করোনা ভাইরাস: বাংলাদেশে কোভিড টেস্টের ফি নেয়ায় পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না, ল্যান্সেট ম্যাগাজিনে প্রতিবেদন

নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নমুনা সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে কিনা তার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যান্সেট জার্নালে প্রকাশিত হওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে কোভিড পরীক্ষা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের নেয়া পদক্ষেপ সার্বিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যাচাই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেছেন বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

২৯শে অগাস্ট প্রকাশিত হওয়া প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য ফি নির্ধারণ করার পর নিয়মিত হওয়া পরীক্ষার সংখ্যায় বড় ধরণের তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে।

বাংলাদেশে শুরুর দিকে বেশ কয়েকমাস বিনামূল্যে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করা হলেও জুন মাসের শেষদিকে বাংলাদেশ সরকার কোভিড টেস্টের মূল্য নির্ধারণ করে।

বুথে বা হাসপাতালে নমুনা দেয়ার ক্ষেত্রে ফি ধরা হয় ২০০ টাকা এবং বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করার ফি নির্ধারণ করা হয় ৫০০ টাকা।

তবে কিছুদিন আগে এই ফি কমিয়ে যথাক্রমে ১০০ টাকা এবং ৩০০ টাকা করা হয়। প্রাইভেট হাসপাতালে প্রতিটি পরীক্ষার ফি ৩৫০০ টাকা।

টেস্টের জন্য ফি নির্ধারণ করার পর থেকে টেস্ট করানোর হার নেমে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজার জনে দিনে ০.৮টি টেস্টে। আর অগাস্ট মাসে এই হার নেমে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজার জনে ০.০৬টি টেস্টে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আরো পড়তে পারেন:

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করা একটি প্রতিষ্ঠান এমিনেন্সের প্রধান শামীম তালুকদার ল্যান্সেটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন যে করোনাভাইরাস মহামারি বাংলাদেশের 'অনৈতিক' স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র উন্মোচন করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, "মহামারির শুরু থেকেই সরকার চেয়েছে কোভিড-১৯ এর পরীক্ষার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখতে।"

"শুরুর দিকে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরীক্ষা করার অনুমতিই দেয়া হয়নি। আর এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হলেও ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অর্থ হল দরিদ্রদের কথা মাথায়ই রাখা হয়নি।"

ল্যান্সেটকে শামীম তালুকদার বলেন যে তিনি ঢাকার একাধিক কবরস্থান ঘুরে দেখেছেন, যেসব জায়গার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মন্তব্য করেছেন যে কোভিড-১৯ এ হওয়া মৃত্যুর সংখ্যা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে 'চারগুণ বেশি।'

মি. তালুকদার মন্তব্য করেন অনেক মানুষ কোভিড-১৯ এ মারা গেলেও তাদের পরীক্ষা করা হয়নি, আবার অনেকে পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই মারা গেছেন।

সরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিতে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ফি নেয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞার

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমানও পরীক্ষার জন্য মানুষের কাছ থেকে ফি নেয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

"পরীক্ষার জন্য মানুষের কাছ থেকে ফি নেয়ার বিষয়টি বেশ সমস্যার তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে এটি বিভাজন তৈরি করেছে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে", বলেন তিনি।

"মহামারির সময় মানুষের কাছে কাজ নেই, হাতে টাকা নেই। তারা খুবই অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। পরীক্ষার জন্য সরকারের কোনো ফি নেয়া উচিত নয়।"

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাসের ঘাটতি আছে বলে ল্যান্সেটের কাছে মাহমুদুর রহমান মন্তব্য করেন, "পরীক্ষা করা নিয়ে কিছুদিন আগে জালিয়াতি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর মানুষের বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। তাই তাদের মধ্যে টেস্ট করাতেও অনীহা রয়েছে।"

মি. রহমান বলেন, "আরেকটি সমস্যা হল পরীক্ষার ফল পেতে দেরি হওয়া। কখনো কখনো পরীক্ষার ফল পেতে সপ্তাহ খানেক লেগে যায়, আবার কখনো আসেই না। তাই অনেকে পরীক্ষা না করিয়ে ঘরেই থাকেন।"

মাহমুদুর রহমান মন্তব্য করেন যে সরকারের এখনই এমন একটি নজরদারির ব্যবস্থা প্রস্তুত করা উচিত যার মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে ভাইরাসটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সেবিষয়ে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা যাবে।

বাংলাদেশে বর্ষাকাল চলছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অবস্থায় কোভিড পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

শামীম তালুকদার মন্তব্য করেন, "সরকারের অগ্রাধিকার অর্থনীতি, কিন্তু কোভিড-১৯ গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং আরো মানুষ মারা যাবে।"

এই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখনো আসেনি।

তবে এসব বিষয়ে ল্যান্সেটের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।