করোনাভাইরাস: তালিকাভুক্ত চীনা নাগরিকদের নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশের শিশুরাও মাস্ক পরছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশের শিশুরাও মাস্ক পরছে।

বাংলাদেশ থেকে চীনের উহান শহরের দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার হলেও সেখানকার করোনাভাইরাস আতঙ্ক এখানকার অনেক মানুষের ওপরও ভর করেছে। তার একটা প্রভাব দেখা যায় ঢাকার ফার্মেসিগুলোয়।

গত কয়েকদিনে যেকোনোবারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হয়েছে। যেগুলো কিনা করোনাভাইরাস প্রতিরোধের প্রধান দুটি অনুষঙ্গ।

গুলশান এলাকার একটি ফার্মেসির বিক্রয়কর্মী নিক্সন মণ্ডলের বলেন, হঠাৎ এই পণ্যগুলোর চাহিদা এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহ করতে পারছেনা।

"সেদিন আমরা কতোগুলো হ্যান্ড স্যানিটাইজার অর্ডার করলাম, মাস্ক অর্ডার করলাম। কোম্পানি থেকেই বলতেসে স্টক আউট। মানুষ হঠাৎ এতো বেশি কিনতেসে আমরাও পাচ্ছি না। বেশি কিনতেসে স্কুলের যে বাচ্চারা তাদের গার্ডিয়ানরা।"

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি চীন থেকে হওয়ায় এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীনে সফরের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরোপ করেছে।

এর জেরে চীনে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত রেখেছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং এয়ার ক্যানাডা।

এছাড়া বহু এয়ারলাইন্স, চীনে তাদের নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করেছে।

চীনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোন সতর্কতা দেয়া হয়নি, তবে ভ্রমণ সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে গত ১৪ দিনে চীন থেকে আসা সব চীনা নাগরিকদের তালিকা তৈরি করতে।

জেলা প্রশাসক, পুলিশ এবং সিভিল সার্জনদের বলা হয়েছে তারা যেন নিজ নিজ জেলায় এই তালিকা তৈরির কাজ করেন।

আরও পড়তে পারেন:

করোনাভাইরাস, মাস্ক পরে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে হওয়ায় ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা ভাইরাস যে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সে সময় বাংলাদেশে কাজ করতে আসা অনেক চীনা নাগরিক তাদের দেশে চন্দ্র নববর্ষ উদযাপনে যান। এখন তাদের অনেকেই আবার বাংলাদেশে ফিরে আসছেন।

এই ফিরে আসা চীনা নাগরিকদের স্বাস্থ্য নজরদারিতে রাখার উদ্দেশ্যেই এই তালিকা প্রস্তুত জরুরি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমরা এই তালিকাটা তৈরি করেছি অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য। বাংলাদেশে যেসব চীনা নাগরিক ফেরত আসছেন তারা ঠিক কতো তারিখে ফিরেছেন, আমরা আমরা জানতে চাই। তাহলে ওই তারিখ থেকে সামনের ১৪ দিন তাকে পর্যবেক্ষণে করবো। কারণ কেউ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এর লক্ষণগুলো ১৪ দিনের মধ্যে দেখা দিতে শুরু করে।"

এই তালিকা প্রস্তুত করতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি- এফবিসিসিআইকে চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

এছাড়া দেশের সব জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন এবং পুলিশদের জানানো হয়েছে যেন তারা সংশ্লিষ্ট এলাকার তথ্য তৎক্ষণাৎ সরবরাহ করতে পারে।

করোভাইরাস সংক্রান্ত সচেতনতামূলক পোস্টার।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রিটেনের বিমানবন্দরে করোভাইরাস সংক্রান্ত সচেতনতামূলক পোস্টার।

চীনে থাকা অবস্থায় তাদের কোন নাগরিক যদি অসুস্থ হয় তাহলে তাকে দেশের বাইরে যেতে দেয়া হবে না বলে চীনা সরকার আগে থেকেই নিশ্চিত করেছেন।

তারপরও এই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে যেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যায়।

করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের উদ্বেগের প্রধান কারণ এটি ভীষণ ছোঁয়াচে। এতোটাই ছোঁয়াচে যে কারও স্পর্শ থেকে, হাঁচি কাশি থেকে এমনকি দুই হাত দূরত্বে পাশাপাশি বসলেও বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

সেক্ষেত্রে এই তালিকা এই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বা সতর্কতা আরোপে কতোখানি কাজ করবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইডিসিআর এর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী এই নজরদারি করা হচ্ছে।

"এই তালিকা করার উদ্দেশ্য হল তাদেরকে যেন নজরদারিতে রাখা। যদি কারও মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষণগুলো দেখা যায়, আমরা তাকে সাথে সাথেই আলাদা করে ফেলব। পরীক্ষা করার আগেই। যদি পরীক্ষায় করোনাভাইরাস ধরা পড়ে, তাহলে সেটা যেন অন্যদের মধ্যে না ছড়ায়।"

তাছাড়া তারা এই ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন চীনে ভ্রমণ না করেন।

এবং চীন থেকে যদি কারও বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা থাকে। তারা যেন সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে দেন।

বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হচ্ছে।

স্বস্তির বিষয় হল, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, এমন খবর পাওয়া যায়নি।

গতকাল পর্যন্ত বিমানবন্দরে চীন থেকে আসা সাড়ে তিন হাজার যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হয়। এর মধ্যে কোন সন্দেহজনক রোগী মেলেনি।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ববাসীকে সতর্ক করা হলেও বাংলাদেশের যে একদম ঝুঁকি নেই সেটি বলা যাচ্ছে না।

এক্ষেত্রে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।