৩০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন: যেভাবে ইয়ুর্গেন ক্লপ পাল্টে দিলেন লিভারপুলকে

বৃহস্পতিবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটি ২-১ গোলে চেলসির কাছে হারার পর লিভারপুলের ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে।

১৯৯০ সালের পর আবারো ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লিভারপুল।

মার্চ মাসে করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতির কারণে সব ধরণের খেলা বন্ধ থাকায় লিভারপুল ফ্যানরা আশঙ্কায় ছিল যে ত্রিশ বছরের অপেক্ষা আরো দীর্ঘায়িত না হয়।

তবে প্রিমিয়ার লিগের খেলা শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা এই মুহুর্তটির অপেক্ষা করছিলেন।

এ মৌসুমের শিরোপা জিততে ইয়ুর্গেন ক্লপের দলের মাত্র একটি জয় প্রয়োজন ছিল।

তবে ম্যানচেস্টার সিটি হেরে যাওয়ায় সাত ম্যাচ বাকি থাকতেই নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের শিরোপা।

ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে এটি লিভারপুলের ১৯তম শিরোপা আর ১৯৮৯-৯০ মৌসুমের পর এটিই প্রথম।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে লিভারপুল শহরের মেয়র ক্লাবের সমর্থকদের ঘরে থাকার আহ্বান জানালেও শিরোপা উদযাপন করতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল লিভারপুলের মাঠ অ্যানফিল্ডে।

শিরোপা জয়ের পর লিভারপুল ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ স্কাই স্পোর্টসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, "এর চেয়ে বড় কিছু আমি চিন্তা করতে পারি না। আমি যতটুকু ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি এই অর্জন।"

আরো পড়তে পারেন:

যেভাবে লিভারপুলকে শিরোপাজয়ী দলে পরিণত করলেন ক্লপ

আটই অক্টোবর ২০১৫ সালে লিভারপুলের ম্যানেজার হিসেবে প্রথম যেদিন ইয়ুর্গেন ক্লপ যোগ দেন, সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্যের অন্যতম একটি মন্তব্য ছিল, "আমাদের নিজেদের ওপর সন্দেহ নয়, বিশ্বাস করতে হবে।"

আজ পাঁচ বছর পর একটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা আর একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতার পর ক্লপ ও তার খেলোয়াড়দের সামর্থ্য নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে না আর।

সাধারণ মানুষ ও মিডিয়ার সামনে ইয়ুর্গেন ক্লপের ভাবমূর্তিটা ফুটবল ট্যাকটিকস সম্পন্ন বিশালদেহী সদা হাস্যময় এক ব্যক্তি হিসেবে।

মাঠের টেকনিক্যাল জায়গায় তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও খেলোয়াড়দের সাথে বন্ধুসুলভ ব্যবহার ও উদযাপনের মধ্যে দিয়েই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত তিনি।

তবে মিডিয়া আর লোকচক্ষুর আড়ালে ক্লপের নিখুঁত কৌশল, আধুনিক ফুটবলের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তার চিন্তা এবং মাঠের বাইরের বিষয়গুলো সামাল দেয়ার দক্ষতা তাকে লিভারপুলের পুনরুত্থানের পেছনে প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে ভূমিকা রেখেছে।

ক্লপের সমালোচকরা বলেন, তিনি লিভারপুলের ট্রেইনিং গ্রাউন্ডে শুধু হাসিমুখে ঘুরে বেড়ান আর খেলোয়াড়দের আলিঙ্গন করেন। বাস্তবতাটা যে তার থেকে খুব বেশি ভিন্ন, সেরকমটা কিন্তু নয়।

ক্লপ বিশ্বাস করেন ট্রেনিং গ্রাউন্ডেই আসল পার্থক্যটা তৈরি করা হয়। এই ট্রেনিং গ্রাউন্ডেই শারীরিক সব ধরণের প্রশিক্ষণ নেয়া হয় এবং এখানেই কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো নিয়ে কাজ করা ও সেগুলো পরীক্ষা করা হয়।

তাই প্রতিটি ট্রেনিং সেশনের আগে তার সহকারীদের সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুরো সেশনের পরিকল্পনা করেন ক্লপ। এরপর দলের খেলোয়াড়দের কার কী করতে হবে, তা বিস্তারিতভাবে তাদের বুঝিয়ে দেন তিনি।

