জনারণ্যের জার্নাল: পিতা, ভ্রাতা বা স্বামী, নারীর জন্য সবার হাতেই 'থার্ড ডিগ্রি'

ছবির উৎস, আফরোজা সোমা
- Author, আফরোজা সোমা
- Role, কবি ও লেখক, ঢাকা।
ফুলের মতন মেয়ে জুঁইয়ের কথা বলি। হাওয়া আক্তার জুঁই। উচ্চবিদ্যালয়ের সীমানা পেরোতে না-পেরোতেই বিয়ে। স্বামী প্রবাসী। বিয়ের পর জুঁইকে পড়ালেখা চালাতে নিষেধ করেন স্বামী রফিকুল ইসলাম।
নিষেধ মানেনি মেয়ে। রফিকুলকে না জানিয়ে গোপনে কলেজে ভর্তি হন। চালাতে থাকেন পড়ালেখা। কিন্তু খবর গোপন থাকেনি। রফিকুল সব জেনে যায়।
রফিকুল দেশে ফেরে ২০১১ সালে। স্ত্রীকে সারপ্রাইজ দেবে বলে চোখ বন্ধ করতে বলে। তারপর চাপাতির এক কোপে কেটে ফেলে তার ডান হাতের চারটি আঙুল।
হ্যাঁ। সারপ্রাইজ-ই বটে।
একবিংশ শতকের বাংলাদেশে স্বামীর অমতে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ায় মধ্যযুগীয় কায়দায় শাস্তি দিয়ে জুঁইয়ের আঙুল কেটে নেয় তার নিয়ন্ত্রণবাদী স্বামী।

ছবির উৎস, STR
এই আঙুল কাটার প্রসঙ্গেই একবার মনশ্চক্ষে দেখে নিন হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত 'চন্দ্রকথা' সিনেমার একটি দৃ্শ্য। সেই দৃশ্যে সুপারি কাটার যন্ত্র— ছৎরার ভেতর আটকানো চন্দ্র'র বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুল।
গ্রামের মেয়ে চন্দ্র'র বিয়ে হয় জমিদারিহীন জমিদার সরকার সাহেবের সাথে। চন্দ্রের অপরাধের শাস্তি হিসেবে ছৎরা দিয়ে আঙুল কাটার সিদ্ধান্ত নেন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। আঙুল কাটার আগে চন্দ্রর আঙুল হাতে নিয়ে স্বামী বলেন, "বাহ! কী সুন্দর আঙুল। আমি এখন নিজের হাতে তোমার একটা আঙুল কেটে ফেলবো। অপরাধের শাস্তি"।
জুঁই, আয়শা, রুমানা মঞ্জুর...
স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে পড়ালেখা কম জানা প্রবাসী শ্রমিক রফিকুল, উচ্চশিক্ষিত রুমানা মঞ্জুরের স্বামী সাইদ হাসান, রূপালি পর্দার চরিত্র সরকার সাহেব এবং পুরাণের চরিত্র রামের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। নারীকে লক্ষণগণ্ডির ভেতর বন্দী করে রাখতে মিথের চরিত্র থেকে বাস্তবের পিতা-ভ্রাতা-স্বামী— কেউ কারো চেয়ে কম নয়।
প্রেমের নামে, স্নেহ-মায়া-মমতার নামে, পরিবারের মান-সম্মানের নামে, সমাজের রীতি-নীতি-প্রথা-সংস্কৃতির নামে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, নারীর শরীর ও মন সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষ। পিতা-ভ্রাতা-স্বামী ও পুত্রের ক্ষমতার দণ্ডকে সিস্টেমিকভাবে আরো পাকা-পোক্ত করেছে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক বিবিধ নিয়মাবলী।

ছবির উৎস, Allison Joyce
দেশের অধিকাংশ নারীর জীবন 'ন ডরাই' সিনেমার আয়শার চেয়ে বিশেষ আলাদা নয়। দরিদ্র্র পরিবারের মেয়ে প্রতিভাময়ী আয়শা। সার্ফার হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার রক্ষণশীল বড় ভাই আয়শার আশার পথে কাঁটা বিছিয়েছে।
নিষেধ-বারণ না শুনে গোয়ার্তুমি করে আয়শা তবু হাতে নিচ্ছিল সার্ফিং বোর্ড। তাই, পিটিয়ে-রক্তাক্ত করে দিনের পর দিন ঘরে তালা দিয়ে বন্দি করে রেখে আয়শাকে তার ভাই বুঝতে বাধ্য করে যে, সার্ফিং 'মেয়ে মানুষের' কাজ নয়।
