চীন-ভারত দ্বন্দ্ব: লাউডস্পীকার দিয়ে সৈন্যদের কানের পর্দা ফাটানোর দাবি কতটা সত্যি?

সীমান্তে উত্তেজনার পর ভারতে চীন বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সীমান্তে উত্তেজনার পর ভারতে চীন বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়।

গত জুন মাসে ভারত এবং চীনের মধ্যে সীমান্তে এক সংঘর্ষে নিহত হয়েছিল অন্তত ২০জন ভারতীয় সেনা। তারপর থেকে দুই দেশের সীমান্তে চলছে তীব্র উত্তেজনা।

এই উত্তেজনা কমানো এবং সংঘাত এড়ানোর জন্য দুই দেশ এখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুদিক থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই উত্তেজনা এবং সংঘাত সম্পর্কে অনেক মিথ্যে এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

এরকম কিছু মিথ্যে তথ্য এবং দাবি যাচাই করে দেখেছেন বিবিসির 'রিয়েলিটি চেকের' শ্রুতি মেনন এবং উপাসানা ভাট।

দাবি: চীনের সেনাদের সীমান্তে পাঠানোর পর তারা কাঁদছে

রায়: বিভ্রান্তিকর এই ভিডিওটিকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে

এই ভিডিওটি টুইটারে শেয়ার করেছেন কিছু মানুষ। এরপর গত সেপ্টেম্বরে তাইওয়ানের কিছু গণমাধ্যমের নজরে পড়ে ভিডিওটি। তারা এটি প্রচার করে। এরপর ভিডিওটি ভাইরাল হয় ভারতে। সেখানে লোকজন এই বলে চীনা সৈন্যদের উপহাস করতে থাকে যে সীমান্তে পাঠানো হয়েছে বলেই তারা কাঁদছে।

ভিডিওটি এপর্যন্ত তিন লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে অনলাইনে। ভারতে 'জি নিউজ' থেকে শুরু করে বড় বড় গণমাধ্যমে এটি প্রচারিত হয়েছে।

বিভ্রান্তিকর: ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই ছবি
ছবির ক্যাপশান, বিভ্রান্তিকর: ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই ছবি

এই ভিডিওতে দেখা যায় চীনা সৈন্যরা একটি মিনিবাসে চড়ে যাচ্ছে। তারা ম্যান্ডারিন ভাষার একটি জনপ্রিয় সামরিক গান গাইছে। মূলত বাড়ির জন্য মন কাঁদছে এরকম একটি বিষয়ে এই গান। লাল এবং হলুদ রঙের যে উত্তরীয় সৈন্যরা পড়ে আছে, তাতে লেখা, 'সামরিক বাহিনীতে যোগ দাও মর্যাদার সঙ্গে।'

কিন্তু বিবিসির রিয়েলিটি চেক এমন কোন প্রমাণ পায়নি, যা দেখে বলা যাবে এই সৈন্যদের ভারত সীমান্তে পাঠানো হচ্ছিল।

চীনের গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এই সৈনিকরা সেনাবাহিনিতে নতুন যোগ দিয়েছে। এরা আনহুই প্রদেশের ইয়াংযু জেলার ফাইয়াং শহরের লোক। পরিবারের সদস্যদের বিদায় দেয়ার পর তারা একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল।

চীনা মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটে একটি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম গত ১৫ই সেপ্টেম্বর ভিডিওটি নিয়ে একটি বার্তা পোস্ট করে। সেখানে তারা বলছে, এই সৈনিকরা তাদের ব্যারাকে ফিরছিল। এদের মধ্যে পাঁচজন তিব্বত অঞ্চলে দায়িত্ব পালনে স্বেচ্ছায় আগ্রহ দেখিয়েছে।

কিন্তু এই বার্তায় এমন কথা নেই যে এদেরকে সীমান্তে নিয়োজিত করা হয়েছে। কিংবা ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনার কথাও এতে নেই।

