মেজর সিনহা হত্যা: সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো কেন?

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হবার পর থেকে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর দিক থেকে যেসব তৎপরতা দেখা যাচ্ছে সেটি নজিরবিহীন।
এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা এবং সাক্ষীদের নিয়ে টানাটানি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই'র রিপোর্ট গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া - এ সবকিছু বেশ অস্বাভাবিক।
এই ঘটনার জন্য পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দু:খ প্রকাশ করার পরেও পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত মেজর সিনহার অন্যতম সহযোগী শিপ্রা দেবনাথের ব্যক্তিগত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে হেনস্থার চেষ্টা করা হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে পুলিশও হয়তো পরোক্ষভাবে পাল্টা জবাব দিতে চাইছে।
এসব ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, মেজর সিনহা রাশেদ নিহতের ঘটনায় সেনাবাহিনী এবং পুলিশের মধ্যে এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনার পর পুলিশের তরফ থেকে মেজর সিনহা এবং তার সহযোগীদের উপর দায় চাপিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এরপর মেজর সিনহার বোনের দায়ের করা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ নয়জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে যেতে হয়েছে।
সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সেটি বেশ নজিরবিহীন।

ছবির উৎস, Getty Images
কেন এই পরিস্থিতি?
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় উভয়ের বেশ কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে।
সিনহা ও তার সহযোগীদের দায়ী করে করে পুলিশ যে মামলা দায়ের করেছে, সে মামলার সাক্ষীদের আটক করছে র্যাব।
অন্যদিকে মেজর সিনহার বোনের দায়ের করা মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের পুলিশ হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সেনাবাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, পুলিশের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
অন্যদিকে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার দিক থেকেও পাল্টা কয়েকটি কাজ করা হয়েছে যেগুলোকে দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্বের বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিফাতের মুক্তির দাবিতে বরগুনার বামনা উপজেলায় যখন মানব বন্ধন করা হয়েছিল পুলিশের লাঠিপেটায় সেটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
এছাড়া নিহত সিনহার অন্যতম সহযোগী শিপ্রা দেবনাথের কিছু ব্যক্তিগত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
অনেকে মনে করেন, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সেটি শুধু সিনহা হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়। এই ঘটনা একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ঘটনা এতদূর কেন এল?

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
"রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, লোকাল রাজনীতি বলেন বা ন্যাশনাল রাজনীতি বলেন, পুলিশের যে ভাব তৈরি হয়েছে, এটার সাথে বাহিনীর ভেতরে এক ধরণের গরিমা এসেছে। নিয়ে এক ধরণের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না আমি বলবো যে এক ধরণের কোথাও কোথাও একটা মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে," বলছিলেন ব্রিগেডিয়ার হোসেন।
সেনা ও পুলিশ প্রধান এরই মধ্যে সিনহা হত্যার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, এখানে দুই বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন না একই সাথে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়।
"যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে,আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি যে তাদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো কিলিংস-এর (হত্যাকাণ্ডের) অভিযোগ আছে। ওই রিজিওনটাতে পুলিশের এক ধরণের ক্ষমতা আছে," বলেন আমেনা মহসিন।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, শুধু মেজর সিনহা নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই যে দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা নয়। এর একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।
আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের অধ্যাপক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাইদ ইফতেখার আহমেদ মনে করেন, মূল বিষয়টি হচ্ছে গণতন্ত্রের সংকট।
একটি দেশে গণতন্ত্র যত দুর্বল হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ততটা দুর্বল হতে থাকে, বলছেন তিনি।
অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে উঠে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এক্ষেত্রে কে কার চেয়ে শক্তিশালী সেটি প্রতিষ্ঠিত করার এক ধরণের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশে সেটাই হয়েছে বলে মনে করেন মি. আহমেদ।
"যখন একটি রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র মুখ্য হয়ে উঠে তখন কম্পিটিশনটা হয় বিভিন্ন আমলা গোষ্ঠীর মধ্যে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নেই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্গান মনে করে আমরাই এখানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারি," বলছিলেন সাইদ ইফতেখার আহমেদ।
"প্রত্যেকটা গোষ্ঠী চেষ্টা করে তাদের প্রাধান্য বজায় রাখার। ফলে একটা কম্পিটিশন তৈরি হয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর মধ্যে।"
সেনা ও পুলিশ প্রধান কক্সবাজার পরিদর্শন করে এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
কিন্ত তারপরেও সেনাবাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তারা সেটি মানতে নারাজ। তাদের ধারণা এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