একদিন আয়শার বিয়ে হয়ে যায়। পাত্র তার চেয়ে বয়সে ঢের বড়। তবে, আয়শার পরিবারের তুলনায় সে বড় ব্যবসায়ী, ভালো পরিবার। আয়শার মতন কত অগুন্তি আয়শার কাছ থেকে এই দেশে কেড়ে নেয়া হয় প্রিয় ফুটবল বা ক্রিকেট ব্যাট বা নাচের ঘুঙুর? কত জুঁই ও আয়শা বলি হয় স্বামীর সংসারের হাঁড়িকাঠে?
রাষ্ট্র আহত বা নিহতের পরিসংখ্যান রাখে শুধু। হাঁড়িকাঠে বলি হয়ে সংসারে উৎসর্গ হয়ে যাওয়াদের নাম কে কবে হিসেব রাখে টালি খাতায়?

বউ আর ঢোল বাড়ির ওপরে রাখতে হয়...
বাস্তবের জুঁইয়ের আঙুল কেটে দেয় মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী স্বামী। রূপালী পর্দার আয়শাকে মেরে আহত করে হাসপাতালে পাঠায় স্বামী। রোমানা মঞ্জুরকে অন্ধ করে দিয়েছিল যে, সে-ও 'পরম পতি'। এইভাবে ঘরে ঘরে নারীর জন্য আজও চালু আছে 'থার্ড ডিগ্রি'।
প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আপামর নারীর জন্য জারি থাকা থার্ড ডিগ্রিকে সমাজও অনুমোদন করে বৈকি! সামাজিক অনুমোদন থেকেই তৈরি হয় প্রবাদ 'বউ আর ঢোল বাড়ির ওপরে রাখতে হয়'!
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, বন্দির উপরে নানান কায়দায় শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে তার থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের কৌশলকে বলা হয় থার্ড ডিগ্রি। লোহার রড, চাবুক, কাঠ বা যে কোনো কিছু দিয়ে পেটানো, অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় আপনজনদের তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, হাত-পা বেঁধে পেটানো, যৌন অত্যাচার করা, শরীরের বিভিন্ন অংশে বা যৌনাঙ্গে ছ্যাকা দেয়া থেকে শুরু করে আরো বিভৎস কায়দায় নির্যাতন করাকেই থার্ড ডিগ্রি বলে বোঝানো হয়।
এদেশের পত্রিকার পাতাগুলো স্বাক্ষী। নারীরা এদেশে দাসস্য দাস। তাদেরকে বেঁধে পেটানো থেকে শুরু করে ছ্যাকা দেওয়া বা মারতে মারতে মেরে ফেলা— এসবই আকছার ঘটে। আর চড়-চাপড় মারা বা কথার ঘায়ে বিদ্ধ ও রক্তাক্ত করা তো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।

ছবির উৎস, coldsnowstorm
অত্যাচারের ইতিহাস পুরনো। রাজা-রাজড়াদের আমলে নৃশংস পন্থায় নির্যাতনের নানা বিবরণ ইতিহাসে আছে। 'মধ্যযুগীয় বর্বরতা' তো নৃশংসতার উপমা হয়ে গেছে। তবে, আজকের দুনিয়ায় নিজেদের সভ্য দাবি করা রাষ্ট্রগুলোতে কোনো বন্দির জন্যই থার্ড ডিগ্রি অনুমোদিত নয়। এই তরিকায় এমনকি গুরুতর অপরাধীর স্বীকারোক্তি আদায় করতে গেলেও এখন উল্টে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়ন করা হয়।
কিন্তু এদেশে নারীর জন্য এখনো জারি আছে থার্ড ডিগ্রি। স্ত্রী পেটানোর সংস্কৃতিকে আমি 'থার্ড ডিগ্রি' ছাড়া আর কোনো নামেই অভিহিত করতে চাই না। স্ত্রী পেটানো এদেশে এখনো আইনীভাবে নিষিদ্ধ নয়।
স্বামীর অমতে মেয়েটি যদি গান-নাচ-নাটকের চর্চা করতে চায় তবে অনেকক্ষেত্রেই তার কপালে জোটে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন। বিয়ের পর স্ত্রী হচ্ছেন তার সম্পত্তি। ফলে, স্ত্রীকে 'শাসনে রাখা' তার একান্ত কর্তব্য।
ঊন-মানুষের কথকতা...
