করোনা ভাইরাস ও শিক্ষা : একশ বছর আগে প্রাণঘাতী রোগের কারণে যেভাবে শুরু হয়েছিল খোলা মাঠে স্কুল

নিউ ইয়র্কে খোলা জায়গায় স্কুল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্কে খোলা জায়গায় স্কুল: শীতকালে এই স্কুল খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল, কিন্তু শিশুরা শীত উপেক্ষা করেই স্কুলে যায়।

একশ বছর আগের একই পরিস্থিতির মুখে আজকের বিশ্ব। প্রাণঘাতী কোভিডের প্রার্দুভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থা। শিশুরা কীভাবে সংক্রমণের আশংকা এড়িয়ে স্কুলে যাবে? প্রতিষেধক টিকা এখনও দুরস্ত। তাহলে, শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান শিক্ষার সময়টা যাতে নষ্ট না হয়- তার দিকে কি এখন তাকানোর সময় এসেছে? সে প্রশ্ন নিয়েই এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বিবিসি নিউজ ব্রাজিলের পলা অ্যাডামো আইডোটা।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যক্ষ্মায় ইউরোপ আর আমেরিকায় মারা যেত প্রতি সাতজনে একজন। এ তথ্য আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র, সিডিসির। যক্ষ্মার প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হয় ১৯২১ সালে। সেই প্রতিষেধক বিশ্বের সব দেশের কাছে পৌঁছতে সময় লেগে যায় আরও বেশ কিছু বছর।

এই পরিস্থিতিতে বাচ্চারা যাতে নিরাপদে স্কুলে ফিরতে পারে তার সমাধান হিসাবে জন্ম নেয় খোলা মাঠে স্কুল ব্যবস্থা।

ইএএএল (অ্যাপ্লায়েড ওপেন এয়ার স্কুল)

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, ওপেন এয়ার স্কুল প্রথম চালু হয় জার্মানি ও বেলজিয়ামে ১৯০৪ সালে

হালকা ওজনের টেবিল ও চেয়ার বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। টিচাররা মাঠে বসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, ভুগোল বা শিল্পকলা বিষয়ের ক্লাস নিতে শুরু করেন।

এই আইডিয়া প্রথমে চালু হয় ১৯০৪ সালে জার্মানি আর বেলজিয়ামে। অল্পদিনের মধ্যেই এটা একটা আন্দোলন হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশে। উন্মুক্ত স্থানে শিক্ষাদান বিষয়ে একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে লিগ ফর ওপেন এয়ার এডুকেশন নামে। ১৯২২ সালে এই গোষ্ঠী প্যারিসে তাদের প্রথম অধিবেশন ডাকে।

আমেরিকায় খোলা মাঠে শিক্ষাদান শুরু হয় ১৯০৭ সালে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে সে বছর রোড আইল্যান্ডের দুজন ডাক্তার প্রস্তাব দেন শহরের খোলা জায়গাগুলোতে স্কুল বসাতে।

পরের দুবছরে এরকম ৬৫টি স্কুল খোলা হয়। খোলা চত্বরে, উঁচু ভবনের ছাদে এবং এমনকি পরিত্যক্ত নৌকায়।

শরীর ও মন

ইএএএল

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রক্তস্বল্পতা এবং অপুষ্টির পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য একটা বড় ঝুঁকি ছিল যক্ষ্মা

আরও পড়তে পারেন:

ইএএএল

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, জার্মানি ও বেলজিয়ামের ইএএএল স্কুলের মত ব্রাজিলেও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক গঠনের জন্য তৈরি হয় খোলা মাঠে স্কুল - ছবিতে দেখা যাচ্ছে ব্রাজিলের এরকম একটি স্কুল

যক্ষ্মার সংক্রমণের ধরন ছিল কোভিড-১৯এর থেকে আলাদা। যক্ষ্মা বায়ুবাহিত রোগ। যক্ষ্মার জীবাণু নি:শ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকলে এই রোগের সংক্রমণ ঘটে। সিডিসি বলছে যক্ষ্মার জীবাণু বাতাসে মিশে থাকে এবং তা সক্রিয় থাকে অনেক ঘন্টা ধরে।

আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোভিড ছড়ায় আক্রান্ত কোন ব্যক্তির নাক-মুখ থেকে বেরনো অপেক্ষাকৃত বড় শ্লেষ্মাকণার মাধ্যমে- তার সরাসরি সংস্পর্শে এলে বা করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোন বস্তু ধরলে। যদিও সংস্থাটি সম্প্রতি স্বীকার করেছে যে, করোনাভাইরাসও সূক্ষ্ম কণার আকারে বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে বলে তথ্যপ্রমাণ সামনে আসছে।

"রক্তস্বল্পতা এবং অপুষ্টির পাশাপাশি সে সময় শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি ছিল যক্ষ্মা," বলেছেন সাও পাওলোতে ফেডারেল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রে ডালবেন।

বিশেষ করে অনেক দেশে যেসব শিশু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হতো তাদের জন্য যক্ষ্মায় আক্রান্ত হবার বড় ঝুঁকি থাকত।

অধ্যাপক ডালবেন বলছেন, খোলা মাঠের স্কুলগুলোর আরেকটা মিশন ছিল লেখাপড়ার সুযোগ চালু রেখে শিশুদের মানসিক গঠনের পাশাপাশি বাইরে খোলামেলা পরিবেশে ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের শারীরিক উন্নতি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা।

'নতুন ভাবনা'

ইএএএল (অ্যাপ্লায়েড ওপেন এয়ার স্কুল)

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যখন নতুন করে ভাবনা চিন্তা হচ্ছে তার মধ্যেই খোলা মাঠে শিক্ষাদানের বিষয়টি প্রসার লাভ করে

সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ইতিহাস বিষয়ক অধ্যাপক ডায়ানা ভিডাল বলেছেন খোলা মাঠে পাঠদানের স্কুলগুলো প্রসার লাভ করেছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে। তখন সমাজ ও শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা হচ্ছিল।

শিক্ষকরা প্রথাগত শিক্ষার কাঠামো ভেঙে এমন স্কুল গড়ার চিন্তাভাবনা করছিলেন যার লক্ষ্য হবে "বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে গণতন্ত্র চর্চায় উৎসাহ" দেয়া, যাতে "একটা শান্তিকামী এবং পরস্পরকে সহযোগিতা করার মানসিকতা নিয়ে একটা প্রজন্ম তৈরি হয়", বলছেন মিজ ভিডাল।

অধ্যাপক ডালবেন নথিপত্র ঘেঁটে দেখেছেন ব্রাজিলে ১৯১৬ থেকে ১৯২০ ও ৩০এর দশকে এরকম বহু স্কুল তৈরি হয়েছিল।

ইএএএল (অ্যাপ্লায়েড ওপেন এয়ার স্কুল)

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ইএএএল স্কুলকে সাও পাওলো কর্তৃপক্ষ আদর্শ স্কুলের স্বীকৃতি দিয়েছিল

ব্রাজিলের ইএএএল নামে খোলা মাঠের একটি স্কুলের কাছ থেকে পাওয়া উপরের ঐতিহাসিক ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে গাছপালার মধ্যে বসে স্কুলে পড়ানো হতো। ১৯৩০এর দশকের শেষ দিকে সাও পাওলোর ওই স্কুলে এলাকার বিত্তশালী পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ত।

তবে অধ্যাপক ডালবেন বলছেন, ব্রাজিলে খোলা মাঠের সেসব স্কুল সমাজের একটা কঠিন সময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তরিক পরিবেশে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের সাথে তার খুব একটা তফাৎ ছিল না।

"স্কুলের সাবেক কিছু শিক্ষার্থী আমাকে বলেছেন মাস্টাররা খুবই কড়া ছিলেন।" ১৯৬০এর দশকে এই স্কুলটি উঠে যায়।

ইএএএল

ছবির উৎস, Revista Brasileira de Ed Física/Reprodução

ছবির ক্যাপশান, অধ্যাপক ভিডাল বলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি এবং সহনশীল ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে একটা সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে খোলা মাঠে আন্তরিক পরিবেশে শিক্ষাদানের বিষয়টি জনপ্রিয়তা লাভ করে

তবে অধ্যাপক ডালবেন এবং অন্য গবেষকরা বলছেন, বাইরে খোলা জায়গায় কোভিড-১৯ সংক্রমণের আশংকা যেহেতু কম বলেই এ পর্যন্ত গবেষণায় জানা গেছে, তাই কোভিড যতদিন আমাদের সাথে আছে, ততদিন এধরনের স্কুলে পাঠদানের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।

