ওয়ালডেমার হাফকিন: কলেরা ও প্লেগের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার পরও যার নাম ভুলে গেছে মানুষ
- Author, জোয়েল গুন্টার ও বিকাশ পান্ডে
- Role, বিবিসি নিউজ
উনিশ শতকের শেষভাগে ওয়ালডেমার মোরডেকাই হাফকিন প্যারিস এবং ভারতে গবেষণা চালিয়ে কলেরা ও প্লেগ রোগের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করেন। কিন্তু গণ-বিষক্রিয়ার এক ঘটনা তার জীবনকে তছনছ করে দেয়।


ছবির উৎস, Wellcome Trust
আঠারোশো চুরানব্বই সালের বসন্তকাল।
ওয়ালডেমার হাফকিন হাজির হলেন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায়। বসন্তকাল ছিল কলেরার মৌসুম। তিনি মনে করছিলেন, এ সময়টাতে তিনি শহরে কলেরার প্রকোপ দেখতে পাবেন।
এর আগের বছর মার্চ মাসে তিনি প্রথম ভারতে যান। তার সাথে ছিল এমন এক ভ্যাকসিন, যেটা দিয়ে তিনি আশা করছিলেন কলেরা প্রতিরোধ সম্ভব হবে। কিন্তু ভারতে পৌঁছানোর পর তিনি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হন।
ভারতের মাটিতে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই ব্রিটিশ ভারতের মেডিকেল কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ জনগণ তার টিকা নিয়ে সন্দেহ করতে থাকে, তার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। কারণ তিনি কোন ডাক্তার নন, তিনি ছিলেন একজন প্রাণীবিজ্ঞানী।
ওয়ালডেমার হাফকিন একজন রাশান ইহুদি, যিনি কাজ শুরু করেন ওডেসা শহরে। পরে প্যারিসে গিয়ে তিনি আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সে সময়টাতে অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে লোকের মনে ছিল ঘোর সন্দেহ।

ছবির উৎস, Wellcome Trust
ওয়ালডেমার হাফকিন যখন ভারতে যান তখন তার বয়স ছিল ৩৩ বছর।
তার তৈরি নতুন টিকার পরীক্ষা নিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন। এই ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ইনজেকশনের মাধ্যমে। কিন্তু প্রথম ইনজেকশনের পর পরীক্ষায় যোগদান করা ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ইনজেকশন দিতে গিয়ে মি. হাফকিনের সহকর্মীরা সমস্যায় পড়ে যান। দ্বিতীয় টিকা নিতে আগ্রহী লোক আর খুঁজে পাওয়া যেত না।
কলেরার প্রকোপ পুরো ভারত জুড়ে হলেও কোন একটি জায়গায় প্রকট আকারে দেখা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন, মি. হাফকিন ওই বছর উত্তর ভারতে প্রায় ২৩,০০০ লোকের ওপর তার নতুন টিকা প্রয়োগ করেন।
এরপর তার নিজের লেখায় তিনি বলেন, "কিন্তু সে বছর সেখানে কোন কলেরাই দেখা যায়নি। ফলে এই নতুন টিকা আদৌ কাজ করছে কিনা, সেটা বোঝার কোন উপায় রইল না।"
কিন্তু ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে ওয়ালডেমার হাফকিনের সামনে নতুন একটি সুযোগ আসে।
কলকাতায় ব্রিটিশ ভারত সরকারের মেডিকেল অফিসার তাকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। শহরের একটি বস্তির পুকুরে কলেরার ব্যাসিলাই জীবাণু রয়েছে কিনা, তা শনাক্ত করতে তাকে সাহায্য করতে হবে। বস্তিবাসী সব পরিবার ওই পুকুর থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করতো। ফলে তারা নিয়মিতভাবে কলেরায় আক্রান্ত হতো।