ক্লপ শুধু লিভারপুলের ম্যানেজার নন, তিনি দলের কোচও। প্রতিদিনের প্রত্যেকটি ছোট ছোট খুঁটিনাটি বিষয় তিনি আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখেন এবং সেগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণও থাকে তার কাছে।

পরিকল্পনামাফিক কাজ করে দক্ষতা ও সাফল্য অর্জনের যেই মূলমন্ত্র ক্লপ তার শিষ্যদের শেখান, তিনি নিজেও সেই মূলনীতিতেই বিশ্বাস করেন।

তিনি ঘড়ির কাঁটা ধরে সময়মত সব কাজ করার অনুপ্রেরণা দেন খেলোয়াড়দের। তিনি ১০টায় কোনো মিটিং আহ্বান করলে ঠিক ১০টার সময়ই সবাই উপস্থিত থাকবে বলে আশা করেন।

লিভারপুলের সাফল্যের পেছনে দলের ম্যানেজারের কঠিন পরিশ্রমের পাশাপাশি তার পেছনের সবার পরিশ্রমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লপ সবসময় একটা কথা বলেন যে, "আমার জীবনের শতভাগ খেলোয়াড়দের জন্য, খেলোয়াড়দের সাথে।"

লিভারপুলের শিরোপা জয়ের পেছনে কোনো রূপকথার গল্প নেই।

ইয়ুর্গেন ক্লপ তাদের নেতা, কৌশলী এবং অনুপ্রেরণা। কিন্তু তার সাথে কোচিং টিমে কাজ করা সদস্যদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

জার্মান ক্লপ যখন লিভারপুলে আসেন, তখন সবাই নিশ্চিতভাবে জানতো যে তার সাথে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী যেল্জকো বুভাচ আর পিটার ক্রাউইয়েতজ যোগ দিতে যাচ্ছেন।

বুভাচ আর ক্রাউইয়েতজ এর আগে মাইঞ্জ ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে ক্লপের ম্যানেজমেন্ট টিমের সাথে কাজ করেছেন। ক্লপ যেখানেই গেছেন, তার সাথে একই প্যাকেজের অংশ হিসেবে এই দু'জনও গেছেন।

এই তিনজনের মধ্যে কৌশলগত বিষয়ে দক্ষতার জন্য বসনিয়ান-সার্বিয়ান বুভাচ পরিচিত ছিলেন 'দ্য ব্রেইন' বা মস্তিষ্ক হিসেবে, আর বিশ্লেষণী ক্ষমতার জন্য জার্মান ক্রাউইয়েতজ পরিচিত ছিলেন 'দ্য আই' বা চোখ হিসেবে।

কিন্তু ২০১৮ সালের এপ্রিলে হঠাৎ করেই ক্লপের ১৭ বছরের সহযোগী বুভাচ লিভারপুল ছেড়ে গেলে দলেরন কোচিংয়ে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে। ক্লপ ও ক্রাউইয়েতজের সাথে যুক্ত হন ৩৭ বছর বয়সী ডাচম্যান পেপ লিন্ডার্স।

লিভারপুলে লিন্ডার্স আগেই যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। একসময় ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ের কোচ লিন্ডার্স ২০১৫ সালে মূল দলের ডেভেলপমেন্ট কোচ হিসেবে যোগ দেন।

২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি দলের ম্যানেজার নিয়োগ পান লিন্ডার্স। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই বুভাচের শূন্যস্থান পূরণ করতে লিন্ডার্সকে আবারো লিভারপুলে নিয়ে আসেন ক্লপ।

ক্লপের অধীনে লিন্ডার্স ও ক্রাউইয়েতজ দু'জনই একই পর্যায়ের ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ক্রাউইয়েতজের অধীনে চারজন বিশ্লেষক কাজ করেন, যাদের মাধ্যমে আগের এবং ভবিষ্যতের সব খেলার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ট্রেনিং সেশনে তুলে নিয়ে আসা হয়। এই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই ট্রেনিং সেশনে কী করা হবে এবং ম্যাচে কোন দল নামানো হবে, তার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সাধারণ একটি ট্রেনিংয়ের সপ্তাহে ক্রাউইয়েতজ ক্লপকে নব্বই মিনিটের বিশ্লেষণী তথ্য দেন, তারপর সেটিকে ২৫-৩০ মিনিটের দুই ভাগে বিভক্ত করে ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের সামনে পেশ করেন ক্লপ।

