'কাগজপত্র পায়নাই তাই সাড়ে তিন বছর বেশি জেল খাটলাম'

ছবির উৎস, FocusBangla
হত্যা মামলার আসামী হিসেবে আফজাল হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী তার সাজার মেয়াদ শেষ হয় তিন বছর আগে ২০১৭ সালে। কিন্তু তারপরও মুক্তি মিলছিল না। আর তিন বছর বেশি জেল খেটে অবশেষে তিনি ছাড়া পেলেন গতকাল ১৩ই অগাস্ট বিকেল পাঁচটায়।
আফজাল হোসেন আটক হয়েছিলেন ১৯৯৫ সালের ২৭শে জুন। যে মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, সেটির রায় হয়েছিলো ১৯৯৯ সালের ২২শে নভেম্বর।
জেল কর্মকর্তারা বলছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে বাংলাদেশে ত্রিশ বছর কারাদণ্ডকে বোঝানো হয়, তবে বন্দীরা ভালো আচরণ বা যে যেই কাজে পারদর্শী সেটা কারাগারে করলে বছরে সর্বোচ্চ তিন মাস রেয়াত পেতে পারেন।
ফলে সাধারণত সাড়ে বাইশ বা তেইশ বছরেই শেষ হয় যাবজ্জীন দন্ডের মেয়াদ।
মিস্টার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন তার কারাদণ্ডের মেয়াদও শেষ হয়েছে আগেই। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ তার মামলার কোনো কাগজপত্র খুঁজে না পাওয়ায় তিনি জেল খেটেছেন আরও প্রায় সাড়ে তিন বছর বেশি।
"আমারে গ্রেফতারের সময় যেসব কাগজপত্র ছিলো সেগুলো পাইতেছিলনা। পরে আবার আবেদন করে তদন্তের পর আমারে মুক্তি দিছে," আফজাল হোসেন বলছিলেন বিবিসি বাংলাকে।
অর্থাৎ তার দাবি ৯৫ সালে তাকে আটকের সময় যে মামলা হয়েছিলো সেসব কাগজপত্রের খোঁজ মিলছিলোনা। ফলে সাজার মেয়াদ শেষ হলেও মুক্তি পাচ্ছিলেননা তিনি।
"থানা, আদালত কিংবা জেল কোথাও কোনো জায়গায় আমার আটকের এমনকি যে এফআইআর হয়েছিলো সেটি পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই।"
পরে পরিবার আবার আবেদন করে নতুন করে তদন্ত করে পুরো বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাকে মুক্তির সিদ্ধান্ত দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মিস্টার হোসেন জানান মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর বৃহস্পতিবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
তবে জেল কর্মকর্তারা বলছেন যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আফজাল হোসেনের মুক্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র আসার সাথে সাথেই তাকে আইন অনুযায়ী মুক্তি দেয়া হয়েছে।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Rakib Hasnet
কারণ ছাড়াই আটক থাকা: নতুন কিছু নয়
বাংলাদেশে প্রায়ই বিনা বিচারে আটক বা বন্দী থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে খবর বের হয় গণমাধ্যমে।
২০১৬ সালে মোহাম্মদ শিপন নামের এক ব্যক্তিকে বেশ আলোচনা হয়েছিলো।
একটি পুরনো সংঘর্ষ ও হত্যা মামলায় ১৬ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাবন্দী এই ব্যক্তিকে জামিন দেবার জন্য সে বছরেই নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দিয়েছিলো হাইকোর্ট।
বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে থাকতে তার মধ্যে অসংলগ্নতা তৈরি হয়েছিলো।
এর আগে ২০১৫ সালে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিলো ফজলু মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে ঘিরে যিনি বিনা বিচারে ২২ বছর কারাগারে আটক থাকার পর একটি মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় মুক্তি পেয়েছিলেন।
আবার সর্বশেষ ২০১৯ সালে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন টাঙ্গাইলের জাহালম নাম এক ব্যক্তি।
আরেকজনের অপরাধ মাথায় নিয়ে দুদক আর ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভুলের শিকার হয়ে তিনি কারাগারে ছিলেন তিন বছর।
পরে মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পর আদালতের নির্দেশে মুক্তি পান জাহালম।

ছবির উৎস, STR
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা
বাংলাদেশে কারাগারগুলোতে ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে আটক থাকা বন্দীদের আইনি সহায়তা এবং পর্যায়ক্রমে মুক্তির একটি প্রক্রিয়া শুরু ২০১৬ সালে শুরু হয়েছিলো সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশের পর।
তখনকার আইন মন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেছিলেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছে যার মূল কথা হচ্ছে : প্রত্যেক জেলায় যে 'লিগ্যাল এইড' কমিটিগুলো আছে তারা এবং কারাগারগুলোর প্রিজনার ইন-চার্জ মিলে বিনাবিচারে কতজন বন্দী আটক আছেন তার একটি তালিকা তৈরি করবেন।
এই তালিকা অনুযায়ী লিগ্যাল এইড তাদের আইনগত সহায়তা দেবে এবং মুক্ত করার ব্যবস্থা করবে বলে তখন মি. আহমেদ বলেছিলেন।
আইনজীবীরা বলছেন এখন সারা দেশেই লিগ্যাল এইড কমিটি আছে তবে সাধারণ গণমাধ্যম বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোই বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের খবর বের করে আনলে তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়।








