ভাসানচরের আশ্রয়: প্রথমবারের মতো দেখতে হাজির রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের কক্সবাজারে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে ৪০ জনের একটি দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাসানচরে তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্প দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার থেকে বাসে করে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে নোয়াখালীর ভাসানচর পৌঁছেছে রোহিঙ্গাদের দলটি।
এই প্রথম বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া ৪০ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে তাদের জন্য তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্প দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই সফর আয়োজন করা হয়েছে।
চল্লিশ জনের মধ্যে দুইজন নারীসহ এই দলে রয়েছেন বিভিন্ন শিবিরের ইমাম, শিক্ষক, মাঝি হিসেবে পরিচিত শিবির প্রধান এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন।
যে কারণে তাদের সফর
এর আগে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মাস দুয়েক নৌকায় ভাসমান ৩০৬ জনের মত রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে ভাসানচর পাঠানো হলেও সেখানকার সুযোগ-সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে দেখানোর জন্য এই প্রথম কোন দলকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মাহবুব আলম তালুকদার বিবিসিকে জানিয়েছেন, দলটি ভাসানচরে দুই দিন ও দুই রাত অবস্থান করবে।

"আমরা জোর করে তাদের সেখানে নিয়ে যেতে চাই না", বলছেন তিনি, "পরিকল্পনাটা হচ্ছে আমরা ওখানে যেসব সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছি সেগুলো সচক্ষে দেখানোর জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
"তারা ক্যাম্পে ফিরে এসে রোহিঙ্গাদের জানাবে যে তারা সেখানে কি দেখল। তারপর যারা যেতে আগ্রহী হবে তাদের কয়েক দফায় ভাসানচরে স্থানান্তরিত করা হবে।"
আশ্রয়ণ প্রকল্পে যা রয়েছে
কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে মিয়ানমার থেকে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্তৃক হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিক থেকে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে দশ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে।
এর আগে ৭০এর দশক থেকে শুরু করে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা নানা সময়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।
তবে সবচেয়ে বড় ঢলটি ছিল ২০১৭ সালে। কক্সবাজারের উখিয়াতে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির বিশ্বের সবচাইতে বড় শরণার্থী শিবির। উখিয়াতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে গেছে।

আরো পড়তে পারেন:
বাংলাদেশ সরকার এক পর্যায়ে এক লাখের মতো রোহিঙ্গাকে অন্য কোথায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভাসানচরকে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য বেছে নেয়া হয়।
দু'হাজার আঠারো সালে শুরু হওয়া ভাসানচর প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লেগেছে দুই বছর। ২,৩০০ কোটি টাকায় সম্পূর্ণ দেশি অর্থে তৈরি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
শরণার্থী ও ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মাহবুব আলম তালুকদার জানিয়েছেন সেখানে রয়েছে, এক লাখ রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য দেড় হাজারের মতো একতলা ঘর।
১২০টি বহুতল ভবন যা সাইক্লোনের সময় আশ্রয় কেন্দ্র এবং অন্যান্য সময় অফিস হিসেবে ব্যাবহার করা হবে।
সেখানে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল, সোলার পাওয়ার ও জেনারেটর দ্বারা বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন মি. আলম।
তিনি বলেন, সেখানে খামার, হাতের কাজ শেখাসহ রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থানের জন্য আরও কিছু ব্যবস্থার কথা সরকার চিন্তা করছে। এছাড়া ১৩ কিলোমিটার বাঁধ তৈরি করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ভাসানচর প্রকল্পের বিরোধিতা
ভাসানচরে না যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের মনোভাব কাজ করছে, এর আগে নানা সময়ে তাদের সাথে কথা বলে এমনটাই মনে হয়েছে।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর ব্যাপারেও আপত্তি রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও সাহায্য সংস্থার।
গত বছরের জানুয়ারি মাসে মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংগি লি তাড়াহুড়ো করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর না করার আহবান জানিয়ে বলছিলেন, এতে মিয়ানমারকে ভুল বার্তা দেয়া হবে যে বাংলাদেশেই রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে, তাদের ফেরত না নিলেও চলবে।
ভাসানচরে আন্তর্জাতিক ও দেশিও কোনও সাহায্য সংস্থা কাজ করবে কিনা সেব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ভাসানচর উদ্বোধন ও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর শুরুর দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও তা শুরু হয়নি।
তবে মি. তালুকদার বলছেন, "আমাদের পুরো আত্মবিশ্বাস আছে যে তারা (রোহিঙ্গারা) নিজেরা সচক্ষে সুযোগ-সুবিধাগুলো যখন দেখবে তখন তারাই কনভিন্সড হবে।"
এই সফরে কোন সাহায্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি বা সাংবাদিকদের নেয়া হয়নি।