গত ২২শে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের চীনা ভাষার সংস্করণে এই ভিডিওর খবরটি প্রকাশিত হয়। এতে তাইওয়ানের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে তারা এটি নিয়ে মিথ্যে তথ্য প্রচার করছে। পিতা-মাতাকে অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানানোর ঘটনার এই ভিডিওকে তারা চীন-ভারত সীমান্তের পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখিয়েছে।

দাবি: ভারতীয় সৈন্যরা চীনা লাউডস্পীকার থেকে আসা সঙ্গীতের তালে নাচছে

রায়: এটি পুরোনা ভিডিও, সীমান্তে লাউডস্পীকার বসানোর কথা জানার বহু আগের

গত ১৬ই সেপ্টেম্বর ভারত এবং চীন উভয় দেশের গণমাধ্যমে এরকম একটি খবর প্রচারিত হয়। এতে বলা হয়, ভারতীয় সৈন্যদের মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানোর জন্য চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি সীমান্ত বরাবার লাউডস্পীকার বসাচ্ছে এবং সেগুলো থেকে পাঞ্জাবী গান বাজাচ্ছে।

গণমাধ্যামের রিপোর্টে আরও বলা হয়, চীনা সেনাবাহিনী এমন এক জায়গায় এসব লাউডস্পীকার বসিয়েছে যেটি ভারতীয় সেনাদের ২৪ ঘন্টার নজরদারিতে আছে।

ভারত এবং চীন, উভয় দেশের গণমাধ্যমে এই খবরটি প্রচার করা হয় 'সেনাবাহিনীর সূত্র' উদ্ধৃত করে।

পুরোনো ভিডিও: সীমান্তে লাউডস্পীকার আসার আগের ছবি এটি
ছবির ক্যাপশান, পুরোনো ভিডিও: সীমান্তে লাউডস্পীকার আসার আগের ছবি এটি

কিন্তু এই রিপোর্টের সঙ্গে কোন ছবি ছিল না, কোন ভিডিও চিত্রও শেয়ার করা হয়নি। এরকম ঘটনা যে ঘটেছে, তার ভারতীয় সেনাবাহিনির তরফ থেকেও নিশ্চিত করা হয়নি।

কিন্তু তারপরও ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচুর মানুষ এই পুরোনো ভিডিও শেয়ার করেছে। যাতে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় সৈন্যরা পাঞ্জাবী গানের তালে তালে নাচছে। বিবিসির রিয়েলিটি চেক দেখেছে, সীমান্তে লাউডস্পীকার বসানোর অনেক আগের ভিডিও এটি।

আরও পড়ুন:

সেপ্টেম্বরে শেয়ার করা একটি ভিডিও রীতিমত ভাইরাল হয়েছিল। এটিতে দেখা যাচ্ছিল, পাঞ্জাবী সঙ্গীতের তালে তালে পাঁচ জন সৈনিক নাচছে। ৮৮,০০০ মানুষ ভিডিওটি দেখেছে। যারা এটি শেয়ার করেছেন, তারা দাবি করছিলেন, লাদাখে ভারত-চীন সীমান্তে ঘটেছে এই ঘটনা।

কিন্তু 'রিভার্স-ইমেজ সার্চ' করে দেখা যাচ্ছে এই ভিডিওটি আসলে এবছরের জুলাই মাসের।

যদিও ভিডিওটি আসলে ঠিক কোন জায়গায় রেকর্ড করা হয়েছে তা পরিস্কার নয়, ঐ সময়ের বিভিন্ন খবর দেখে বোঝা যায় এটি আসলে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ঘটনা। চীন-ভারত সীমান্তে এটি ধারণ করা হয় বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

দাবি: চীনের একটি বিশাল স্পীকার আছে, যা থেকে খুব জোরে সঙ্গীত বাজিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের আহত করা হয়েছে

