দিল্লির সহিংসতা: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪, কয়েক দশক ধরে এমন দাঙ্গার পেছনে কারণ কী?

২০২০ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের সমর্থক ও বিরোধিতাকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে গাড়ি পোড়ানো হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে সংঘর্ষের সময় যানবাহনে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।

গত কয়েকদিন ধরে, দিল্লি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে। ভারতের রাজধানীতে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৪ জন।

বিতর্কিত নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে রোববার থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়।

নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশকারী অমুসলিমদের নাগরিক হওয়ার অনুমতি দেয়।

হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার বলছে, এর ফলে ভারত ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের অভয়াশ্রমে পরিণত হবে।

সমালোচকরা বলছেন, এই বিলটি মুসলমানদের একঘরে করতে বিজেপি এজেন্ডার একটি অংশ। গত বছর এটি পাস হওয়ার পরে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয় এবং এর মধ্যে কয়েকটি বিক্ষোভ সহিংস আকার নেয়।

তবে দিল্লিতে এখন পর্যন্ত হওয়া সব বিক্ষোভই ছিল শান্তিপূর্ণ।

আরও পড়তে পারেন:

এটি কখন শুরু হয়েছিল?

রাজধানীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্ব দিল্লির তিনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে রোববার এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করছিল তাদের অবরোধের বিরুদ্ধে এক কিলোমিটার ব্যবধানে পাল্টা বিক্ষোভ করে এই আইনের সমর্থকরা।

এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।

এরসঙ্গে বিজেপির এক নেতা কপিল মিশ্র যুক্ত বলে জানা গেছে, যিনি নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী অবস্থান নেয়া বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়েছেন, তাদের বলেছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ছাড়ার পরে তাদের জোর করে উচ্ছেদ করা হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে ২৪ থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ভারতে অবস্থান করেন।

২০২০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারি মৌজপুরের কাছে জাফরাবাদে সিএএবিরোধী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ চলাকালীন পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির রাস্তায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ।

কী হচ্ছে এখন?

বুধবার নতুন করে কোন সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি, তবে শহরটি পরপর তিন রাত দাঙ্গার কবলে পড়ায় আবার যেকোনো সময়ে হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে।

এই সহিংসতা কেবল নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে হচ্ছে না। এটি এখন সাম্প্রদায়িক রূপ নিয়েছে এবং আশেপাশের কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

মানুষজনকে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রমণ করা হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে, একদল লোক হাতে লাঠি-সোটা, লোহার রড এবং পাথর নিয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করছে এবং হিন্দু ও মুসলমানরা মুখোমুখি হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে থাকা বিবিসি সাংবাদিকরা বলছেন, এসব পাড়ার প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা এখন বেশ থমথমে।

বিবিসি হিন্দির ফয়সাল মোহাম্মদ বলেছেন, "রাস্তাগুলোয় পাথর এবং ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ভাঙ্গা ও পোড়া যানবাহনগুলো এবড়োথেবড়োভাবে ছড়িয়ে আছে এবং আগুন জ্বলতে থাকা ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার কুণ্ডলি বাতাসকে ভারি করে তুলেছে।"

২০২০ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সমর্থক ও বিরোধিদের মধ্যে সংঘর্ষের পরে একটি পোড়ানো মসজিদের মিনারে (হিন্দু ধর্মাবলম্বী) হিন্দু ধর্মীয় পতাকা দেখা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে সংঘর্ষে কমপক্ষে দুটি মসজিদ ভাঙচুর হয়েছে

'একটি ছেঁড়া কোরান'

সহিংস দাঙ্গাকারীরা মুসলমানদের বাড়িঘর ও দোকানপাট লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

বিবিসি হিন্দির ফয়সাল মোহাম্মদ বলেছেন যে, তিনি আংশিকভাবে পোড়া মসজিদ দেখতে পেয়েছেন, সেখানে কোরানের পৃষ্ঠাগুলো মাটিতে এদিকে সেদিকে পড়ে ছিল।

মঙ্গলবার বিকেলে আরেকটি মসজিদ ভাঙচুর হয়। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিও ফুটেজে মসজিদের মিনারের শীর্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে চাঁদ তারা সম্বলিত ক্রিসেন্ট চিহ্নটি টেনে তুলে ফেলতে দেখা যায়।

এখন পর্যন্ত নিহতদের যতো নাম প্রকাশ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে হিন্দু মুসলমান উভয়ই রয়েছে। ওইসব হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক মানুষ।

হাসপাতাল ঘুরে এসে বিবিসি সাংবাদিকরা বলছেন যে, তারা গুলিবিদ্ধ ক্ষতসহ বিভিন্ন ধরণের আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভিড় করতে দেখেছেন।

সংবাদদাতারা বলেছেন যে, হাসপাতালটিতে একধরণের ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এবং আহতদের মধ্যে অনেকে "বাড়ি ফিরে যেতে খুব ভয় পাচ্ছেন।"

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দাঙ্গায় অংশ নেয়া বেশ কয়েকজনকে হাতে বন্দুক বহন করতে দেখা যায়। এবং ছাদ থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে খবর পাওয়া গেছে।

হাসপাতালের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে আহতদের অনেকের শরীরেই গুলির ক্ষত রয়েছে।

২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সমর্থক ও বিরোধিদের মধ্যে সংঘর্ষের পরে নিরাপত্তা কর্মীরা আগুনে পুড়ে যাওয়া এবং আবাসিক এলাকায় টহল দিচ্ছিন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এই সংঘর্ষে প্রতিবাদকারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা হতে দেখা যায়।

কর্তৃপক্ষ কী করছে?

মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের মুখপাত্র এমএস রন্ধাওয়া সাংবাদিকদের বলেছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং "পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ" মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি তাদের ছিল না। এবং তারা সংখ্যায় ছিলেন অনেক কম।

সহিংসতায় রতন লাল নামে এক কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি পুলিশ।

দিল্লির পুলিশ বাহিনী, রাজ্য প্রশাসনের পরিবর্তে মি. মোদীর ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে সরাসরি সব তথ্য জানায়।

রাজধানীতে সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করতে আজ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সাথে দিল্লির যে সীমান্তের ভাগ রয়েছে - এই অঞ্চলগুলো তার কাছাকাছি এবং এই সীমান্ত এখন আটকে দেওয়া হয়েছে।

এলাকার স্কুলগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি এবং বেশ কয়েকটি এলাকায় জনসমাগমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

জনগণকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার তিন দিন পর বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শান্তির আবেদন জানিয়ে করা টুইটে বলেন, "খুব শীঘ্রই শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা জরুরি।"

২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সমর্থক ও বিরোধিদের মধ্যে সংঘর্ষের পরে নিরাপত্তা কর্মীরা আগুনে পুড়ে যাওয়া এবং আবাসিক এলাকায় টহল দিচ্ছিন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এই সংঘর্ষে প্রতিবাদকারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা হতে দেখা যায়।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান দেখা যায়।

এমনকি ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পুনর্নির্বাচিত হলে এই জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বর্তমানে অশান্ত এই সময়টি তার জন্য এক প্রকার বিব্রতকর পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সফরে ভারতে গেছেন। এবং গত দুই দিন সেখানেই অবস্থান করেছেন।

সহিংসতা বাড়ার কারণে এবারে মি. ট্রাম্পের সফরের খবর অনেকটাই ধামাচাপা পড়ে গেছে। তবে এটি জাতীয় এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠে এসেছে।