দিল্লি কেন ভারতের সবচেয়ে বড় করোনাভাইরাস হটস্পট

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন দেশটির সবচাইতে বড় করোনা ভাইরাস হটস্পট। সেখানে ৭৭ হাজারের বেশি মানুষের করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। দিল্লিতে করোনাভাইরাসের বিস্তার থামানোর সুযোগ সেখানকার কর্তৃপক্ষ কিভাবে হাতছাড়া করেছে, তা নিয়ে বিবিসির অপর্ণা আলুরির রিপোর্ট:
ভারত জুড়ে দুমাস ধরে যখন কঠোর লকডাউন জারি করা হয়েছিল তখন দিল্লির কর্তৃপক্ষ করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর সুযোগ হাতছাড়া করেছেন বলেই মনে হয়।
এরজন্য দায়ী করা হচ্ছে বেশ কয়েকটি বিষয়কে। প্রথমত, কন্টাক্ট ট্রেসিং এর কোন ব্যবস্থা না রাখা; দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তৃতীয়ত, ব্যক্তি খাতের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব। এর পাশাপাশি ভারতের রাজধানীতে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে রাজ্য কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক বিবাদকেও এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
ভারতের অনেক ছোট ছোট শহর দিল্লির তুলনায় অনেক ভালোভাবে করোনাভাইরাসের মোকাবেলা করেছে। যেমন ধরা যাক দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালোরের কথা। সেখানে কন্টাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়। দক্ষিণ ভারতের আরেকটি নগরী চেন্নাইও বেশ এগিয়ে আছে দিল্লি তুলনায়। সেখানে সংক্রমণ বেশ ছড়ালেও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
কিন্তু দিল্লি এবং মুম্বাই, দুটি শহরেই ভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে। এই দুটি শহরেই সংক্রমনের হার খুবই বেশি। ভারতের সব নামী-দামী সরকারি হাসপাতাল এই দুই শহরে। অথচ এসব বড় বড় হাসপাতাল এখন করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে।
দিল্লির ক্ষমতায় আছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। এ বছরের শুরুতে দলটি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল বিশেষ করে জনসেবা এবং স্বাস্থ্যসেবার মত কাজে সাফল্যের জন্য। তাহলে ভুলটা কোথায় হয়েছিল?
যথেষ্ট পরীক্ষা এবং ট্রেসিং এর ব্যবস্থা না রাখা
জুন মাসের শুরু থেকে দিল্লিতে সংক্রমনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কেবল এ মাসেই ৫০ হাজারের বেশি কোভিড-১৯ সংক্রমনের ঘটনা ধরা পড়েছে দিল্লিতে। এর একটা কারণ হয়তো দিল্লিতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এটি করা হচ্ছে একটি নতুন রেপিড টেস্টিং কিট দিয়ে, মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যেই পরীক্ষার ফল জানা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট কে শ্রীনাথ রেড্ডি বলছেন, টেস্টিং কোন মহৌষধ নয়। মিস্টার রেড্ডি ভারতের ন্যাশনাল কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের একজন সদস্য।
“আপনাকে টেস্টিং অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু সেটা করতে হবে বিচার বিবেচনা করে, লক্ষণ দেখে এবং এর একটা পরিস্কার ভিত্তি থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, এটা কেবল তখনই করা সম্ভব যখন কনট্যাক্ট ট্রেসিং এর ব্যবস্থা থাকবে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ভারতের কন্টাক্ট ট্রেসিং এর ওপর। তারা দেখেছে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে প্রতিটি কনফার্মড করোনাভাইরাস কেসের জন্য গড়পড়তা ২০টি কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করা হয়েছে। যখন কর্নাটকের মত কোন কোন রাজ্যে কন্টাক্ট ট্রেসিং করা হচ্ছিল ৯৩ জন পর্যন্ত, সেখানে দিল্লিতে করা হয়েছে মাত্র ৯ জন।
এ মাসের শুরুর দিকে দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সেখানে সংক্রমনের সংখ্যা এত বেশি যে করোনাভাইরাস পজিটিভ রোগীদের সরাসরি সংস্পর্শে আসা নিকটজনদেরই কেবল পরীক্ষা করা হচ্ছিল।
কিন্তু অনেক মানুষ টুইটারে এমন অভিযোগ করেছেন যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত টেস্ট করা হয়নি। তাদের এলাকাগুলোতে সংক্রমন প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
“আমি এমন অনেক ঘটনা জানি যেখানে করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে এমন লোকদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করা হয়নি”, বলছিলেন অল ইন্ডিয়া ড্রাগ একশন নেটওয়ার্ক নামে একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়াচডগ-এর সদস্য মালিনি আইসোলা।

ছবির উৎস, Getty Images
অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরিবারের সদস্যদের টেস্ট পর্যন্ত করা হয়নি। টেস্ট তখনই করা হয়েছে যখন বারবার সরকারের কাছে এ নিয়ে তারা আবেদন নিবেদন করেছে।
দিল্লির কর্তৃপক্ষ এখন বেশ উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন। দিল্লির প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ বাসিন্দাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিদিন দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২৬ হাজার মানুষকে বাছাই করা হবে। আর লোকজন সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মেনে চলছে কিনা সেটি পুলিশ এবং ড্রোন ব্যবহার করে নিশ্চিত করা হবে।