রায়: এই যন্ত্রটি দিয়ে যে সীমান্তে গান বাজানো হয় এরকম কোন প্রমাণ নেই।

এটি আসলে লাউড স্পীকার সম্পর্কিত আগের দাবিরই একটি ভিন্ন রূপ। একজন চীনা টুইটার ব্যবহারকারী একটি বিরাট যন্ত্রের এই ভিডিওটি শেয়ার করেন। তিনি দাবি করেন যে, এটি ব্যবহার করা হচ্ছে খুব উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে ভারতীয় সেনাদের অসুস্থ এবং আহত করার জন্য।

এটি লাউডস্পীকার নয়, একটি মোবাইল সাইরেন।
ছবির ক্যাপশান, এটি লাউডস্পীকার নয়, একটি মোবাইল সাইরেন।

দুই লাখ বারের বেশি এই ভিডিওটি অনলাইনে দেখেছেন মানুষ। একটি ভারতীয় নিউজ চ্যানেলে পর্যন্ত এই ভিডিওটি দেখানো হয়েছে একই দাবি করে।

আসলে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও ক্লিপটি ২০১৬ সালের মার্চ মাসের। ইউটিউবে ভিডিওটি ছাড়া হয়েছিল। যন্ত্রটি বানিয়েছে একটি চীনা কোম্পানি, তারা নিরাপত্তা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করে। ভিডিওটি তাদেরই করা। যে যন্ত্রটির ছবি শেয়ার করা হয়েছে, সেটি আসলে একটি 'মোবাইল ওয়ার্নিং সাইরেন'। এটি বেশ বড়, ওজন প্রায় ৪ দশমিক ৬ টন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোন জরুরি অবস্থার সময় বেসামরিক জনগণকে সতর্ক করতে এই সাইরেন ব্যবহার করা হয়। কোম্পানির ওয়েবসাইটে এই যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে এরকম বিবরণই দেয়া আছে।

এটি গান বাজানোর কোন লাউডস্পীকার নয়। আর এই সাইরেন চীনা সেনবাহিনী সীমান্তের কাছে ব্যবহার করছে কীনা, সেটাও ঠিক পরিস্কার নয়।

আর অন্যদিকে, ভারতের কোন সৈন্যের কানের পর্দা ফেটে গেছে, এরকম খবরও কিন্তু কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।

দাবি: ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বহনকারী একটি বাস দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর সীমান্তে উত্তেজনা শুরু হয়।

রায়: বিভ্রান্তিকর, কারণ এই দুর্ঘটনা সীমান্তের কাছে ঘটেনি

এটি ভারত-চীন সীমান্তে নয়, ছত্তিশগড়ের ছবি
ছবির ক্যাপশান, এটি ভারত-চীন সীমান্তে নয়, ছত্তিশগড়ের ছবি

চীন থেকে একজন টুইটারে ২১শে সেপ্টেম্বর একটি ভিডিও পোস্ট করে, যাতে দাবি করা হয়, সীমান্ত নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতীয়রা মাঝামাঝি জায়গা পর্যন্ত আসতে পারছে না, কারণ 'ভারতীয় সৈন্যরা নিজেরাই মারা পড়ছে, তাদের বাঁচাতেই তারা ব্যতিব্যস্ত।'

ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সামরিক বাস নদীতে ডুবে যাচ্ছে, কাছে দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় সৈন্যরা। আর নীচের লেখায় দাবি করা হচ্ছে, "লাদাখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আত্মহত্যার ভয়ংকর চেষ্টা।"

এই ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৫,০০০ বার। এই ভিডিওটি আসল, ভুয়া নয়। কিন্তু এই দুর্ঘটনা ভারত-চীন সীমান্তের কাছে নয়।

এটি ভারতের মধ্যমাঞ্চলীয় প্রদেশ ছত্তিশগড়ে ঘটেছে। গত সেপ্টেম্বরে বিজাপুর জেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বহনকারী এই বাস বন্যায় একাকার হয়ে যাওয়া নদীর পানিতে পড়ে যায়।

তখন ভারতীয় গণমাধ্যমে এই দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছে। উল্টে যাওয়া বাসটার ছবিও দেখানো হয়েছিল। তবে সেখানে কেউ মারা যায়নি।