করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে অনেকে সরকারি তথ্য নিয়ে সন্দিহান, জবাবে কী বলছে আইইডিসিআর

সংবাদ সম্মেলন করছেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা।

ছবির উৎস, IEDCR

ছবির ক্যাপশান, সংবাদ সম্মেলন করছেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা।
    • Author, মিজানুর রহমান খান
    • Role, বিবিসি বাংলা, লন্ডন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে লোকজনের প্রশ্নের মধ্যেই বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে যতোটুকু তথ্য আছে ততোটুকু তথ্যই তারা তুলে ধরছেন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'আইইডিসিআর'-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগির বিবিসিকে বলছেন, "আমরা একটা শব্দও এখানে টুইস্ট করার চেষ্টা করি না।"

"এটা তো বাংলাদেশে সৃষ্ট কোন রোগ নয়। পৃথিবীর উন্নত সকল দেশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তারাও তো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে কেন তথ্য লুকাবো?" আইইডিসিআরের এই কর্মকর্তার প্রশ্ন।

করোনাভাইরাস সন্দেহে দেশটিতে কতো লোকের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কতজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, কতজন সুস্থ হয়ে গেছেন এবং কতো জনের মৃত্যু হয়েছে এসব পরিসংখ্যান প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।

আইইডিসিআরের দেওয়া তথ্য অনুসারে সারা দেশে সোমবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জন। মৃত্যু হয়েছে পাঁচ জনের।

এর আগে দুই দিন বিরতি দিয়ে নতুন একজন রোগী পাওয়া গেছে বলে আজ সোমবার জানানো হয়েছে। শুক্র ও শনিবার আক্রান্ত কোন ব্যক্তি পাওয়া যায়নি।

ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এভাবেই একজন ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা কাজ করছেন।

ছবির উৎস, getty images

ছবির ক্যাপশান, ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এভাবেই একজন ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা কাজ করছেন।

আইইডিসিআরের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া এসব তথ্য নিয়ে বাংলাদেশে লোকজনের মধ্যে বড় ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করেন যে আইইডিসিআর প্রকৃত তথ্য গোপন করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই এই প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা করছেন। তাদের অভিযোগ যে সরকারের নির্দেশে তারা আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে বলছেন।

ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এসব তথ্য বিশ্বাস করতে পারছেন না। তারা প্রশ্ন তুলছেন সারা পৃথিবীতে যখন আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা ধাই ধাই করে বাড়ছে তখন বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে এই সংখ্যা এতো কম হয় কীভাবে?

বিশ্বে এ পর্যন্ত সাত লক্ষ ৩০ হাজার লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩ হাজার।

এদের মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৩৫ হাজার। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মানুষের। দক্ষিণ এশিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ৬২৪ জন আর মারা গেছেন ১৩৯ জন।

ঢাকার কাছে নারায়নগঞ্জ-এ মাস্ক পরিহিত রিক্সাচালক এবং আরোহী, ২৯-০৩-২০২০।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে সরকারী তথ্য নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, "আমরা সারা বিশ্বের তথ্য দেখছি, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা দেখছি কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকাচ্ছি না।"

"সার্বিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে করোনাভাইরাসের কেস কম। সেই তুলনায় তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশেও এখনও পর্যন্ত কম কেস পাওয়া গেছে। তবে এটা যে একদম এরকমই থাকবে, একদমই বাড়বে না সেটা তো বলা যাবে না। এই সংখ্যা বাড়তেও পারে আবার নাও বাড়তে পারে," বলেন মি. আলমগির।

আইইডিসিআর গত ৮ই মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। এরপর ১৮ই মার্চ প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর কথা জানানো হয়।

কম পরীক্ষা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সন্দেহে পরীক্ষার হারও অনেক কম। এ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে তেরো'শর মতো ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মোট ৪৯ জনের পজিটিভ পাওয়া গেছে।

সারা দেশে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে কি এই অনাস্থা দূর করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের জবাবে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগির বলেন, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেই যে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে বা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকজন পাওয়া যাবে এই ধারণা বিজ্ঞানসম্মত নয়।

যতো লোকের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। আক্রান্ত লোকের হিসেবে মৃত্যুর হার ১০ শতাংশেরও বেশি।

মৃত্যুর এই হার আক্রান্ত অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় উদ্বেগজনক।

কিন্তু মি. আলমগির বলেন, "এতো অল্প তথ্য দিয়ে কেস ফ্যাটালিটি বা মৃত্যু হার নির্ধারণ করা যাবে না। এই তথ্য যথেষ্ট নয়, এজন্যে আরো তথ্য প্রয়োজন। এতো অল্প তথ্য দিয়ে পৃথিবীর কোন দেশে মৃত্যু হার নির্ণয় করা হয় না।"

তবে তিনি জানিয়েছেন যে তারা এখন নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছেন।

এখন ঢাকার শিশু হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও খুলনাতেও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

কাদের পরীক্ষা করা হয়

ড. এএসএম আলমগির জানান, করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে বর্তমানে যারা তাদেরকে ফোন করছেন, ইমেইল করছেন এবং ফেসবুকে মেসেজ দিচ্ছেন মূলত তাদেরই নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের নমুনা সংগ্রহ করছেন।

তিনি জানান, যারা হট লাইনে ফোন করেন তাদের সঙ্গে ডাক্তাররা প্রথমে কথা বলেন। তাদের লক্ষণ আর ভ্রমণের ইতিহাস শোনার পর ডাক্তাররা তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে একটি তালিকা তৈরি করেন। সেই তালিকাটি নমুনা সংগ্রহকারী টিমের কাছে পাঠানো হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আইইডিসিআরকে জানানো হলে সেখান থেকে এবং যারা আইসোলেশন ওয়ার্ডে কিম্বা কোয়ারেন্টিনে আছেন তাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখান থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

তিনি বলেন, যাদের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ আছে তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর যাদের শরীরে কোন লক্ষণ নেই, তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার আরো কম হবে বলে তার বিশ্বাস।

"ভাইরাসটি সংক্রমণের কতোগুলো ধাপ আছে। প্রথম ধাপ ইনকিউবেশন পিরিয়ড যখন শরীরের ভেতরে ভাইরাসটি বংশ বিস্তার করে। তাদের সংখ্যা যখন প্রচুর হয়ে যায় তখন উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।"

তিনি বলেন, উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রথম দিন থেকে পরীক্ষা করলে ভাইরাস থাকলে সেটা ল্যাবরেটরিতে নির্ণয় করা যাবে।

"উপসর্গ ছাড়াও যে সারা পৃথিবীতে পরীক্ষা করা হয় না তা নয়, কিন্তু সকল মানুষকে তো আর একসাথে পরীক্ষা করা যাবে না।"

তবে আইইডিসিআরের এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলছেন, এখন আক্রান্তের সংখ্যা কম বলে আগামীতেও যে সেটা একই থাকবে সেটা বলা যাবে না।

তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সেগুলো মেনে চলার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।