দিল্লির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা যে এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে সেজন্য সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দোষারোপ করছেন যে গতিতে নগরীতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল সেটিকে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই পদক্ষেপগুলো আসলে নেয়া উচিত ছিল অনেক আগে, যখন লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি ছিল। যদি তখন এই কাজ করা হতো তাহলে হয়তো সরকারের পক্ষে অনেক দ্রুত এবং বেশ বিচক্ষণ ভাবে পদক্ষেপ নেয়া সহজ হতো।
সরকার পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে ব্যর্থ
দিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের একজন ভাসকুলার সার্জন ডক্টর আমবারিশ সাত্ত্বিক মনে করেন, ভারতে করোনাভাইরাস রোগটিকে একটি গ্লানিকর বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। এটিকে জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবে গণ্য না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সমস্যা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
দিল্লিতে করোনাভাইরাস পরীক্ষাকে খুবই সীমিত করে রাখা হয়েছিল। কেউ যখন এই পরীক্ষায় পজিটিভ বলে প্রমাণিত হবেন, তারপর কি হবে সেটা নিয়ে কোন সঠিক তথ্য ছিল না। আর করোনাভাইরাস পজিটিভ প্রমানিত হলে সরকার ধরে নিয়ে নিম্নমানের কোন জায়গায় নিয়ে কোয়ারেন্টাইনের জন্য আটকে রাখবে এমন ভয় লোকজন কোন পরীক্ষাই করাতে চায়নি।
“যদি আপনাকে পুলিশ ফোন করে, যদি আপনাকে ডিস্ট্রিক্ট সার্ভেইলেন্স অফিসার ফোন করে বলে, আপনাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে কোয়ারেনটাইনের জন্য, তখন কে যাবে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করাতে”, বলছেন ডক্টর সাত্ত্বিক।
“এরকম অবস্থায় আপনি হয়তো বরং অপেক্ষা করবেন, কারণ এই পুরো প্রক্রিয়াটা তো একটা শাস্তির মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
ভারতের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত খাত একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। অথচ করোনাভাইরাস মোকাবেলার পুরো দায়িত্বটা এসে পড়েছে সরকারি খাতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর। সরকারি স্বাস্থ্য সেবা খাতে জনবলের ঘাটতি আছে। সরকারের ল্যাবরেটরী এবং হাসপাতালগুলোতে সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে বহু মানুষ, যাদের হয়তো লক্ষণ ছিল, তারা পরীক্ষা করানোর জন্য হাসপাতালে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ঘরে থাকাটাই শ্রেয় বলে ভেবেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির হাসপাতালগুলোর যে অব্যবস্থাপনা এবং বিশৃঙ্খলার কথা প্রচার পেয়েছে, তা মানুষের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
“এই ভয় আর এই স্টিগমার কারণে করোনাভাইরাস মহামারী যেন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে”, বলছেন প্রফেসর রেড্ডি।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল ব্যক্তি খাতের চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা এবং সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা, যাতে করে করোনাভাইরাসের টেস্টিং এবং হাসপাতালে বেশি রোগী ভর্তির ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু দিল্লির সরকার আসলে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফি, কিভাবে পরীক্ষা করা হবে তার নিয়ম কানুন এসব নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা চালিয়ে অনেক সময় নষ্ট করেছেন।
প্রফেসর রেড্ডি বলছেন, সরকার আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ক্লিনিক্যাল সার্ভিস, বিশেষ করে টেস্টিং এবং হাসপাতালে চিকিৎসা এসবের ব্যবস্থা করার জন্য। এর ফলে মৌলিক জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কাজগুলো উপেক্ষিত হয়েছে।
দিল্লিতে ক্ষমতার দুটি কেন্দ্র
আরেকটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দিল্লির প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যদিও এই রাজ্যটি পরিচালনা করেন মিস্টার কেজরিওয়াল এবং তার সরকার, কিন্তু দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর, যিনি ফেডারেল সরকারের প্রতিনিধি, তারও কিছু ক্ষমতা আছে।
এই দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, যেগুলো আবার পরে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। অনেক সময় এরকম নির্দেশ জারি করা এবং প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। মিস্টার কেজরিওয়ালের সঙ্গে ভারতের ফেডারেল সরকারের সম্পর্ক যে খুব ভাল ছিল না এটা তারই প্রমাণ।
প্রফেসর রেড্ডি বলেন, “আমরা একটা সিদ্ধান্ত থেকে আরেকটা সিদ্ধান্তের মধ্যে এভাবে দোল খেতে পারিনা, যখন কিনা এরকম জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে খাবি খাওয়ার পরিবর্তে রাজধানী শহর হিসেবে দিল্লির একটা আলাদা মনোযোগ পাওয়া উচিৎ ছিল।”
তবে প্রফেসর রেড্ডি বলছেন, কোনো মহামারী মোকাবেলার ক্ষেত্রেই সময় চলে গেছে, একথা বলার সুযোগ নেই।
“এই মহামারি ঠেকাতে আপনাকে এখনো বেশ শক্ত একটা প্রচেষ্টা নিতে হবে। আপনাকে সেটা করতেই হবে।”








