করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় কতটা

ছবির উৎস, K M ASAD
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ঈদ উপলক্ষে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া শুরু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই নগদ টাকা দেয়ার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন।
এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার বিভিন্ন কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
কিন্তু খাদ্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছিল।
নানা অভিযোগের মুখে ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং তদারকির বিষয়টা প্রশাসন বা আমলাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একজন করে সচিবকে একটি করে জেলার দায়িত্ব দেয়া হয় কয়েক সপ্তাহ আগে।
এরপরও পর্যবেক্ষকদের অনেকে সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ করেন।
এছাড়া যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইতিমধ্যে প্রায় সাত কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে, কিন্তু চলমান লকডাউনের দুই মাস পর এসেও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
উত্তরের বগুড়া জেলা শহরের বাসিন্দা মাসুদ রানা স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেটি এখন বন্ধ এবং দুই মাস ধরে বেতন না পেয়ে তিনি চরম সংকটে রয়েছেন। তিনি খাদ্য সহায়তা দেয়া এবং তালিকা তৈরির কথা শুনেছেন। তবে এর কোনটিই তিনি পাননি বলে জানান।
"আমার পরিবারে মা, দাদি, আমি এবং আমার ছোট ভাই-এই চারজনের পরিবারের পুরো দায়িত্বই আমার ঘাড়ে। আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, খাবার এবং অর্থসংকটে আছি। ধার করে চলছি। সরকারের খাদ্য সাহায্য বা তালিকা কিছুই আমরা পাইনি।"
বিভিন্ন জায়গা থেকেই অনেকে এমন অভিযোগ করছেন।



ছবির উৎস, Getty Images
সহায়তা দেয়ার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে জটিলতা
ঈদ উপলক্ষে ৫০ লাখ পরিবারকে যে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে, সেজন্য তালিকা তৈরি করতে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে একদিন সময় দেয়া হয়েছিল।
এছাড়া ১০টাকা কেজি দরে একেকটি পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার যে কর্মসূচি চলছে, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে এর বিতরণে ডিলারদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে কর্মসূচি কয়েকদিনের জন্য বন্ধও করা হয়েছিল।
বিভিন্ন জেলায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১৫টি মামলায় ৩৫ জনের মতো গ্রেফতার হয়েছে।
তবে যে তালিকার ভিত্তিতে এই চাল দেয়া হয়, সেই তালিকাও ছিল বেশ কয়েকবছরের পুরনো। এই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ওঠায় এখন নতুন তালিকা করা হচ্ছে।
কম সময়ের মধ্যে এসব তালিকা তৈরি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ইউনিয়ন পরিষদের ওপরই নির্ভর করছে এবং তাতে ভোটের চিন্তা থেকে তালিকাভুক্ত করাসহ বিভিন্ন প্রশ্ন থাকছে বলে পর্যবেক্ষকরা বলছেন।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেছেন, "মানবিক সহায়তার তালিকা আমরা এখনও শেষ করতে পারি নাই। এত অল্প সময় আমরা নিজেরা সরাসরি মাঠে কাজ করতে পারি নাই। আমরা ইউনিয়নগুলোর চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে তালিকা নিয়েছি।
''আমার উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার বরাদ্দ ছিল। এত লোকের তালিকা একদিন করা খুব কষ্টসাধ্য ছিল। তালিকাটি যখন আমরা জমা দিয়েছি, দেখা গেছে অসংখ্য মানুষের ফোন নম্বর নাই," জানান রওনক জাহান ।
তিনি আরও বলেছেন, "আমরা চেষ্টা করি সঠিক ব্যক্তিকে দেয়ার। কিন্তু আমরা যাচাইয়ের সময়টুকু পাই না। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় অনেক জটিলতা হয়।"
মাঠ পর্যায়ের এই কর্মকর্তসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা দাবি করেন, এখন সরকারি এসব সহায়তা এবং বেসরকারি উদ্যোগ সাহায্য দেয়া সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় করা হচ্ছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের মধ্যে সহায়তার কর্মসূচি নিয়ে এখনও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
সরকার কী বলছে?
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমান বলেছেন, এখন কোথাও সমন্বয়ের কোন ঘাটতি নেই।
"আমরা মোট এক লাখ ২৫ হাজার পারিবারের তালিকা করে তাদের ডাটাবেজ তৈরি করেছি। এই পরিবারগুলোকে আমরা নিয়মিত খাদ্য সহায়তা দেবো।"
তিনি আরও বলেছেন, "এখন এই যে ৫০ লক্ষ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দিচ্ছি। এই টাকা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছে চলে যাবে। এখানে মধ্যস্থতাকারীও কেউ নাই। এর চেয়ে সমন্বয় তো আর কিছু খুঁজে পাই না। আমরা মনে করছি, আমাদের সব কর্মসূচি সমন্বয়ের ভিত্তিতে হচ্ছে।"
কিন্তু সরকারের সহায়তা কী যথেষ্ট?
ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, তারা পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন।
সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস এর সিনিয়র গবেষক ড: নাজনীন আহমেদ বলেছেন, "আমাদের তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র। তাদেরই সবাইকে আমরা বিভিন্ন সময় সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সহায়তা দিতে পারি না। এখন করোনা পরিস্থিতিতে এই আকারটা অনেক বড়।"
"শুধু ঐ দরিদ্র গোষ্ঠী নয়, তার সাথে নিম্ন মধ্যবিত্ত, হঠাৎ দরিদ্র হয়ে যাওয়া অনেক মানুষ কিন্তু যুক্ত হয়েছে। ফলে সরকার যত মানুষকে সাহায্য দিতে চাইছে, সেখানে সাহায্য পাওয়া উচিত-এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি।"








