করোনাভাইরাস: পহেলা বৈশাখের বাজারে ধস

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নির্দেশনায় বাংলা নববর্ষের সকল অনুষ্ঠানে জনসমাগম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ঘরে বসে 'ডিজিটাল পদ্ধতিতে' পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য বলা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে।
এমন অবস্থায় পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছর যে রকম জমজমাট প্রস্তুতি থাকে, এবারে সে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। যার একটি প্রভাব পড়েছে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাজারের ওপর।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
নারায়ণগঞ্জের তাঁতিপল্লিতে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের আগে কারিগরদের দম ফেলার সময় হতো না। এবার তাদের হাতে কোন কাজ নেই।
একের পর এক অর্ডার বাতিল হওয়ায় মহাজনরাও বিপাকে পড়েছেন।
তারা না পারছেন ঋণ পরিশোধ করতে, না পারছেন ক্ষুদ্র তাঁতিদের মজুরি দিতে।
এদিকে পাইকাররা পুরানো অর্ডারের পণ্য নিতে না চাওয়ায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন এই তাঁতিরা।
তাঁতি মো. মনির হোসেন বলেন, "আগে এই সময় পঁচিশটা কাপড়ের অর্ডার থাকলেও লাখ টাকার উপ্রে ইনকাম ছিল। এখন যা চলতাসে এই রকম দুইমাস থাকলে আমার লাখ টাকার উপ্রে ক্ষতি হয়া যাবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
মি. হোসেনের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশজ পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বড় ধরণের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।
এছাড়া সামনের মাসেই রোজার ঈদ হওয়ায় দুটি উৎসব মিলিয়ে কয়েক মাস আগে থেকেই বড় অংকের বিনিয়োগ করে রেখেছিলেন তারা।
কিন্তু এখন তাদের পণ্য বিক্রি করার কোন অবস্থা নেই।
ফ্যাশন হাউজ শৈলীর স্বত্বাধিকারী তাহমীনা শৈলী বুঝতে পারছেন না তিনি এবং তার মতো মাঝারি উদ্যোক্তারা কবে নাগাদ এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
"সুতা, রং, কারিগরদের অ্যাডভানস করা আছে। গ্রাফিক্সের কাজ, তারপর শোরুমের ইন্টেরিওর। এতো ইনভেস্ট করার পরে এখন কিছু বিক্রি করতে পারছি না। ফ্যাক্টরিতে ম্যাটেরিয়াল নষ্ট হচ্ছে। অনেক লস হয়ে গেছে।"
পহেলা বৈশাখের এই আয় থেকে সারাবছরের কর্ম পরিকল্পনা করে থাকেন মিসেস শৈলী।
তাই এবারের লোকসান সারা বছরব্যাপী বয়ে বেড়াতে হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
"পহেলা বৈশাখে যে বিক্রি হয় এটার টাকা দিয়ে ছোট ছোট অন্য প্ল্যান করি। এখন বলতে গেলে সব বন্ধ হওয়ার অবস্থা। কি যে করবো বুঝতে পারছি না।" বলেন মিসেস শৈলী।



ছবির উৎস, Getty Images
আবার কেনাকাটা করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় ভোক্তাদের কাছেও নববর্ষ উদযাপন যেন ম্লান হয়ে গেছে।
ঢাকার বাসিন্দা অজন্তা বড়ুয়া পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতেন।
নিজের জন্য নতুন শাড়ি/গহনা কেনার পাশাপাশি পরিবারের জন্যও কেনাকাটা করতেন তিনি।
বাড়িতেও থাকতো নতুন মাটির বাসনে বাঙলা খাবারের বিশেষ আয়োজন।
কিন্তু এবারের কার্যত লকডাউন পরিস্থিতিতে তার বর্ষবরণকে ঘিরে কোন আয়োজনই থাকছে না।
"এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই একটা প্ল্যান থাকে যে নতুন কাপড় কেনার। এবারও ভেবেছিলাম নতুন শাড়ি, মাটির গয়না পরে বের হবো। কিন্তু এর কিছুই আসলে হবে না। কারণ সবাই বাসায় বন্দি। উৎসবের আনন্দটাই এবার নেই।" বলেন মিস বড়ুয়া।

ছবির উৎস, Getty Images
বর্ষবরণকে ঘিরে পুরো দেশের অর্থনীতিতে বড় অংকের লেনদেন হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে এই লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো।
এর ওপর ভিত্তি করে শহর ও গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিকাশ লাভ করেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধস নামতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ নাজনিন আহমেদ।
"এবারে পহেলা বৈশাখে যে ক্ষতিটা হচ্ছে সেটার প্রভাব কিন্তু গ্রামের ওই পুতুল বানানোর কারিগর থেকে শুরু করে শহরের বিলাসবহুল বিপানি বিতানের ওপরও পড়েছে। কারণ তাদের বিক্রির একটা বড় উৎস হচ্ছে এই পহেলা বৈশাখ।"
এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তিনি অনলাইনে পণ্য বিক্রির পরামর্শ দিয়েছেন।
এবং এই পণ্যের সরবরাহ অর্থাৎ উদ্যোক্তার কাছ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যটি পৌঁছে দেয়ার কাজটি যেন নিরাপদে হয়, সেজন্য সরকারের সেবাদানকারী সংস্থা যেমন পুলিশ, সেনাবাহিনী সেইসঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে থাকা লাখ লাখ হস্ত ও কারুশিল্পীরা ব্যবসা করে থাকেন।
প্রান্তিক এই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সামর্থ্যবানদের কেনাকাটা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন মিসেস আহমেদ।
তিনি মনে করেন, এসব পণ্যের বিক্রি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির চাকাও সচল হবে।








