জিন্দেগি তামাশা: ধর্মীয় কোন্দলের মুখে আটকে গেছে পাকিস্তানের যে সিনেমা

পাকিস্তানে কর্তৃপক্ষ একটি পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের মুক্তি স্থগিত করে দিয়েছে। একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল সিনেমাটিতে একজন সংগ্রামী ধর্মীয় নেতার চরিত্র নিয়ে আপত্তি জানালে ছবিটির মুক্তি আটকে যায়।

ওই রাজনৈতিক দলটি বলেছে যে এই ছবিটি "সাধারণ মানুষকে ইসলাম ও নবী থেকে বিচ্যুত করার দিকে পরিচালিত করতে পারে।"

এরপর ছবিটি মুক্তি দেয়া হলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন।

জিন্দেগি তামাশা (সার্কাস অফ লাইফ), বাংলায় যার অর্থ 'জীবন মানে ঠাট্টা', এই চলচ্চিত্রটি গড়ে উঠেছে একটি ধর্মীয় চরিত্রকে ঘিরে।

একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ওই ব্যক্তির নাচের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে তাকে সবাই এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

চলচ্চিত্রটির পরিচালক বলেছেন যে, তার কখনোই কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্য ছিল না।

পাকিস্তানের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা সারমাদ খুসাত এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন।

চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন যে, এই ছবিটির জন্য তিনি, তাঁর পরিবার এবং চলচ্চিত্রের দলকে হুমকি ও টিটকারির শিকার হতে হয়েছে।

"ধর্মের নামে ঘৃণা, ভয় এবং ক্ষোভ ছড়াবেন না," বলেন মি. খুসাত।

চলচ্চিত্রটি নিয়ে এই বিতর্ক পাকিস্তানি সমাজে বিদ্যমান গভীর বিভেদকে আবারও সামনে এনেছে।

যেহেতু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলি আরও সোচ্চার হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-লাবাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) একজন মুখপাত্র স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন যে, চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু "ধর্মীয়-বিদ্বেষমূলক"।

ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ পাকিস্তানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় এবং এই অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে তারাই কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

দেশটির এমন বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা বিশ্বের গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে।

'একটি গুরুতর পরীক্ষা'

গত বছর মর্যাদাপূর্ণ বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিন্দেগি তামাশা চলচ্চিত্রটি প্রথমবারের মতো দেখানো হয়, সেখানে এই ছবিটি ফিকশন ক্যাটাগরিতে শীর্ষ পুরস্কারটি অর্জন করে।

চলচ্চিত্রটি ২৪শে জানুয়ারি পাকিস্তানের পর্দায় মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল।

তার আগে এই ছবিটির একটি ট্রেইলার প্রকাশিত হয়, যেখানে একজন দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে দেখানো হয় যিনি নাত (নবী মোহাম্মদকে প্রশংসা করে কবিতা) গায়ক।

তবে দেশের প্রধান সেন্সর বোর্ড, পাশাপাশি প্রাদেশিক বোর্ডগুলি এই চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র দেওয়া সত্ত্বেও, চলচ্চিত্রটি এখন আটকে আছে।

গত সপ্তাহে মি. খুসাত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি বলেন যে, তাকে প্রতিনিয়ত অসংখ্য অভিযোগ ও হুমকি দেয়া হচ্ছে।

এ কারণে তিনি ছবিটি মুক্তি না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

এরপরে টিএলপি ছবিটির পরিকল্পিত মুক্তির প্রতিবাদে সারাদেশে গণ-সমাবেশের ডাক দেয়।

"এই ছবিতে নাত গায়কের বৈশিষ্ট্য এমন যে এটি জনসাধারণের মধ্যে অস্বস্তির সৃষ্টি করতে পারে এবং মানুষকে ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ থেকে বিচ্যুত হতে পারে," রাজনৈতিক দলটি তাদের বিবৃতিতে এমনটি দাবি করে।

"সুতরাং এই সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া উচিত নয় কারণ এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য একটি গুরুতর পরীক্ষা হতে পারে।"

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ফিরদৌস আশিক আওয়ান টুইটারে বলেছেন যে, সেন্সর বোর্ড যতদিন পর্যন্ত না ইসলামিক আইডোলজিক্যাল কাউন্সিলের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করছে ততদিন পর্যন্ত প্রযোজককে চলচ্চিত্রটির মুক্তি না দিতে বলা হয়েছে।

ইসলামিক আইডোলজিক্যাল কাউন্সিল হল একটি প্রভাবশালী পরামর্শক সংস্থা তবে তাদের কোন নির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা নেই।

এই ঘোষণার পর টিএলপি দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক বাতিল করে।

কারা বিরোধিতা করছে?

টিএলপি হল তেহরিক-ই-লাবাইক ইয়া রাসূলাল্লাহ (টিএলওয়াইআরএ) আন্দোলনের রাজনৈতিক বাহিনী যারা এর আগেও ব্লাসফেমি ইস্যুতে প্রতিবাদ করতে বিপুল জনসমাগম করেছিল।

২০১১ সালে পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখায় মমতাজ কাদরি নামে এক পুলিশ সদস্য তাকে হত্যা করে।

ওই ঘটনায় ঘাতক মমতাজ কাদরিকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হলে এই টিএলপি সেই আদেশের তীব্র বিরোধিতা করে। সেই থেকে সবার নজরে আসে খাদিম হুসেন রিজভীর নেতৃত্বাধীন এই ইসলামপন্থী দলটি।

পাকিস্তানি আইন অনুযায়ী কেউ নবী মুহাম্মদকে অপমান করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়।

আরও পড়তে পারেন:

টিএলপি ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য কয়েক সপ্তাহ রাজধানী প্রাণকেন্দ্র অবরোধ করে তাদের শক্তি প্রদর্শন করে।

এছাড়া গত বছর খাদিম হুসেন রিজভীসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হলে তাদের প্রভাব কিছুটা কমে আসে।

আসিয়া বিবি নামে খ্রিস্টান নারীকে ব্লাসফেমি আইনে কারাদণ্ড দেয়ায় দেশ জুড়ে তার মুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন হয়।

ওই আন্দোলনের সময় সহিংস প্রতিবাদ করায় টিএলপির ওই নেতাদের গ্রেফতার করা হয়।