রাজা-রাজড়াদের কাছে প্রজারা ছিল ঊন-মানুষ। প্রভুদের কাছে দাসরাও ছিল তাই, বস্তু তুল্য; মালিকের সম্পত্তি। এদেশের সামাজিক মনস্তত্বেও নারী আজও ঊন-মানুষ। সে আজও একদিকে পুরুষের সম্পত্তি, আরেকদিকে পুরুষের দায়িত্ব।

ছবির উৎস, James Morgan
জন্মিবামাত্র প্রতিটি মানবসন্তান স্বাধীন হলেও পিতৃতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে জন্মানোর অপরাধে বাংলাদেশের নারীরা আজও ঊনমানুষ। রাষ্ট্রে তাদের মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের বেশি কিছু নয়। সামাজিক মনস্তত্বেও নারী আজও স্বাধীন সত্তা নয়, নারী কেবলি পুরুষের মনোরঞ্জন ও সেবার নিমিত্তে নির্মিত এক বায়োরোবট বা দম দেয়া কলের পুতুল।
তাই, তাকে অল্প বা অধিক পেটানোর বৈধ অধিকার পিতা-ভ্রাতা-স্বামীর রয়েছে বৈকি! তাই, 'ন ডরাই'-এর আয়শাকে অবিবাহিত অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করে তার ভাই। আর বিয়ের পর স্বামীই হয় আয়শার শরীর মনের 'বৈধ মালিক'। তাই, আয়শাকে তার স্বামী মেরে পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে পাঠানোর দৃশ্যটিকেও আস্বাভাবিক ঠেকে না।
আসুন, পরিসংখ্যানে চোখ রাখি। ২০১৬ সালে ১৫ই জানুয়ারির প্রথম আলো জানাচ্ছে, "২০১১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের ফল ভয়াবহ। বাংলাদেশে প্রতি দশটা পরিবারের মধ্যে নয়টাতেই নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার"।
সহিংসতার এই ধরনটি কেমন? সেই বিষয়েও বিস্তারিত লেখা আছে প্রথম আলোর সেই কলামে, "পারিবারিক নির্যাতনের এই হিসাবে মানসিক নিপীড়ন অন্তর্ভুক্ত আছে। কাজেই এই প্রশ্ন খুব উঠবে যে শারীরিক নির্যাতন আসলে শতকরা কত ভাগ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরেও আপনার মাথা হেঁট হয়ে আসবে, তিনজন বিবাহিত নারীর দুজনই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, শারীরিকভাবে। এর মধ্যে চড়-থাপ্পড় আছে; কোনো না কোনো হাতিয়ার দিয়ে আঘাত আছে; কিল, ঘুঁষি, লাথি আছে; পোড়ানো আছে; অ্যাসিড ছোঁড়াও আছে।
''এঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, অনেকেই স্বামীর ভয়ে ডাক্তারের কাছে যাননি, কেউবা যাননি সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে। তিনজনের মধ্যে দুজন বউ পেটান? আর 'হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে'—সেটা তো আছেই। সবটা মিলিয়ে দশজনের নয় জনই বউ পেটান, হাতে বা ঠোঁটে।"
আমার দাদী সৈয়দ বানু পুরনো যুগের, ব্রিটিশ আমলের, মানুষ ছিলেন। তাঁর মুখে মাঝে-মধ্যে শুনতাম, 'বেডার রাগে বাদশাহ, বেডির রাগে বেশ্যা'। জেদ করে পুরুষ বাড়ি ছাড়লে সে ভুবন জয় করে বিজয়ীর বেশে ফিরতে পারে। কিন্তু নারী হয় পতিত কুসম। 'বেশ্যা'র চেয়ে ভালো আর কোনো খেতাব তার জোটে না। কেননা, তার পথে পথে পাতা আছে ফাঁদ। তাই, পর্দার শাবানার মতন ধৈর্য্য ধরে থাকা রপ্ত করে 'ভদ্রঘরের মেয়ে'।
বেশ্যা ও বিদুষীর গল্প...
