করোনাভাইরাস: বেজি, নেউল নাকি কচ্ছপ? হদিশ নেই কে প্রথম ছড়ালো এই ভাইরাস

ছবির উৎস, Reuters
- Author, ভিক্টোরিয়া গিল
- Role, বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা, বিবিসি নিউজ
এ যাবত বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যাচ্ছে বুনো বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস গেছে আরেকটি কোন প্রাণীর মাধ্যেমে, যেটি ছিল ওই ভাইরাসের "অন্তর্বর্তীকালীন বাসা"।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে গবেষণা থেকে আমরা জেনেছি এই ভাইরাসের "প্রাকৃতিক উৎস" কী ছিল, কিন্তু কিছু বিজ্ঞানী বলছেন প্রথম ব্যক্তি ঠিক কীভাবে সংক্রমিত হয়েছিলেন তা হয়ত কখনই জানা যাবে না।
চীনে উহানের সেই বন্যপ্রাণীর বাজার, বর্তমানে যা কুখ্যাত হয়ে উঠেছে এই ভাইরাসের কারণে, সেখান থেকে বিক্রি হওয়া কোন জন্তু এই ভাইরাসের অন্তর্বর্তী আস্তানা ছিল কি না তা এখনও স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না।
তবে বুনো জীবজন্তুর ব্যবসাই যে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকার সম্ভাব্য পথ সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা একরকম নিশ্চিত।

গবেষকরা বলছেন এ ধরনের ব্যবসায় এক প্রজাতির প্রাণী থেকে আরেক প্রজাতির প্রাণীতে রোগ সংক্রমিত হয়। এর আগেও এভাবেই অন্য ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। আর এবারেও ঠিক সেটাই ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কোভিড নাইনটিন নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. মারিয়া ভ্যন কেরখোভ। তিনি বিবিসিকে বলেছেন: "আমরা এধরনের একটা মহামারি ঘটবে জানতাম। মূল প্রশ্নটা ছিল -কখন তা ঘটবে?"
সংক্রমণের চেইন
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মানুষের শরীরে অন্য রোগব্যাধি যেভাবে ঢোকে, এক্ষেত্রেও সেই একইভাবে ভাইরাসটি প্রথমে একটি জন্তু থেকে অন্য জন্তুর দেহে গিয়ে ঢুকেছে যেটা ধরা পড়েনি।
লন্ডনে জুওলজিকাল সোসাইটির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কানিংহাম ব্যাখ্যা করেছেন: "এমনটা যে ঘটবে, তা বেশ কিছুকাল ধরেই আমরা আশংকা করছিলাম।
"সাম্প্রতিক সময়ে জীবজন্তুর শরীর থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা বেড়ে গেছে, কারণ মানুষ বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে আসছে আগের তুলনায় বেশি, তাদের বন্য পরিবেশে মানুষের আনাগোনাও অনেক বেড়ে গেছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
কোভিড নাইনটিন প্রাণী চেইনের মাধ্যমে ছড়ানো প্রথম ভাইরাস নয়। এর আগেও এই প্রক্রিয়ায় যেসব ভাইরাস ছড়িয়েছে সেগুলো আমাদের পরিচিতি নাম- যেমন ইবোলা, রেবিস (জলাতঙ্ক), সার্স, মার্স। আর এগুলোর সবগুলোরই উৎপত্তি বাদুড় থেকে।
বাদুড় থেকে উৎপন্ন ভাইরাসগুলোর মানুষকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তর গবেষণা করেছেন- বিশেষ করে সার্সের প্রাদুর্ভাবের পর। ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা চীনের একটি গুহা থেকে সার্স-সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত করোনাভাইরাসের জিনের বিশাল পরিমাণ নমুনাও জোগাড় করেছেন।
বিজ্ঞানীরা এসব গবেষণায় দেখেছেন, এই জীবাণুর গঠন এমনই যে নতুন একটা জন্তুর শরীরে বাসা বাঁধার জন্য সেই জন্তুর দেহকাষের আবরণ ভেদ করে কোষের ভেতরে ঢোকার ক্ষমতা তার আছে।
সবধরনের করোনাভাইরাসের জিনে এই রাসায়নিক শক্তির উপস্থিতি বিজ্ঞানীরা দেখেছেন। বিশেষ করে সার্স কোভ টু ভাইরাসে যে প্রোটিন রয়েছে, তা দেহকোষের প্রতিরোধী দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে সংক্রমণ ঘটায় বলেছেন গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডেভিড রবার্টসন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
এ কারণেই করোনাভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে সহজে এবং দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। আর বাদুড়ের ভাইরাসকে মানুষের দেহকোষে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে বন্যপ্রাণীর বাজার।
বেচাকেনা ও সংক্রমণ
আমরা শুনেছি উহানের বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে এই ভাইরাসের "সূত্রপাত"। কিন্তু যে জন্তুর শরীরে এর প্যাথোজেন বা সোজা কথায় জীবাণুটা ছিল- সেটা কিন্তু ওই বাজারে ছিল না।
"ওই বাজারের সঙ্গে জড়িত একদল মানুষ প্রথমে যে সংক্রমিত হয়েছিলেন, সেটা অবস্থাগত প্রমাণ," কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস উড বলেছেন।
"এই সংক্রমণ অন্য কোথাও থেকে আসতে পারে, এবং ঘটনাচক্রে ওই বাজারের একদল মানুষকে সংক্রমিত করে থাকতে পারে। তবে এই ভাইরাস প্রাণীর শরীর থেকেই যেহেতু এসেছে তাই বাজারের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার একটা যুক্তি খোঁজা স্বাভাবিক।"
অধ্যাপক কানিংহাম একমত যে, বন্যপ্রাণী যেসব বাজারে কেনাবেচা হয় সে বাজারগুলোই জীবজন্তুর দেহের ভাইরাস অন্য জীবজন্তুর দেহে ঢোকার হটস্পট। "এসব খোলা বাজারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নানাধরনের অনেক জন্তু কেনাবেচা হয়। নানা প্রজাতির জন্তুকে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় একসাথে রাখা হয়। ফলে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ সেখানে খুবই বেশি।"

