করোনাভাইরাস: ঢাকা বিমানবন্দরে যা দেখলেন বিবিসি সংবাদদাতারা

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশটির আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানানো হয়েছে শুরু থেকেই।
মাসখানেক আগে ঢাকায় বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা ফয়সাল তিতুমীরকে বিমানবন্দরের এইসব কর্মসূচী সবিস্তার দেখিয়েছিলেনও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
কিন্তু তারপরও নানা সময়ে বিদেশ থেকে আগত অনেক যাত্রীই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে তাদের বিমানবন্দর অভিজ্ঞতার কথা লিখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন যে, তারা মনে করেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে করোনাভাইরাস ইস্যুতে যথেষ্ট পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হচ্ছে না।
আসলে পরিস্থিতি কী?
বিবিসি বাংলার দুজন সংবাদদাতা সম্প্রতি দুটি ভিন্ন গন্তব্য থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকা এসেছেন। যাত্রী হিসেবে বিমানবন্দরে তারা কী দেখলেন, এই প্রতিবেদনে থাকছে সেই অভিজ্ঞতা:

ছবির উৎস, Getty Images
সায়েদুল ইসলাম
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট, বিবিসি বাংলা
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ২৭শে ফেব্রুয়ারি যখন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামি, তখন তার সাড়ে দশটা। যদিও জার্মানি থেকে আসছি, কিন্তু আমার ট্রানজিট ছিল সিঙ্গাপুরে। একই ফ্লাইটে এসেছেন সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে আসা যাত্রীরা, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি।
ঢাকা বিমানবন্দরে সিঙ্গাপুরের বিমানে নামার পর বোর্ডিং ব্রিজ দেয়া হয়নি। ফলে দূরে নামার পর যাত্রীদের বাসে করে অ্যারাইভাল টার্মিনালে নিয়ে আসা হয়। বিমান কর্মীরা জানালেন, সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিমান বলে সেগুলোকে মূল টার্মিনালের দূরে রাখা হচ্ছে।
ছবির কপিরাইট
Facebook -এ আরো দেখুনবিবিসি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য বিবিসি দায়বদ্ধ নয়।End of Facebook post
বিমানেই একটি হেলথ ডিক্লারেশন ফরম দেয়া হয়েছিল, যেখানে ব্যাখ্যা করতে হয় যে, কোন দেশ থেকে যাত্রীরা আসছেন, গত দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে ভ্রমণ করেছেন কিনা, কারো জ্বর আছে কিনা ইত্যাদি।
আরো পড়ুন:

ইমিগ্রেশনে প্রবেশের আগে করোনাভাইরাসজনিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার একটি ডেস্ক বসানো হয়েছে। সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তার ঠিক আগে আগে রয়েছে একটি থার্মাল স্ক্যানার, যার মাধ্যমে যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হয়। অর্থাৎ কারো জ্বর থাকলে এই স্ক্যানারে সেটা ধরা পড়বে।
সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে দেখেছি, জায়গায় জায়গায় এরকম স্ক্যানার বসিয়ে লোকজন কড়া দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। যাদের সন্দেহ হচ্ছে, হাতের জ্বর মাপার মেশিন দিয়ে আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেখানে এ নিয়ে সতর্কতার ব্যাপারটি পরিষ্কার বোঝা যায়।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
কিন্তু বাংলাদেশের বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার মনিটরের দিকে কেউ তাকাচ্ছেন বলে মনে হলো না। বিমান থেকে নামা কয়েকশো যাত্রী লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ফরম জমা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত সেটার ওপর সিল দিয়ে একটা অংশ ফেরত দিচ্ছেন। কেউ একবার সেসব ফরম পড়েও দেখছেন না।
একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা ফরম জমা নিচ্ছেন, কিন্তু কারো তো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন না, কোন ফরম তো পড়েও দেখছেন না?
তিনি জবাব দিলেন, থার্মাল স্ক্যানার তো আছে।
কিন্তু সেটাও তো কেউ দেখছেন না?
তিনি আর কোন জবাব দিলেন না।

ছবির উৎস, Getty Images
আফরোজা নীলা
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট, বিবিসি বাংলা
দিল্লি থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়ির কাঁটা ৩টা ছুঁইছুঁই করছে। আসার আগে থেকেই ভাবছিলাম বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্যান করা হচ্ছে নিশ্চয়ই বিমানবন্দরে কিছুটা সময় লাগবে। করোনাভাইরাস নিয়ে এতউদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দেশের বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার বসিয়ে স্ক্যানিং কীভাবে করা হচ্ছে, স্বাস্থ্যপরীক্ষা কীভাবে সেটা দেখারও আগ্রহ ছিল কিছুটা।
তবে যখন স্ক্যানিংয়ের জায়গায় পৌঁছলাম কিছুটা অবাকই হলাম। যাত্রীসংখ্যা কম ছিল। গেটের কাছে কাউকে দেখলাম না। কয়জন চীনা নাগরিককে দেখলাম স্বাস্থ্য বিষয়ক ফর্ম পূরণ করছেন। থার্মাল স্ক্যানার পার হবার সময় কোন মনিটরে কেউ সেটা দেখছে কিনা তাও চোখে পড়লো না।
যারা স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন তারা সবাই নিজ নিজ উদ্যোগে ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়ে যাচ্ছেন, কাউকে সেটা খুলে দেখতেও দেখিনি। শুধু এক কর্মকর্তাকে দেখলাম দুজন যাত্রীকে ডেকে জিজ্ঞেস করছেন আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
ইমিগ্রেশনে ভিড় তেমন ছিল না, তাই খুব তাড়াতাড়িই বিমানবন্দরের কাজ শেষ হয় গেল।
তবে, ইমিগ্রেশনের অনেক কর্মকর্তা মাস্ক পরে ছিলেন।

কি বলছে কর্তৃপক্ষ?
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছিল, বিমানবন্দরে আসা সব দেশের উড়োজাহাজের যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে সবকিছু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী করা হচ্ছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিমানবন্দরে যথাযথ নিয়মেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
''আমাদের চিকিৎসক ও নার্সরা পালাক্রমে কাজ করছেন। প্রত্যেক যাত্রীকে থার্মাল স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। কারো যদি তাপমাত্রা পাওয়া যায়, তাহলে তাকে পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। দরকার হলে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।''
তিনি বলছেন, একজন চিকিৎসক সবসময়েই এই মনিটরের দিকে লক্ষ্য রাখেন। সেটা হয়তো বাইরে থেকে বোঝা না যেতে পারে। কিন্তু সবসময়েই সেখানে নজরদারি করা হচ্ছে। এভাবেই ২৬জনের জ্বর শনাক্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

''নভেল করোনাভাইরাসের লক্ষণ পুরোপুরি দেখা যেতে কিছুদিন সময় লাগে। ফলে আক্রান্ত কোন যাত্রী হয়তো বিমানবন্দর থেকে পার হয়ে যেতে পারেন, যার লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি বা জ্বর বা কাশি হয়নি। একারণেই সবার তথ্য ফরমে নিয়ে রেখে দেয়া হচ্ছে এবং সেগুলো আইইডিসিআরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।''
''ফলে পরবর্তীতে কারো সমস্যা হলে যেন তাদের সনাক্ত করা যায়। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, লক্ষণ বুঝলে যেন তারা নিজে থেকেই চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।'' বলছেন মি. সাজ্জাদ।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে, ২১শে জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬জন। রবিবার সকাল আটটা থেকে সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা করা হয়েছে ৫২৭৩জনকে।
এখন পর্যন্ত ২৬জনের জ্বর সনাক্ত করা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। তাদের মধ্যে চারজনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।