ছবির উৎস, Getty Images
আরো পড়তে পারেন:
মি. হাফকিনের কাছে তার নতুন তৈরি টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য এসব বস্তি ছিল আদর্শ এক জায়গা। বস্তির প্রতিটি বাড়ির অবস্থা একই রকম। বাসিন্দারা সবাই একইভাবে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন।
তিনি যদি প্রতিটি পরিবারের বাছাই করা কয়েক জনকে টিকা দেন এবং বাকিদের টিকা না দেন, তাহলে যথেষ্ট সংখ্যক পরিবারের ওপর তার এই পরীক্ষা থেকে একটা অর্থপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছিলেন।
মার্চ মাসের শেষ নাগাদ কলকাতার কাঁঠালবাগান বস্তিতে দু'জন লোক কলেরায় আক্রান্ত হন। এটা ছিল নতুন প্রকোপের প্রথম ইঙ্গিত।
ওয়ালডেমার হাফকিন বস্তিতে চলে যান এবং বস্তির প্রায় ২০০ জন বাসিন্দার মধ্যে ১১৬ জনকে তার তৈরি টিকা দেন। তার টিম পরে লক্ষ্য করে যে বস্তির আরও ১০ জন কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এদের কাউকেই টিকা দেয়া হয়নি। এদের মধ্যে ১০ জন মারা যায়।
এই ফলাফলে আশান্বিত কলকাতার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও কয়েকটি জায়গায় এই নতুন টিকার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে রাজি করানো ছিল একটা কঠিন কাজ।
ভারতে ব্রিটিশ স্বাস্থ্য সেবা ছিল জোর করে চাপিয়ে দেয়ার এক ব্যবস্থা। এর প্রতি মানুষের আস্থা ছিল কম। আর টিকা জিনিসটা সম্পর্কেই মানুষের কোন ধারণা ছিল না।
এই সমস্যা সমাধানে মি. হাফকিন একটা কৌশল বের করলেন। তিনি ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের বাদ দিয়ে ডা. চৌধুরী, ডা. ঘোষ, ডা. চ্যাটার্জি এবং ডা. দত্তদের মতো ভারতীয়দের সাথে নিয়ে কাজ শুরু করলেন।
তিরি আরও একটা কৌশল তৈরি করলেন: সেটা হলো, তার উদ্ভাবিত টিকা জনসমক্ষে তিনি নিজের দেহে প্রয়োগ করলেন। উদ্দেশ্য: দেখানো যে এটা নিরাপদ।

ছবির উৎস, Popular Science Monthly
"যেটা অবাক করার মতো তা হলো - এবং যেটা প্রায়ই লোকে ভুলে যায় - যে প্রথম দিকে বাধা এলেও এক সময়ে মি. হাফকিনের কলেরা টিকা নেয়ার জন্য লোকে লাইন দিতে শুরু করেছিল," বলছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান ও মেডিসিনের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক প্রতীক চক্রবর্তী।
"ভারতীয় ডাক্তারদের সাথে নিয়ে তিনি দিনরাত বস্তিতে বস্তিতে ঘুরতে শুরু করেন। বস্তির মজদুররা কাজে বেরুনোর আগে তিনি তাদের টিকা দিতেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময়েও তারা দেখতে পেত যে মি. হাফকিন তেলের বাতি জ্বালিয়ে বস্তিতে এক মনে কাজ করে যাচ্ছেন।"
কলকাতার বস্তিতে এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মি. হাফকিন স্বল্প সংখ্যক বিজ্ঞানীদের একজনে পরিণত হন, যারা শিখেছিলেন বিশ্বব্যাপী মহামারিকে কীভাবে বুঝতে হয় আর কীভাবে এর মোকাবেলা করতে হয়।
কিন্তু তার আগে বসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কারক ডা. এডওয়ার্ড জেনার কিংবা তারপরে পোলিও রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক জোনাস সাল্ক'র মতো ওয়ালডেমার হাফকিন ভারতে কিংবা ইউরোপে তেমন একটা পরিচিতি পাননি।
"ওয়ালডেমার হাফকিন হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ভারতের মতো কোন গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ল্যাবরেটরিতে তৈরি ওষুধ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন," বলেন অধ্যাপক চক্রবর্তী। "তিনি ছিলেন প্যারিসের এক বিজ্ঞানী, যিনি হাজির হয়েছিলেন কলকাতার বস্তিতে। খুবই নাটকীয় ছিল তার কাহিনী।"