উন্মুক্ত জায়গায় শিক্ষাদানে সাফল্য

ভারত প্রশাসিত কাশ্মীরে উন্মুক্ত স্থানে পাঠদান ইতোমধ্যেই একটা সমাধান হিসাবে চালু হয়ে গেছে। হিমালয়ের বরফ ঢাকা পাহাড়ি পরিবেশে খোলা জায়গায় স্কুলে বাচ্চারা লেখাপড়া করছে।

সিঙ্গাপুরে বহু বছর ধরে বাইরে খোলা আকাশের নিচে লেখাপড়া শেখানোর চল রয়েছে। দেশটি শিশু কিশোরদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত করে তোলার জন্য খোলা জায়গায় পাঠদানে সাফল্য পেয়েছে।

ভারত প্রশাসিত কাশ্মীরে দুজন মেয়ে মাঠে ক্লাস করছে
ছবির ক্যাপশান, কোভিড-১৯এর পর কাশ্মীরে ছেলেমেয়েদের ক্লাসে ফিরতে উৎসাহিত করার জন্য উন্মুক্ত জায়গায় ক্লাস নেয়া হচ্ছে।

ফিনল্যান্ডে জঙ্গলে স্কুল বেশ জনপ্রিয়। দেশটিতে বনেজঙ্গলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে লেখাপড়া শেখার সংস্কৃতি বহুদিনের।

ডেনমার্কেও উন্মুক্ত স্থানে বিশেষ দিনে ক্লাস করার প্রথা চালু রয়েছে। বহু শিক্ষক এবং স্কুল নিয়মিতভাবে এই বিশেষ দিনে বাইরে স্কুলশিক্ষার আয়োজন করেন। ডেনমার্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোভিড-১৯এর মধ্যে এই সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে শান্তিনিকেতনে উন্মুক্ত পরিবেশে শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির সাহচর্যে, আদর্শ প্রাকৃতিক পরিবেশে শিশুদের শিক্ষাদান।

অধ্যাপক ভিডাল বলছেন বাইরে খোলা মাঠে স্কুল করলে শুধু প্রকৃতির সাথেই যে নিবিড় একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাই নয়, তাতে ছেলেমেয়েরা শেখার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়, তাদের শারীরিক তৎপরতা বাড়ে এবং মানসিকভাবেও তারা সমৃদ্ধ হয়।

তিনি বলছেন এধরনের শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের বাইরেও নিজের অভিজ্ঞতা ও মনন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

"খোলা মাঠে পাঠদান বদ্ধ পরিবেশে লেখাপড়া শেখার থেকে অনেক বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে," তিনি বলছেন।

ডেনমার্কে শিশুরা খোলা জায়গায় ক্লাস করছে - এপ্রিল ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডেনমার্কে বহু স্কুলে নিয়মিতভাবে বাইরে খোলা জায়গায় ক্লাস নেবার প্রথা চালু আছে।
নিউ ইয়র্কের ওপেন এয়ার ক্লাস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্কে কোভিড-১৯এর মধ্যে বাইরে ক্লাস নেয়া হচ্ছে

অধ্যাপক ডালবেন বলছেন খোলা মাঠে স্কুল প্রতিষ্ঠার যেসব অতীত অভিজ্ঞতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে সেগুলো আমলে নিয়ে এখন কোভিড পরবর্তী যুগে উন্মুক্ত জায়গায় লেখাপড়া শেখানোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।

"এমনকী শহরেও এধরনের স্কুলের কথা ভাবা যেতে পারে। এধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য পার্ক ও জনসাধারণের জন্য খোলা জায়গাও কীভাবে বাড়ানো যায় সেটাও ভাবা উচিত।"

তিনি বলছেন অতীতের মডেলেই যে এসব স্কুল তৈরি করতে হবে, তা নয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা নিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খোলা পরিবেশে কীধরনের স্কুল কাজ করবে, ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় বাড়তি মাত্রা যোগ করবে সেটা ভাবার সময় এসেছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, করোনা ভাইরাস: মহামারির প্রভাবে শিক্ষার সুযোগ হারাবে 'প্রায় এক কোটি' শিশু