লিভারপুলের খেলোয়াড়রা যেন তাদের প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে জানতে পারেন, মূলত সেই লক্ষ্যে এই সেশন পরিচালনা করা হতো।

ক্রাউইয়েতজের বিশ্লেষণ যেমন লিভারপুলের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি লিন্ডার্সের ট্র্যাডিশনাল সহকারী কোচের ভূমিকা দলের ভেতরে ও বাইরের ঘটনাগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

খেলোয়াড়রা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে কিনা, কাকে কখন কী মাত্রায় ট্রেনিং করতে হবে - এই বিষয়গুলো নজরে রাখতেন লিন্ডার্স।

পাশাপাশি ফুটবলের বাইরে দলের অন্যান্য বিষয়গুলো সামলানোর দায়িত্বও ছিল লিন্ডার্সের।

নিজের এবং নিজের সাথে কাজ করা সহযোগীদের নিয়ে ক্লপের আত্মবিশ্বাস এতই বেশি যে, তিনি বলতেন: "আমি জানি আমি কয়েকটি বিষয়ে ভালো, আর কিছু বিষয়ে খূব ভালো।, আর আমার মনে হয় সেটিই যথেষ্ট।"

"আমার আত্মবিশ্বাস এত বেশি যে আমি আমার সাথে কাজ করা ব্যক্তিদের আমার চেয়েও বেশি উন্নতি করতে দেখতে চাই। এটি নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করতে চাই।"

আর ক্লপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর তার দলে খেলা প্রায় প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ের খেলার মানের উন্নতি হয়েছে।

শুধু খেলোয়াড় আর কোচিং স্টাফই নয়, লিভারপুলের ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথেও ক্লপের সুসম্পর্ক দলের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

ক্লাবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর মাইকেল এডওয়ার্ডস ও ক্লাবের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশের মালিক মাইক গর্ডনের সাথে ক্লপের সম্পর্ককে 'পবিত্র ত্রয়ী' হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে অ্যানফিল্ডে।

এদের মধ্যে মাইক গর্ডনকে বলা হয় ক্লাবের 'ম্যানেজিং মালিক।'

ক্লাবের মূল মালিকানা জন হেনরি ও চেয়ারম্যান টম ওয়ার্নারের কাছে থাকলেও মালিকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী মাইক গর্ডনই, কারণ ক্লপ ও স্পোর্টিং ডিরেক্টর এডওয়ার্ডসের সাথে আলোচনা করে খেলোয়াড়দের চুক্তি নবায়ন থেকে শুরু করে, অ্যাকাডেমির কোচদের নিয়োগ দেয়ার মত খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর সিদ্ধান্তও তিনিই নিয়ে থাকেন।

ক্লপ এবং এডওয়ার্ডস যেন তাদের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে ফুটবল সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে উন্নতি করতে পারে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান গর্ডন। এই দু'জনের সিদ্ধান্ত ও বিচারের ওপর গর্ডনের পূর্ণ ভরসা রয়েছে।

এই তিনজন নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যে থাকেন, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আদান-প্রদান থাকে তাদের মধ্যে।

মাইক গর্ডন মূলত ক্লাবের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করার দায়িত্বে থাকলেও ২০১১ সালে অ্যানালিটিকসের প্রধান হিসেবে ক্লাবে যোগ দেয়া এডওয়ার্ডস মিডিয়ার কাছ থেকে কিছুটা গোপনেই থাকেন। তার বিশ্বাস, ক্লপের লিভারপুলের যা প্রয়োজন, নিভৃতে থেকেই সেই কাজগুলো ভালভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন তিনি।

তবে ট্রেনিং সেশনে এডওয়ার্ড যথেষ্ট সম্মানিত এবং প্রশংসিত। ক্লপের যেমন নিজের কোচিং স্টাফদের নিয়ে একটি টিম রয়েছে, সেরকমই নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় দলে যোগ দেয়ানোর জন্য এডওয়ার্ডসেরও নিজস্ব স্কাউটিং টিম রয়েছে।

আর এই দুই টিমের সাথে সমন্বয় করে ও তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে মাইক গর্ডন কর্তৃপক্ষের হয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন।

এই তিনজনের রসায়ন লিভারপুলের সাফল্যের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

তাই লিভারপুলে যতদিন ক্লপ থাকবেন, তারা ততদিন ইউরোপের ফুটবলের অন্যতম জায়ান্ট হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।