আঠারোশো চুরাশি সালে মি. হাফকিন যখন ওডেসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন, তখন ওই বিভাগে শিক্ষক পদে তাকে যোগ দিতে দেয়া হয়নি। কারণ তিনি ছিলেন একজন ইহুদি।
এর পাঁচ বছর আগে তিনি এক রাজনৈতিক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। রুশ সেনাবাহিনীর ক্যাডেটরা স্থানীয় একজন ইহুদির ঘরদোর ভাঙচুর করার সময় তিনি বাধা দেন। তখন তাকে মারধর করা হয় এবং গ্রেফতার করা হয়। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
আঠারোশো আটাশি সালে ওয়ালডেমার হাফকিন দেশত্যাগ করে প্রথমে জেনেভায় যান এবং পরে প্যারিসে গিয়ে লুই পাস্তুর ইন্সটিটিউটের লাইব্রেরিয়ানের পদে যোগদান করেন। ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণায় এই ইন্সটিটিউট ছিল বিশ্ব সেরা।
কাজের অবসরে মি. হাফকিন হয় বেহালা বাজাতেন, নয়তো ব্যাকটেরিওলজি ল্যাবরেটরিতে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন।
পাস্তুর এবং জেনারের গবেষণার পথ ধরে তিনি দেখতে পান যে ল্যাবরেটরির গিনিপিগের দেহের মধ্যে প্রায় ৩৯ বার কলেরার জীবাণু ঢুকিয়ে বের করার পর জীবাণুর শক্তি বেড়ে যায়। এরপর তাপ প্রয়োগ করে ওই ব্যাকটেরিয়ার শক্তিকে কমিয়ে ফেলা যায়।
এরপর গিনিপিগের শরীরে একবার শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া আর একবার দুর্বল ব্যাকটেরিয়া ঢোকানোর পর গিনিপিগের দেহে এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়, যা দিয়ে কলেরার প্রাণঘাতী জীবাণুকে প্রতিহত করা সম্ভব।

ছবির উৎস, Wellcome Trust
সম্পর্কিত খবর:
তখনকার দিনে লোকে মনে করতো কলেরার মতো রোগ তৈরি হয় বিষাক্ত বাষ্প থেকে।
অধ্যাপক চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, আর এসব রোগের চিকিৎসার জন্য ছিল নানা পদ্ধতি। যেমন: রোগীকে বাথটাবে ডুবিয়ে তার ওপর গরম পানির বাষ্প ছাড়া হতো যতক্ষণ পর্যন্ত রোগী অবস্থা মরো মরো না হয়। কিংবা সব জায়গায় কার্বলিক অ্যাসিড ছিটিয়ে দেয়া হতো।
কিন্তু ওয়ালডেমার হাফকিন ও অন্যান্যদের গবেষণার মধ্য দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক নতুন কায়দা আবিষ্কৃত হয়। সেটা হলো: ল্যাবরেটরিতে তৈরি শক্তিশালী ও দুর্বল ব্যাকটেরিয়া রোগীর দেহে প্রবেশ করিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এবং প্রাণঘাতী জীবাণুকে পরাস্ত করা।
প্যারিসে গিনিপিগের ওপর পরীক্ষার সাফল্যের পর মি. হাফকিন খরগোশ এবং কবুতরের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালান। এবার তার কাজ হবে মানবদেহে এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানো।
১৮৯২ সালের ১৮ই জুলাই তিনি ইনজেকশন দিয়ে নিজের দেহে দুর্বল ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু প্রবেশ করান। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন। প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন। পরে অবশ্য সেরে ওঠেন।
এরপর তিনি কয়েকজন রুশ বন্ধু এবং কয়েকজন ভলান্টিয়ারের ওপরও তার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেন। কিন্তু তাদের দেহে কোন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন তার ভ্যাকসিনটি এখন আরও বড় পরিসরে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত।
কিন্তু বড় সংখ্যায় লোকের ওপর এই পরীক্ষার জন্য তার প্রয়োজন ছিল এমন একটি দেশ যেখানে প্রতি বছর কলেরার মহামারি হয়। ১৮৯৩ সালে প্যারিসে তখনকার ব্রিটিশ দূত এবং এক সময়ে ভারতের বড়লাট লর্ড ফ্রেডরিক ডাফরিন ওয়ালডেমার হাফকিনের কথা জানতে পারেন এবং তাকে বাংলায় গিয়ে পরীক্ষা চালানোর পরামর্শ দেন।

