ভারতের উত্তরপ্রদেশ কি ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে?

ছবির উৎস, মালবী গুপ্ত
- Author, মালবী গুপ্ত
- Role, সাংবাদিক, কলকাতা
ভারত যে ক্রমশ ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, তাতে বোধহয় আর সন্দেহের অবকাশ থাকছে না। এবং মনে হচ্ছে সেক্স ট্যুরইজম বা যৌন পর্যটনের মতো যদি লুকিয়ে চুরিয়ে এবার রেপ ট্যুরইজম বা ধর্ষণ পর্যটনও চালু হয়ে যায়, তাহলে ভারত বোধহয় হয়ে উঠবে পৃথিবীর অন্যতম গন্তব্য।
আর দেশের মধ্যে হয়তো উত্তরপ্রদেশই সেই পর্যটকদের, থুড়ি ধর্ষণকারীদের কাছে সব থেকে আকর্ষণীয় ও সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচ্য না হয়ে ওঠে। সে কথায় পরে আসছি।
আসলে মৃগয়ার কথা বলছিলাম না। প্রাচীন কালে রাজা রাজড়ারা তো প্রায়ই ঢাক ঢোল পিটিয়ে সপারিষদ মৃগয়া বা শিকারে যেতেন। তাঁদের কেউ কেউ লক্ষ্যবস্তুকে বিদ্ধ করে এবং তারপর তাকে হত্যা করে নিজের শৌর্য বীর্য প্রকাশ করতেন।
বহু আদিবাসী সমাজে পরাক্রম প্রদর্শনের এমন শিকার আজও অনুশীলিত হয়।

ছবির উৎস, SOPA Images
যত দূর জানি শিকার মানব সমাজে শুরু হয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ বছর আগে। আদিম যুগে যে শিকার ছিল মূলত খাদ্য হিসেবে মাংসের প্রয়োজন মেটাতে, সেই শিকারই এই আধুনিক সভ্যতাতেও বহাল তবিয়তেই টিকে আছে মাংসের পাশাপাশি অন্য চাহিদাও মেটাতে ।
এখন অবশ্য ভারত সহ বহু দেশেই অবৈধ বা বেআইনি হয়ে যাওয়ায়, শিকার চলে লুকিয়ে চুরিয়ে।
তবে তথাকথিত সভ্য সমাজে নারী ও শিশুকন্যাও কিন্তু এক শ্রেণীর লোকের শিকারই হয়ে উঠেছে। এবং তা আদৌ লুকিয়ে চুরিয়ে নয়। বরং বাড়ির মধ্যে, স্কুলে, পথে - ঘাটে, ক্ষেতে - খামারে, অফিসে, হাসপাতালে - প্রায় সর্বত্রই সেই মৃগয়া বা শিকার চলেছে।
বিশেষ করে দুর্বল ও প্রান্তিক মেয়েরাই যার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
শিকার করার উল্লাসে
দেখা যাচ্ছে কখনো প্রতিহিংসা চরিতার্থে, কখনো অন্যতর খিদে মেটাতে, কখনো শুধু শিকার করার উল্লাসে, আবার কখনো তাদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রেখে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সেই শিকার অব্যাহত। যে শিকারে সনাতনী হাতিয়ারের বদলে ধর্ষণকেই আয়ুধ হিসেবে বেছে নিচ্ছে ওই শিকারিরা।

ছবির উৎস, Hindustan Times
ধর্ষণকারীদের শিকারি বলছি বটে, তবে বন্যপশু শিকারিদের থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি নিষ্ঠুরতায়, সেইসব ধর্ষিতাদের তারা হত্যা করে। কখনো ভয়ঙ্কর অত্যাচারে অত্যাচারে অর্ধমৃত অবস্থায় তাদের ফেলে দিয়ে যায় কোনো মাঠে, প্রান্তরে।
এবং কখনো অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা, চরম নিষ্ঠুরতার বলি সেই সব মৃতপ্রায় ধর্ষিতারা শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচলেও, আজীবন পরিবারে, সমাজে তাদের অপমান আর অসম্মানের বোঝা নিয়েই যেন বেঁচে থাকতে হয়।
আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত
ভারতে নারী ও কন্যা শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিবিধ আইন আছে। কিন্তু অপরাধীর সাজা প্রাপ্তির হার ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ হওয়ায় বোঝা যায় ঘরে বাইরে সেই আইনগত সুরক্ষা থেকে তারা বেশিরভাগ সময় কেন বঞ্চিতই থেকে যায়।
বরং কোনো ভাবে যদি তারা সেই সুযোগের হাত ধরে অভিযুক্তদের শাস্তিকে সুনিশ্চিত করার চেষ্টাও করে, তাহলে তারা যাতে তাতে সফল হতে না পারে, সর্বতোভাবে সেই পথে বাধার প্রাচীর তুলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কী প্রশাসনিক স্তরে, কী রাজনৈতিক, কী সামাজিক স্তরেও।