এই ভূখন্ডের সামাজিক ইতিহাস বলে, নারীর জীবন সতত অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও লাঞ্ছনা সয়ে ঝিনুকের মতন মুখ বুজে পড়ে থাকার জীবন। নারীর জীবন নিয়ত সংগ্রাম আর বিদ্রোহের জীবন।
বন্দি পাখি হয়ে যে নারী থাকতে চায় না, যে নারী চায় মুক্ত আকাশের নিচে গান গাইবার অধিকার তার পথে বিছানো থাকে কাঁটা। নারী 'বেশ্যা' বা 'বিদুষী' যেই হোক, তারা যেনো একদিকে পুরুষের মাল-সামাল, আরেকদিকে পুরুষের দাস। মাল-সামাল আগলে রাখা মালিকের কর্তব্য; আর বিনা প্রশ্নে মালিকের হুকুম তামিল করাই দাসের জীবন।
কিন্তু সমাজ পাল্টাচ্ছে। হাওয়া আক্তার জুঁই-ই এর প্রমাণ। স্বামী আঙুল কেটে নিয়েছে। তার স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। স্বামীকে ছেড়ে নিজের বাসনাকেই বেছে নিয়েছে সে। ২০১১ সালে আঙুল হারালেও শ্রুতি লেখকের সহায়তায় ২০১২ সালে সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৩০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
সমাজ যে পাল্টাচ্ছে তার প্রমাণ রুমানা মঞ্জুর। ২০১১ সালে স্বামীর হাতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চোখের আলো হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করলেও তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। রুমানা ব্রেইল শিখেছেন। আইন বিষয়ে বিদেশে পড়ালেখা করে নতুন ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই কাজ শুরু করেছেন।
নারীর পড়ে পড়ে মার খাবার ইতিহাস নতুন নয়। পুরানের অহল্যা পাথর হয়ে রামের পদস্পর্শের অপেক্ষা করেছেন। আর রামের স্ত্রী সীতা সতীত্ব প্রমাণের জন্য একবার অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে রেহাই পাননি। দ্বিতীয়বারও রাম তাকে দিয়েছেন অগ্নিপরীক্ষার প্রস্তাব। এই প্রস্তাবের অপমান ও মনোপীড়া সইতে না পেরে মর্মাহত সীতা নিজেকে ধরণীর বুকে লুকিয়েছেন।
কিন্তু জুঁই বা রুমানা নিজেকে লুকিয়ে ফেলেননি। উঠে দাঁড়িয়েছেন। এই উঠে দাঁড়ানোর গল্পটাই নতুন। এই গল্পের সংখ্যা যত বাড়বে, নারীর জন্য জারি থাকা থার্ড ডিগ্রির বিরুদ্ধে ততই আওয়াজ উঠবে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এই আওয়াজ নিনাদ হয়ে ছড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত হে মানবিক মানুষ, আপনি নিশ্চিন্তে কী করে ঘুমান?