ছবির উৎস, Wellcome Trust
যে বছর মি. হাফকিন কলকাতার বস্তিতে তার সফল পরীক্ষা চালান, তার পরের বছর আসামের চা বাগানের মালিকরা তাকে আমন্ত্রণ জানান সেখানে গিয়ে বাগানের শ্রমিকদের ওপর তার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে। তিনি সেখানে হাজার হাজার শ্রমিককে টিকা দেন।
কিন্তু ১৮৯৫ সালের শরৎকালে তিনি নিজেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ইংল্যান্ডে যান। তার নিজের হিসেব অনুযায়ী, ততদিন পর্যন্ত তিনি ৪২,০০০ লোককে তিনি কলেরার টিকা দিয়েছিলেন।
মি. হাফকিন লক্ষ্য করলেন, তার তৈরি টিকায় রোগীর সংখ্যা কমে এলেও মৃত্যুর হার কমাতে পারছে না। ১৮৯৬ সালে তিনি যখন ভারতে ফিরে আসেন তখন এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি দুটো কৌশল অবলম্বনের চিন্তা করেন।
কিন্তু তখন বোম্বাই শহরে দেখা দিয়েছিল নতুন এক বিপদ। আর সেটাই ওয়ালডেমার হাফকিনের জন্য কলেরার গবেষণার দুয়ার চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিল।
প্লেগ রোগের বিশ্বব্যাপী তৃতীয় মহামারিটি শুরু হয়েছিল ১৮৯৪ সালে চীনের ইউনান শহর থেকে। সেখান থেকে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। হংকং সে সময় ছিল ব্রিটেনের শাসনাধীন। এই মহামারি ওই শহরে পৌঁছায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে প্লেগ এসে হাজির হয় ভারতের বোম্বাই শহরে।
প্রথম কেসটি ধরা পড়ে ১৮৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। জাহাজঘাটার কাছে এক চালের আড়তদারের বাড়িতে প্লেগ রোগ দেখা দেয়।
প্রথম দিকে ব্রিটিশ সরকার এই মহামারির তীব্রতাকে কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। কারণ তারা চাইছিল বন্দর নগরীর কাজকর্মের ওপর যেন মহামারির কোন প্রভাব না পড়ে। কিন্তু প্লেগ আগুনের মতো বোম্বাইয়ের ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এই রোগে মৃত্যুর হার কলেরা মহামারিতে মৃত্যুর হারের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ঠিক এই সময়টাতে ব্রিটিশ সরকার ওয়ালডেমার হাফকিনের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠায়।
আরও দেখতে পারেন:

