিস খিশভান্দকে নিয়ে একটি মুখরোচক নিবন্ধও ছাপা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এক দম্পতির সন্তান ফতেমা। তার শিশুকাল স্বাভাবিক ছিল না। ইনস্টাগ্রামে খ্যাতির জন্য তার আকুতি, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই অস্বাভাবিক স্পৃহার পেছনে রয়েছে তার লেখাপড়ার অভাব, অনৈতিকতা এবং মানসিক অসুস্থতা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইরান বিষয়ক গবেষক তারা সেপেহরি ফার বলছেন, ফতেমা খিশভান্দকে ক্যামেরার সামনেও আনা হয়েছে তার মানসিক অসুস্থতা এবং তার অস্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা নিয়ে কথা বলার জন্য।

গত বছর গ্রেফতার করার পর ইরানী টিভিতে সাহার তাবারের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়।

ছবির উৎস, IRTV2

ছবির ক্যাপশান, গত বছর গ্রেফতার করার পর ইরানী টিভিতে সাহার তাবারের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়।

আপাতত মিস খিশভান্দকে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি তার কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করলে তাকে জামিন দেয়া হয়।

"এটা আইনজীবীদের পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকারের পরিকল্পনা মেনে টিভিতে অপরাধ স্বীকার করতে রাজি হওয়ার ছোট একটা পুরস্কার," বলছেন তার সাবেক আইনজীবী সাঈদ ধেগান।

তবে শেষ পর্যন্ত তার আপিলের পরিণতি কী হবে সেটা পুরোই নির্ভর করবে কৌঁসুলিদের মর্জির ওপর।

এই কিশোরী এবং তার নিজেকে নিয়ে তৈরি ব্যঙ্গচিত্রের মধ্যে কর্তৃপক্ষ অন্তত কোন ফারাক করতে রাজি নন বলেই তার সাবেক আইনজীবী মনে করেন।

বিবিসি নিউজের জশুয়া নেভেটকে এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন বিবিসি পার্সিয়ান বিভাগের সাংবাদিব সোরৌশ পাকযাদ।