ছবির উৎস, Victoria Gill
বনের জীবজন্তু থেকে অতীতে দ্বিতীয় কোন মাধ্যমের দ্বারা মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ইতিহাস আছে। যেমন খামারের পশু, শিকার করা জন্তু বা বাজারে কেনা পশুপাখি।
অধ্যাপক উড বলছেন, "সার্স ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকেছিল পাম সিভেট নামে এক বিশেষ প্রজাতির গন্ধগোকুলের মধ্যে মহামারির কারণে। দক্ষিণ চীনে এই গন্ধগোকুল মানুষ খায় ও বাজারে বিক্রি হয়।
"এই তথ্য গবেষণার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন পাম সিভেট প্রাণীর মধ্যেই একটা মহামারি শুরু হয়। গন্ধগোকুল থেকে সেই ভাইরাস উপছে এসে মানুষের মধ্যে ঢোকার বিষয়টি ঠেকানোর জন্য তখন প্রাণীদের মধ্যে মহামারি আগে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন ছিল," বলছেন অধ্যাপক উড।
এই নতুন কোভিড নাইনটিনের সংক্রমণে চেইন-এ যে প্রাণীটি গুরুত্বপূর্ণ -যার মাধ্যমে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ঢুকেছে সেটার সন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের পাওয়া সূত্রগুলো যে জন্তুগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে সেগুলো হল মিংক (বেজি প্রজাতির জন্তু), ফেরেট (নেউল প্রজাতির প্রাণী) , এমনকী কচ্ছপ।
একইধরনের ভাইরাস পাওয়া গেছে চোরাচালান হওয়া প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই-এর শরীরে। চীনের বাজারে চোরাই পথে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা এই প্রাণীর দেহে এমন একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে যা কোভিড নাইনটিনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন সন্দেহভাজন এসব প্রজাতির সঙ্গে এবারের প্রাদুর্ভাবের কোন যোগসূত্র তারা দেখেননি। বিজ্ঞানীরা শুধু এটুকুই নিশ্চিত করেছেন এই বন্যপ্রাণীগুলো নিয়ে তাদের কাজ এবং বাণিজ্যিক কারণে এদের ব্যবহার এই প্রাণীগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্ণিত করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
অধ্যাপক উড বলছেন, "বন্যপ্রাণীর সাথে মানুষের বা পোষা প্রাণীর সরাসরি সংযোগ এই গবেষণার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।"
তিনি বলছেন বিশ্বব্যাপী পশুপাখির বাজার একটা বড় ব্যবসা যেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।
"অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠি জীবনধারণের জন্য এসব পশুপাখির ওপর নির্ভরশীল। এইসব বাণিজ্য নিষিদ্ধ করলে এসব ব্যবসা তখন হবে চোরাপথে। তখন এসব ব্যবসার কথা জানাও যাবে না।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই এধরনের পশুর বাজারকে স্বাস্থ্যসম্মত করার আহ্বান জানিয়েছে। উহানের বাজার থেকে যেমন এই ভাইরাস ছড়িয়েছে, তেমনি আফ্রিকায় বন্যপশুর মাংসের বাজার থেকে ইবোলা ছড়িয়েছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু কোভিড নাইনটিন বাদুড় থেকে প্রথম কোন্ প্রাণীর শরীরে ঢুকেছিল, আসলে কোন্ প্রাণী প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তিকে সংক্রমিত করেছিল, তা বিজ্ঞানীদের জন্য নিশ্চিতভাবে বলা হয়ত কোনদিনই আর সম্ভব হবে না এবং যে বিভীষিকাময় জীবাণু সারা বিশ্বে মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী, তার "দ্বিতীয় বাসার" সন্ধান মানুষের কাছে রহস্যেই ঢাকা থেকে যাবে।