ছবির উৎস, Wellcome Trust
মি. হাফকিন বোম্বাইতে যান। সেখানে গিয়ে ল্যাবরেটরির জন্য ছোট একটি ঘর, একজন কেরানি এবং তিনজন প্রশিক্ষণহীন সহকারীকে নিয়ে শুরু করেন প্লেগ রোগের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরির কাজ।
"তার জায়গা ছিল কম, লোকবল ছিল কম, সুযোগ-সুবিধেও খুব একটা ছিল না। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছিলেন এবং তার নিজস্ব একটি ল্যাবরেটরি ছিল," বলছিলেন দিল্লির একজন রোগত্ত্ববিদ চন্দ্রকান্ত লাহারিয়া।
"তিনি জানতেন তিনি যদি রেকর্ড সময়ের মধ্যে প্লেগ-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেন, তাহলে তিনি হবেন সেই সময়কার সেরা বিজ্ঞানী।"
সেই বছর পুরো শীতকাল জুড়ে মি. হাফকিন কঠোর পরিশ্রম করেন। ডিসেম্বর মাসে তিনি খরগোশের ওপর তার টিকা ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল লাভ করেন। ১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে তিনি তার নতুন ভ্যাকসিন মানবদেহের ওপর পরীক্ষার জন্য তৈরি হলেন।
দশই জানুয়ারি তিনি নিজে ১০ সিসি ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলেন। এটা ছিল মাপের দিক থেকে বেশি। কারণ তিনি মানুষের ওপর পরীক্ষায় মাত্র তিন সিসি ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরিকল্পনা করছিলেন।
এর জেরে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি জ্বরে পড়ে থাকার পর তিনি আবার ভাল হয়ে ওঠেন।
ওই মাসের শেষ নাগাদ বোম্বাইয়ের বাইকুলা জেলে প্লেগ রোগ দেখা দেয়। মি. হাফকিন সেখানে গিয়ে বন্দিদের ওপর সীমিত আকারে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানোর অনুমতি পান।
তিনি ১৪৭ জন বন্দীকে টিকা দেন। অন্য ১৭২ জনকে টিকা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেখা যায় যাদের টিকা দেয়া হয়নি তাদের মধ্যে ১২ জনের প্লেগ হয় এবং এদের মধ্যে ছয়জন মারা যায়। অন্যদিকে, যাদের টিকা দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে দু'জনের প্লেগ হয় এবং এদের কেউই মারা যায়নি।

বাইকুলা কারাগারে পরীক্ষায় এই সাফল্যের পর ভ্যাকসিন উৎপাদনে গতি বৃদ্ধি হয়।
মি. হাফকিনকে তার ছোট্ট অফিস থেকে সরিয়ে সরকারের একটি বিশাল বাংলো দেয়া হয়। বোম্বাইয়ের ইসমাইলিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান আগা খান পরে তাকে একটি বিশাল বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে আসেন। আগা খান নিজে এবং খোজা মুসলমান সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় এই টিকা নেন।
পরবর্তী এক বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষ মি. হাফকিনের তৈরি টিকা নেন। অসংখ্য লোকের জীবন রক্ষা হয়। ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া তাকে সম্মানসূচক নাইট উপাধি দেন।
এরপর ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে ওয়ালডেমার হাফকিনকে বোম্বাইয়ের পারেল-এর সরকারি প্লেগ গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য পরিচালক পদে নিয়োগ করা হয়। এই নতুন গবেষণাগারে ছিল নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধে আর ছিল ৫৩ জন কর্মচারী।
আর ঠিক তখনই ঘটে বিপর্যয়।

উনিশশো দুই সালের মার্চ মাসে মি. হাফকিনের টিকা নেয়ার পর পাঞ্জাবের মালকোয়াল গ্রামে ১৯ জন ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়। একই গ্রামের আরও ৮৮ জনকে টিকা দেয়া হলেও তাদের কিছু হয়নি।
যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায় যে পারেল গবেষণাগারে ৪১ দিন আগে তৈরি একটি বিশেষ বোতলের ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
এ নিয়ে ভারত সরকারের একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। তারা দেখতে পায় যে বোতল শুদ্ধি করার জন্য কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার না করে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা বিশুদ্ধ করা হয়েছিল। আর এটা করা হয়েছিল মি. হাফকিনের নির্দেশে। কারণ, এইভাবে বেশি সংখ্যক বোতল দ্রুততম সময়ে বিশুদ্ধ করা যেত।
এই তাপমাত্রা প্রয়োগের পদ্ধতি তার দু'বছর আগে থেকেই বিশ্বখ্যাত লুই পাস্তুর ইন্সটিটিউটে ব্যবহার হয়ে আসছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তা অজানা ছিল।
এই তদন্তের পর মি. হাফকিনকে প্লেগ গবেষণাগারের প্রধানের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।

