দুর্গাপূজার ওপর বিধিনিষেধে হিন্দুত্ববাদীরাই বিজেপির ওপর খাপ্পা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
হিন্দু বাঙালিদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার উদযাপনে ভারতের একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্য নানা বিধিনিষেধ আরোপ করার পর হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে।
মধ্যপ্রদেশে বিভিন্ন কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন রাজ্যের বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পথে নেমে পুলিশের লাঠি খেয়েছেন - তারপর সরকার শারদীয়া দুর্গোৎসবকে কিছুটা ছাড় দিতেও বাধ্য হয়েছে।
আবার দেশের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশে সরকার রামলীলার অনুমতি দিলেও এখনও দুর্গোৎসব আয়োজনের ছাড়পত্র মেলেনি, ফলে সেখানেও বাঙালিরা স্বভাবতই হতাশ।
কোভিড মহামারিতে এর আগে ঈদ বা গণেশ চতুর্থীতেও নানা কাটছাঁট করতে হয়েছে, কিন্তু দুর্গোৎসব নিয়ে এই যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা প্রায় নজিরবিহীন।
বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ভারতের বিভিন্ন হিন্দি-ভাষাভাষী রাজ্যেও দুর্গোৎসব হয়ে থাকে মহাধূমধামে, যেমন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল ও তার আশেপাশেই হয় প্রায় সাত-আটশো দুর্গাপুজো।

ছবির উৎস, Peoples Samachar
মহামারির মধ্যে এবারে মধ্যপ্রদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল, কোনও পুজোতেই প্রতিমার উচ্চতা ছয় ফিটের বেশি হতে পারবে না এবং প্যান্ডেলও হতে হবে সর্বোচ্চ দশ ফিট বাই দশ ফিট।
রাজ্যের বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে বিক্ষোভে নামে শিবসেনা, বজরং দল-সহ বিভিন্ন কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন, পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে ভোপালের রোশনপুরা চৌমাথা।
ওই বিক্ষোভে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় থাকা জয় মা ভবানী সংগঠনের সভাপতি ভানু হিন্দু বিবিসিকে বলছিলেন, "তিন-চার মাস আগে থেকে দুর্গাপুজোর বড় বড় প্রতিমা বানানোর কাজ চলছে - এখন আচমকা হোম মিনিস্ট্রি ফরমান দিলেই হল উঁচু প্রতিমা চলবে না?"
"শিল্পী ও পুজো কমিটিগুলোর তো লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়ে যাবে। আর অত ছোট প্যান্ডেলে সামাজিক দূরত্বই বা কীভাবে বজায় রাখা হবে?"
"এই হুকুম মানা সম্ভব নয় বলেই আমরা সেদিন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাচ্ছিলাম, কিন্তু বিনা প্ররোচনায় পুলিশ আমাদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। তাতে আমার নিজের হাত ভেঙেছে, বহু কর্মীর মাথা ফেটেছে!"
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
এই চাপের মুখে দুর্গাপুজো নিয়ে মধ্যপ্রদেশ তাদের বিধিনিষেধ বেশ কিছুটা শিথিল করতে বাধ্য হলেও উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার কিন্তু দুর্গাপুজো নিয়ে এখনও তাদের সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখেছে।
ওই রাজ্যের নয়ডায় একটি পুজো কমিটির কর্মকর্তা অনুজ চক্রবর্তী বলছিলেন, নানা ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে প্রশাসন যেভাবে ফারাক করছে তাতে তারা অত্যন্ত হতাশ।
মি. চক্রবর্তীর কথায়, "বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমরা যেটা দেখেছি তা হল দুর্গাপুজো এবারে করতে দেওয়া হবে না, অথচ কোভিডের সব বিধিনিষেধ মেনে রামলীলার আয়োজনে প্রশাসন অনুমতি দেবে।"
"এটা জানার পর স্বভাবতই রাজ্যের বাঙালি সমাজ ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। সরকারের কাছে আমাদের প্রতিবাদ আমরা বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে তুলে ধরেছি, জেলা প্রশাসককেও স্মারকলিপি দিয়ে বলেছি এটা ঠিক নয়।"
"আমাদের বক্তব্য খুব সহজ, আমরা বহু বছর ধরে এখানে পুজো করছি - আমাদের এবারও পুজো করতে দেওয়া হোক।"

ছবির উৎস, Balaka/Facebook
"মহামারিতে সরকারের প্রতিটা বিধিনিষেধ আমরা যথাযথভাবে পালন করব, প্রশাসনকে অগ্রাহ্য করার কোনও ইচ্ছেও আমাদের নেই।"
"কিন্তু আমাদের পুজোটা তো করতে দেওয়া হোক? পূর্ণাঙ্গ আকারে না হলেও অন্তত ঘটপুজো?", বলছিলেন অনুজ চক্রবর্তী।
রামলীলা মূলত হিন্দিভাষীদের উৎসব - আর সেটা হয় দুর্গাপুজোর শেষ দিনেই।
রামলীলায় হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হয়, সেটা অনুমতি পেলে দুর্গাপুজো কী দোষ করল এটাই উত্তর ভারতের বাঙালিদের প্রশ্ন।
আর বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেটাই তাদের সমর্থকদের অনেকে বুঝে উঠতে পারছেন না।

ছবির উৎস, Getty Images
ভোপাল থেকে ভানু হিন্দু যেমন পরিষ্কার বলছেন, "আমরা বিজেপির কাছ থেকে এই ধরনের হিন্দুবিরোধী সিদ্ধান্ত মোটেও আশা করিনি, কিন্তু প্রতিবাদ না-করেও আসলে আমাদের উপায় ছিল না।"
রাজ্যের প্রবীণ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রাজেশ চতুর্বেদী আবার মনে করছেন, মধ্যপ্রদেশ সরকার এখানে মহামারি আর রাজনীতির মধ্যে 'ব্যালান্স' করতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "এর কিছুদিন আগে গণেশ উৎসবেও বড় মূর্তি বানাতে দেওয়া হয়নি - রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন, দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী, এমন কী বিজেপির ক্যাডাররাও তাতে খুশি ছিল না।"
"তখন মহামারি ঠেকানোর কথা বলে সরকার তাদের আপত্তি আমলে না-নিলেও এখন দুর্গোৎসবে সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না।"

ছবির উৎস, Getty Images
"বিশেষ করে সামনেই রাজ্যে ২৭টা আসনে নির্বাচন, যেগুলোতে জেতা বিজেপি সরকারের টিঁকে থাকার জন্য খুব জরুরি।"
"ফলে এখন হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে চটালে মুশকিল, কাজেই দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর চাপে তারা সিদ্ধান্ত কিছুটা বদলাতে বাধ্য হয়েছে", বলছেন মি. চতুর্বেদী।
উত্তরপ্রদেশে অবশ্য সামনেই কোনও ভোট নেই - এবং রাজ্য সরকার এখন হাথরাসে গণধর্ষণের জের সামলাতে নাজেহাল।
ফলে সেখানে দুর্গাপুজোর মাত্র দিনপনেরো আগেও সেই উৎসবকে ঘিরে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।








