সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের তথ্য ও ছবি যেসব ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে, করণীয় কী

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাকিব আল হাসানের শিশুকন্যার একটি ছবিতে কিছু মানুষের অসৌজন্যমূলক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সূর্যমুখী ফুলের এক বাগানে পরিবার নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান।
সেখানে তার শিশুকন্যার কয়েকটি ছবি তুলে নিজের ভেরিফায়েড ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তিনি আপলোড করেন।
মুহূর্তেই ওই ছবির নীচে অসংখ্য কমেন্ট পড়তে থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি মন্তব্য ছিল বেশ খারাপ ইঙ্গিতপূর্ণ।
এই কমেন্টগুলোর স্ক্রিনশট শিশুটির ওই ছবির ওপর বসানো একটি পোস্ট ফেসবুকে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
এর আগে আরেক ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার মেয়ের ছবিতেও এমন আপত্তিকর মন্তব্য দেখা গিয়েছিল।
এ ধরণের একের পর এক উদাহরণ দেখে নিজের সন্তানের ছবি এখন পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করতেও আতঙ্কে ভোগেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অদিতি পাল।
তিনি বলেন, "আমার সন্তানের বয়স এক বছর। খুব ইচ্ছা হয় তার সব মুহূর্তের ছবি আপলোড দিতে। কিন্তু সাকিব আল হাসানের মেয়ের ছবির সাথে যা হয়েছে, সেটা থেকেই শিক্ষা নিলাম। মানুষ অনেক জাজমেন্টাল। কিছু না ভেবেই যাচ্ছেতাই মন্তব্য করে দেয়। বাচ্চা মোটা কেন, শুকনা কেন, কালো কেন? কোন কমনসেন্স নাই। এজন্য শুধু পরিবারের সাথে ছবি শেয়ার করি।"

ছবির উৎস, Getty Images
মানসিক বিকৃতি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি শিশুর ছবিকে ঘিরে মানুষের এ ধরণের মন্তব্য এবং পরবর্তীতে এ সংক্রান্ত আরেকটি পোস্ট ভাইরাল করার ঘটনাকে অসচেতনতা, মানসিক বিকৃতি এবং কট্টর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম।
তার মতে, একজন নারী তিনি যে বয়সেই হন না কেন তাকে সমাজে এখনও যৌনবস্তু হিসেবে বিচার করা হয়।
এছাড়া তারকাদের জীবনের প্রতি ঈর্ষাবোধ ও হীনমন্যতা এই অরুচিকর মন্তব্যগুলোয় প্রতিফলিত হয় বলে তিনি মনে করেন।
"সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজেই যা ইচ্ছা লেখা যায়। যেটা অন্য কোথাও সম্ভব না। যারা এ ধরণের মন্তব্য করে তারা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখে না, নারী যে বয়সের হোক সে ভোগের বস্তু। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি তাদের কোন সম্মানবোধ নেই," বলেন সাদেকা হালিম।