ছবির উৎস, Wellcome Trust
সরকারের এই পদক্ষেপে লাঞ্ছিত হয়ে মি. হাফকিন ভারত ত্যাগ করেন এবং লন্ডনে চলে যান। দ্রুততম সময়ে প্লেগ-এর টিকা আবিষ্কার এবং মহারানীর খেতাব পাওয়ার পরও ওয়ালডেমার হাফকিন টের পান যে তিনি আসলেই বাইরের লোক।
তবে এই অভিজ্ঞতা তার জন্য একেবারেই নতুন ছিল না।
"সেই জামানায় নানা ধরনের পক্ষপাত কাজ করতো। নানা ধরনের বৈষম্য কাজ করতো," বলছেন ড. বারবারা হগুড, যিনি ওয়ালডেমার হাফকিনের কর্ম ও জীবন সম্পর্কে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন।
"তিনি যেহেতু মেডিসিনের ডাক্তার ছিলেন না, তাই তিনি হলেন বাইরের লোক। অনেক ধরনের অহমিকাও তখন কাজ করতো।"
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক এলি শারনিন মি. হাফকিনের চিঠিপত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, "মি. হাফকিন ইহুদি-বিরোধী মনোভাবের শিকার হয়েছিলেন কাগজপত্র দেখে একথা প্রমাণ করা না গেলেও তিনি যে ইহুদি এবং সেটা দ্বারা ব্রিটেনের তৎকালীন এডওয়ার্ডিয়ান প্রশাসন ব্যবস্থা মোটেও প্রভাবিত ছিল না, এটা সরল মনে বিশ্বাস করাও কঠিন।"

সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়ার দু'বছর পর ১৯০৪ সালে ভারতে প্লেগের প্রকোপ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তাতে ১১ কোটি ৪৩ লক্ষ ৯৯৩ জন মারা যায়। এই লড়াইয়ে মি. হাফকিনের ভ্যাকসিনই ছিল প্রধান অস্ত্র।
কিন্তু এর আবিষ্কারক তখন লন্ডনে নিজের সুনাম রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
মালকোয়ালের দুর্ঘটনার চার বছর পর সরকার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং মি. হাফকিনকেই দোষী সাব্যস্ত করে।
প্রতিবেদনের দলিল-দস্তাবেজ ঘাটাঘাটি করে লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ডাব্লু. জে. সিম্পসন ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে লেখা এক চিঠিতে যুক্তি তুলে ধরেন যে ভ্যাকসিনের বোতলটি পারেল গবেষণাগারে নষ্ট হয়নি। সেটি নষ্ট হয়েছিল পাঞ্জাবের গ্রামে যেখানে টিকা কর্মসূচি চলছিল।
এই চিঠি প্রকাশিত হওয়ার পর ওয়ালডেমার হাফকিনের প্রতি ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের সমর্থন বাড়তে থাকে। ম্যালেরিয়া যে একটি মশা-বাহিত রোগ একথা প্রমাণ করে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন ডা. রোনাল্ড রস। তিনি লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় চারটি কঠোর চিঠি লিখে ব্রিটিশ জাতির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে অবহেলা করার অভিযোগ করেন।
তিনি লেখেন, যতদিন পর্যন্ত ওয়ালডেমার হাফকিনের বিরুদ্ধে রায় বদলে দেয়া না হবে ততদিন পর্যন্ত ভারতে ব্রিটিশ সরকার "তার একজন শীর্ষ উপকারীর বদান্যতার প্রতি অকৃতজ্ঞ বলেই বিবেচিত হতে থাকবে।"
রোনাল্ড রস সে সময় আরেকটি ভবিষ্যতবাণী উচ্চারণ করেছিলেন যা আজকের দিনেও প্রযোজ্য।
তিনি বলেছিলেন, যে সময়ে প্রতি সপ্তাহে ৫০,০০০ মানুষ প্লেগ রোগে মারা যাচ্ছে, সেই সময়ে যদি মিথ্যে প্রচার করা হয় যে গবেষণাগারে তৈরি ভ্যাকসিন দূষিত তাহলে যে কোন ভ্যাকসিনের ওপর থেকেই মানুষের আস্থা চলে যাবে।