ছবির উৎস, NurPhoto
একথা সত্য যে, সারা পৃথিবী জুড়েই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের হার ক্রমবর্ধমান। এবং কম বেশি প্রায় ১০০ কোটি নারী ও শিশুকন্যা তার গোটা জীবনে কোনো না কোনো সময়ে সে নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্তু ভারতে তা যেন বাড়তে বাড়তে ক্রমশ 'মহামারি'র পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
যদিও কোনও পরিসংখ্যানই এই সমস্যার গভীরতা উপলব্ধে যথেষ্ট নয়। কারণ ধর্ষণের নথিভুক্ত পরিসংখ্যানই এই ব্যাপারে রাজ্য বা দেশের অবস্থানকে নির্দেশ করে। কিন্তু ভারতে ধর্ষিতা মেয়েদের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেই যে বিপুল ফাঁক থেকে যায়।
প্রাণনাশের ক্রমাগত হুমকি
অত্যাচারে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ধর্ষিতারা স্থানীয় থানাগুলিতে এব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করতে গেলে তারা প্রায়শই প্রত্যাখ্যাত হয়। কখনো কখনো আবার নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শও তাদের দেওয়া হয়। তাছাড়া থাকে ধর্ষণকারীদের দেওয়া প্রাণ নাশের ক্রমাগত হুমকি।
সর্বোপরি পারিবারিক, সামাজিক অদৃশ্য চাপে, তথা লোক লজ্জার ভয়ে 'ধর্ষণ কলঙ্ক'র বোঝা মাথায় নিয়ে ধর্ষিতা শেষাবধি থানার দরজা অবধি আর পৌঁছতেই পারে না। ভারতে অসংখ্য ধর্ষণ ঘটনা এভাবেই তাই অনথিভূক্ত থেকে যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
উত্তরপ্রদেশের কথা
এবার উত্তরপ্রদেশের কথায় আসি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর 'ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া' ২০১৯ রিপোর্ট বলছে দেশে মেয়েদের প্রতি সংঘটিত অপরাধে উত্তরপ্রদেশ রয়েছে শীর্ষে। গড়ে দিনে ৮৭ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কন্যা শিশুর প্রতি অপরাধেও শীর্ষে রয়েছে রাজ্যটি। আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।
অতি সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে সংঘটিত গণধর্ষণ ও নৃশংস অত্যাচারে ১৯ বছরের এক দলিত তরুণীর মৃত্যুর অভিযোগে প্রায় নির্ভয়া হত্যার প্রতিবাদের মতোই উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ । উন্নাও সহ হাথরাসের আগে ও পরে আরও বেশ কিছু ধর্ষিতার ওপর নৃশংস অত্যাচার ও হত্যার ঘটনা যেভাবে ঘটেই চলেছে, তাতে ধর্ষণকারীরা যে ক্রমশই রাজ্যে অকুতোভয় হয়ে উঠছে তাতে আর সন্দেহ কি?
দেখা যাচ্ছে শুধু সেপ্টেম্বরেই উত্তরপ্রদেশে ধর্ষণের ৯টি ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ৮ বছরের শিশুকন্যা থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধাও আছেন। আরও জানতে ক্লিক করুন এখানে।
'কোনো ধর্ষণ হয়নি'
এই ধর্ষণের ঘটনাকে লঘু করতেই কি এখন আবার 'বিদেশি চক্রান্ত'র নতুন তত্ত্বও খাড়া করা হচ্ছে? যেমন, হাথরাস-এ 'কোনো ধর্ষণ হয়নি'। রাজ্য পুলিশের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা)ও স্বয়ং দাবি করেছেন, হাথরাসের ঘটনা যোগী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার 'আন্তর্জাতিক চক্রান্ত' (আনন্দবাজার পত্রিকা)।

ছবির উৎস, Getty Images
তদন্ত শেষ না হলেও এডিজি কি করে জানলেন ধর্ষণ হয়নি - এই প্রশ্ন তাকে ছুঁড়ে দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি। কিন্তু তাতে কি আসে যায়? উত্তর প্রদেশের অভিযুক্ত ধর্ষণকারীদের কাছে আসল বার্তাটি তো রাজ্য প্রশাসন পৌঁছেই দিল - যে, কোনো ভয় নেই।
নিরপরাধীকে নয়, অপরাধীদের কীভাবে সর্বস্তরে সুরক্ষা দেওয়া হয় - ভিকটিমকে হত্যা করে, পুড়িয়ে ফেলে অপরাধের সমস্ত প্রমাণ লোপাট করা, পরিবারের লোকজন, সাক্ষী, এমনকি ভিকটিমের হয়ে মামলায় লড়া আইনজীবীকেও হত্যার হুমকি দিয়ে - উত্তরপ্রদেশে উন্নাও সহ একের পর এক ঘটে চলা ঘটনায় যেন তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে।
তাই বলছিলাম, এমন প্রশাসনিক অভয় পেলে এবং এক অদৃশ্য হাতের অমন সুরক্ষা বলয় তাদের মাথার ওপর থাকলে, ভবিষ্যতে ধর্ষণকারীদের কাছে উত্তরপ্রদেশ যে নিরাপদ ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হিসেবে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে না, তা কে বলতে পারে?








