রোহিঙ্গাদের যেমন জীবন মালয়েশিয়ায়

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছে মঙ্গলবার নৌকা ডুবে কমপক্ষে ১৫ জন নারী ও শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আবারো প্রমান করেছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় পালানোর চেষ্টা থেমে নেই।

রোহিঙ্গাদের কাছে মালয়েশিয়া এখনো সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়স্থল।

এক হিসাবে, বর্তমানে মালয়েশিয়াতে বৈধ এবং অবৈধভাবে দুই লাখের মত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের সিংহভাগই গেছেন সাগর-পথে মানব পাচার কারীদের হাতে।

তাদের মধ্যে লাখ দেড়েক জাতিসংঘের চেষ্টায় শরণার্থী হিসাবে রয়েছেন, বাকিরা অবৈধভাবে লুকিয়ে থাকেন।।

রোহিঙ্গারা কেমন আছেন মালয়েশিয়ায়?

"২৭ বছর ধরে আছি এদেশে, এখনও ইউএনএইচসিআরের কার্ড নিয়ে চলি। মালয়েশিয়ার বাইরে কোথাও যেতে পারিনা," টেলিফোনে বিবিসি বাংলার কাছে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন জাফর আহমেদ।

মেহরুম (মিয়ানমার এথনিক রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন, মালয়েশিয়া) নামে রোহিঙ্গাদের একটি এনজিরও মুখপাত্র হিসাবে কাজ করছেন তিনি।

বললেন, অবশ্যই তার যে সব আত্মীয়-স্বজন মিয়ানমারে অথবা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে আছেন, তাদের চেয়ে মালয়েশিয়াতে অনেক নিরাপদে এবং স্বস্তিতে রয়েছেন, কিন্তু খুবই নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় তাদের।

"আমাদের ছেলেমেয়েরা সরকারি স্কুলে যেতে পারেনা, শিক্ষা নিতে পারছে না। পুলিশের নজরদারি থাকে...যারা শরণার্থী কার্ড পায়নি, তাদের লুকিয়ে থাকতে হয়।"

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের একটি মাদ্রাসা

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের একটি মাদ্রাসা

মালয়েশিয়া এখনও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সনদে সই করেনি, ফলে শরণার্থীদের অনেক অধিকার সেখানে নেই। শরণার্থীর মর্যাদা দিলেও রোহিঙ্গাদের বাচ্চারা সরকারি স্কুলে যেতে পারেনা। জাতিসংঘ এবং অন্য কিছু এনজিও পরিচালিত কিছু স্কুলে তারা যায়।

"আমাদের ছেলেমেয়েরা সরকারি স্কুলে যেতে পারেনা, শিক্ষা নিতে পারছে না। এটা আমাদের বড় চিন্তা," বলছিলেন জাফর আহমেদ।

এছাড়া পুলিশের কড়া নজরদারিতে থাকতে হয় তাদের। মি. আহমেদ বলছেন, রোহিঙ্গাদের পক্ষে আন্দোলন করার অপরাধে তাকে একাধিকবার জেলে যেতে হয়েছে।

যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী কার্ড পায়নি তাদের লুকিয়ে থাকতে হয়। মেহরুমের হিসাবে বৈধ কাগজপত্র না থাকার কারণে হাজার দশেক রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন আটক শিবিরে রয়েছেন।

জাফর আহমেদ বলেন, নতুন করে শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়া দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

মালয়েশিয়ার লাংকাউয়ি দ্বীপের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি নৌকা আটক করছে নৌবাহিনী (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মালয়েশিয়ার লাংকাউয়ি দ্বীপের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি নৌকা আটক করছে নৌবাহিনী (ফাইল ফটো)

কি কাজ করেন রোহিঙ্গারা

জাফর আহমেদ বলেন, দোকান-পাট, রেস্টুরেন্টে কাজ করেন অনেকে। পাম বাগান এবং কৃষি খামারে কাজ করেন। এছাড়া, যারা অনেকদিন ধরে রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ দোকানপাট করেছেন।

তবে অবৈধভাবে যারা রয়েছেন, তারা লুকিয়ে-চুরিয়ে অল্প পয়সায় শ্রম বেঁচে জীবনযাপন করছেন।

"দেশে রোহিঙ্গারা ভাবে মালয়েশিয়া অনেক ভালো। সরকারের রহম (দয়া) আছে। আসার পর বুঝতে পারে পরিস্থিতি কি। স্বাধীনতা নাই।"

অবৈধভাবে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় যেতে গিয়ে গত বছরগুলোতে নৌকা ডুবে অথবা দালালদের নির্যাতনে অনেক রোহিঙ্গার প্রাণ গেছে। অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার হিউম্যান রাইটস কমিশন এবং ব্যাংকক ভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ফর্টিফাই রাইটস এক যৌথ প্রতিবেদনে বলেছে, মানব পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের সাথে যা করছে তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সামিল। "তারা হত্যা করছে, নির্যাতন করছে, জোর করে কাজ করাচ্ছে, ধর্ষণ করছে।"