সরকারের এই অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লেখালেখির জেরে বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০৭ সালের নভেম্বর মাসে ওয়ালডেমার হাফকিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করা হয়। তাকে ভারতে তার কাজে ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হয়।
তিনি খুশি মনেই তার নতুন কাজের জায়গা ক্যালকাটা বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরির পরিচালকের পদে যোগদান করেন।
কিন্তু তার দায়মুক্তি ছিল অসম্পূর্ণ। তিনি তার গবেষণায় কোন ধরনের প্রয়োগ করতে পারতেন। তাকে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণা চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
"মালকোয়ালের ঘটনার অন্যায় শাস্তি এখনও আমার ওপর বহাল রয়েছে," এক চিঠিতে তিনি স্যার রোনাল্ড রসের কাছে লিখেছিলেন। "প্রতি মুহূর্তে লিখিতভাবে কিংবা মৌখিক বক্তব্যে এটা বার বার করে উল্লেখ করা হয় এবং মনে করিয়ে দেয়া হয় যে ওই ঘটনার জন্য আমি আগেও দায়ী ছিলাম এবং এখন দায়ী আছি।"
পরবর্তী সাত বছর ছিল ওয়ালডেমার হাফকিনের জন্য নিষ্ফল এক সময়।
তার জীবদ্দশায় তিনি ৩০টির মতো গবেষণাপত্র লিখলেও, ১৯০৭ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে তার গবেষণাপত্র ছাপা হয় মাত্র একটি। ১৯১৪ সালে ৫৫ বছর বয়সে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। এবং চিরদিনের জন্য ভারত ত্যাগ করেন।
মালকোয়ালের বিপর্যয় তার জীবনে যে কালিমা লেপে দিয়েছিল তা কখনই মুছে যায়নি। আর সেই ক্ষত রয়ে যায় সারা জীবন।

১৮৯৭ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে বোম্বাই থেকে দুই কোটি ৬০ লক্ষ ডোজ প্লেগের ভ্যাকসিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়।
হাফকিন গবেষক বারবারা হউড লিখেছেন, এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ছিল ৫০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ। কিন্তু ওয়ালডেমার হাফকিনের এই ভ্যাকসিন "কত মানুষের জীবন রক্ষা করেছে তার কোন হিসেব নেই।"
"এটা নিশ্চয়ই বিশাল এক সংখ্যা," মনে করেন তিনি।
ভারত থেকে ওয়ালডেমার হাফকিন চলে যান প্যারিসে। সেখানে তিনি পূর্ব ইউরোপে ইহুদিদের শিক্ষার উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি কখনও বিয়ে করেননি। তার শেষ জীবন কাটে সু্ইটজ্যারল্যান্ডের লুজান শহরে। ১৯৩০ সালে ৭০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
যে দুই কামরার ল্যাবরেটরি থেকে ওয়ালডেমার হাফকিন প্লেগের ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন সেটি এখন মুম্বাইয়ের কেপিএম হাসপাতালের অংশ। ওই আবিষ্কারের একশো' বছরেরও বেশি সময়র পর এই হাসপাতালটি আরেকটি মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পুরোভাগে রয়েছে। সেটি হলো নভেল করোনাভাইরাস।
"করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কেপিএম যে প্রথম কাতারে থেকে লড়ছে, এটা তার প্রতি একটা শ্রদ্ধার প্রতীক," বলছেন দিল্লির রোগত্ত্ববিদ চন্দ্রকান্ত লাহারিয়া।
"বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করতে তিনি বহু বিজ্ঞানীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। কিন্তু কোন কারণে সবাই তার নাম ভুলে গেছে। আমাদের মনে রাখা উচিত যে দুই কামরার ছোট্ট একটি ল্যাব থেকে খুবই অল্প সংখ্যক সহকর্মী নিয়ে তিনি কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করতে পেরেছিলেন। এটা অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার।"
তবে একদিক থেকে ওয়ালডেমার হাফকিনের নাম একেবারে মুছে যায়নি।
তার মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে ১৯২৫ সালে তার সমর্থক ও অনুসারীরা ভারত সরকারের কাছে আর্জি জানায় যে বোম্বাইয়ের পারেল গবেষণাগারের নাম পাল্টে "দ্যা হাফকিন ইন্সটিটিউট" রাখা হোক। সরকার এতে রাজি হয় ।
সেই থেকে ওয়ালডেমার হাফকিনের নামটি এখনও জীবিত রয়ে গেছে।