ছবির উৎস, Getty Images
আইনে কী আছে
বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে পৃথক আইন আছে।
কিন্তু সেখানে কোথাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি আলাদাভাবে উঠে আসেনি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বলা আছে, কেউ কোন ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক তথ্য প্রকাশ করে যদি কাউকে অপদস্থ করেন তাহলে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেয়া হবে।
এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেয়া হবে।
এছাড়া অনুমতি ছাড়া কারও পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে।
এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেয়া হবে।
শিশুদের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও এক্ষেত্রে নিশ্চুপ ভূমিকা এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করার কারণে এ ধরণের অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করে বিশেষজ্ঞরা।
সাদেকা হালিম জানান, প্রভাবশালীদের পক্ষে এসব আইন যতোটা শক্তিশালীভাবে কাজ করে এর বাইরে ব্যক্তিগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে এমন কোন উদাহরণ চোখে পড়ে না বলে এ ধরণের বিকৃত মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, 'আইসিটি অ্যাক্টের ব্যবহার হচ্ছে ক্ষেত্র বিশেষে, সবার জন্য না। যখন মানুষ দেখছে তাদেরকে ঠেকানো কেউ নাই। রাষ্ট্র যদি সবাইকে শাস্তির আওতায় আনত, তাহলে এমনটা ঘটতো না।'
তবে এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার আ.ফ.ম. আল কিবরিয়া।
তিনি বলছেন, "আপনি যদি ভিকটিম হন, আপনাকেই পুলিশের কাছে আসতে হবে। মামলা করতে হবে। পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে যে করে না তা নয় তবে প্রতিকার আপনাকেই চাইতে হবে। তারপর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
ঝুঁকিগুলো কোথায়?
বাংলাদেশে কোটি কোটি ফেসবুক আইডি আছে। এরমধ্যে অনেক অপরাধ সংঘটিত হয় ফেইক বা ভুয়া আইডি থেকে হয়।
সবটা পুলিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নজরদারিতে আনা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছেন মি. কিবরিয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের ছবি বা যেকোনো তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার ওপর সেইসঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নিয়ে আরও বেশি প্রচারণার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাওভাবে শিশুদের ছবি ও তথ্য শেয়ার করলে এর বিরূপ প্রভাব শিশুটির বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী করতে পারেন?
সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ জেনিফার আলম বলেছেন, শিশুদের প্রতি বিকৃত রুচি পোষণ করে এমন পিডোফাইল বা শিশুদের যৌন নির্যাতনের ওপর অনেক ওয়েবসাইট আছে, ফোরাম আছে। সেসব স্থানে এসব ছবি, ব্যক্তিগত তথ্যসহ আপলোড হয়ে যেতে পারে।
একারণে শিশুদের কোন ছবি পাবলিক গ্রুপ বা পেইজে আপলোড দেয়া থেকেও তিনি বিরত থাকতে বলেছেন।
যদি আপলোড করতেই হয় তাহলে প্রাইভেসি সেটিংসটা এমন রাখতে হবে যেন অপরিচিত কেউ এসব ছবি বা তথ্য না পায়।
সে ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, তা হল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারা আপনার বন্ধু, আপনি ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে চেনেন কিনা, সেটা জানাও জরুরি।
কারণ ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় এমন অনেকেই যুক্ত থাকেন, যাদের সাথে খুব স্বল্প পরিচয় বা একদমই অপরিচিত। যা বিপদের কারণ হতে পারে।
এসব প্ল্যাটফর্ম যারা ব্যবহার করেন তারা যে কোনো শ্রেণী পেশার বা মানসিকতার হতে পারেন। সেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন।
ফলে ওই শিশুটি হয়রানির শিকার হতে পারে। বড় হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদে শিশুটি মানসিক চাপে ভুগতে পারে।
কারণ ইন্টারনেটে কিছু আপলোড হলে সেটা সরিয়ে ফেলার সক্ষমতা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের থাকলেও অনেক সময় চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হয় না।
আরও পড়তে পারেন:
আবার অনেক বাবা মা তাদের সন্তানের স্কুলের পোশাক পরা ছবি, বা স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছবি আপলোড করেন।
বর্তমানে যে অনলাইনে স্কুল চলছে সেখানে বাচ্চাদের আইডি প্রোফাইলে আপলোড করতে বলা হচ্ছে।
এতে ওই শিশুটার পরিচয় বের করা এবং তার গতিবিধি নজরদারি করা খুব সহজ হয়ে যায়।
শিশুদের জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহার নিরাপদ রাখতে ইন্টারনেটে সেইফ ব্রাউজিং সিস্টেম চালু করার ওপর জোর দিয়েছেন মিস আহমেদ।
"গুগলের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সিস্টেম আছে, মোবাইলের অ্যাপসগুলোকে সিকিওর করা সম্ভব, এছাড়া বাচ্চাদের ব্যবহারের জন্য ইউটিউব ফর কিডস, মেসেঞ্জার ফর কিডস আছে। সেগুলো ব্যবহার করতে হবে। এতে বাচ্চার নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব।"
তারপরও কোন শিশুর তথ্য বা ছবি নিয়ে অপদস্থ করা হয় বা শিশুর বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা হয় তাহলে তারা থানায় সাধারণ ডায়রি বা মামলা করে বিষয়টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনতে পারেন।