ছবির উৎস, Getty Images
সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রদর্শন?
কক্সবাজার থেকে পাঠানো ডিজিএফআইর'র যে গোপন রিপোর্ট সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতি পুলিশ সদস্যদের অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে এক ধরণের চাপা উত্তেজনার বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না।
অনেকে মনে করেন, পুলিশের প্রতি সেনাবাহিনীর মনোভাব ইতিবাচক নয়।
কার ক্ষমতা বেশি? এনিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা চলছে কি না?
এমন প্রশ্নে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, "সুপ্রিমেসির কোন ব্যাপার থাকার কথা নয়। পুলিশ ফোর্স তার একটি আলাদা ম্যান্ডেট। সেনাবাহিনী তার একটা আলাদা ম্যান্টেড। পৃথিবীর প্রত্যেক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী সিনিয়রিটি ও প্রটোকলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ জনগণের বাহিনী, এটা একটা সার্ভিস সেক্টর। কাজেই এখানে সু্প্রিমেসির কোন বিষয় আমি এখানে মনে করিনা।"
তবে গত ২০-৩০ বছর অনেক জায়গায় বিভিন্ন আঙ্গিকে পুলিশ সেনাবাহিনীর সমকক্ষ হবার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত।
"যেমন ধরুন - পতাকা, স্টার, কে সিনিয়র কে জুনিয়র, কে ফোর স্টার, কে থ্রি স্টার - এগুলো কিন্তু আগে ছিলনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও ছিল না। যখনই এগুলো শুরু হলো সেনাবাহিনীর আদলে, তখন থেকেই একটা মানসিক বিষয় হতে পারে। হতে পারে। আমি আবারও বলছি, অনুমান ভিত্তিক হতে পারে।"

ছবির উৎস, SAYEED IFTEKHAR AHMED
আরও পড়তে পারেন:
অধ্যাপক সাঈদ ইফতেখার আহমেদের বিশ্লেষন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী কোনভাবেই চাইবে না যে তাদের কর্তৃত্ব অন্য কারো দ্বারা খর্ব হোক।
"১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সমস্ত ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সুতরাং এ ধরণের প্রতিষ্ঠান যখন মনে করে যে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা তাদের তাদের দীর্ঘদিনের চর্চা কোন না কোন ব্যাঘাত ঘটছে, তারা চেষ্টা করবে তাদের চর্চার ধারাটা ফিরিয়ে আনতে, প্রভাবটাকে বজায় রাখতে" বলেন মি. আহমেদ।
সেনাবাহিনী ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
মেজর সিনহা নিহত হবার পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার কোন খবর সংবাদমাধ্যমে আসেনি। সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকেই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর হেফাজতেও বিচার অপারেশন ক্লিনহার্টসহ বিভিন্ন সময় নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, সেনাবাহিনীকে কি আসলেই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের পক্ষে কি না সেটি নিয়ে বিশ্লেষকদের নানা সন্দেহ রয়েছে।
আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাঈদ ইফতেখার আহমেদ মনে করেন, এই মুহূর্তে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের উদ্যোগ নেয়া।
"কিন্তু আজকে বাংলাদেশে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের বিরুদ্ধে কিছু সিভিল সোসাইটি এবং কিছু বিরোধী রাজনৈতিক দল ছাড়া কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান বলিষ্ঠ কোন অবস্থান নিচ্ছে না। সেনাবাহিনী নিজেও এ কাজের সাথে যুক্ত ছিল। তারাও যে সেটার বিরোধিতা করেছে সেটা নয়। আজকে তাদের একজন সদস্য এর শিকার হওয়ার ফলে তারা কনসার্নড বলে আমার মনে হচ্ছে," বলেন মি. আহমেদ।
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মোখলেসুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরণের শীতল সম্পর্ক কারো জন্যই ভালো হবে না।

ছবির উৎস, Sarwar Azam Manik
"দীর্ঘ সময় ধরে একটি শীতল সম্পর্ক যাক, এটা তো কোন মতেই কাম্য হতে পারেনা। পুলিশের হাতে মানুষ এভাবে নিহত হোক এটাও কেউ চাইতে পারেনা। যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটির বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে," বলেন মি. রহমান।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, থানা পর্যায়ে পুলিশের একটি সংস্কার প্রয়োজন। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি এবং অনিয়ম যেভাবে গেড়ে বসেছে, সেগুলো বজায় রেখে শুধু পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সংস্কার আনার বিষয়টিতে কোন লাভ হবেনা।
রাজনৈতিক মাত্রা পাচ্ছে?
মেজর সিনহা নিহতের ঘটনাটি এক ধরণের রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে বলেও অনেকের ধারণা।
সরকার সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন এর মাধ্যমে কোন একটি পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা তুলে নিতে পারে।
সম্প্রতি পুলিশ এসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিনাত হুদা ওয়াহিদ মনে করেন, দুই বাহিনীর মধ্যে সংকট সৃষ্টির সাথে সরকারের স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিস্ ওয়াহিদ প্রশ্ন তোলেন, "দূরত্ব তৈরি হয়েছে, নাকি দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে? আসলেই কি কেউ বর্তমান সরকারকে বিব্রত করবার জন্যই এই দুই বাহিনীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করবার চেষ্টা করছে কিনা - সেটিও ভেবে দেখার বিষয় আছে।"








