আমাজনের সিইও জেফ বেজোস যখন ভারতের ছোট দোকানদারদের মুখোমুখি

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
গ্লোবাল কর্পোরেট জায়ান্ট অ্যামাজনের সিইও ও ধনকুবের জেফ বেজোস এই মুহুর্তে রয়েছেন ভারত সফরে - কিন্তু দেশ জুড়ে বিভিন্ন শহরে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন।
অ্যামাজনকে ভারত থেকে পাততাড়ি গোটাতে হবে বলে এই খুচরো ব্যবসায়ীদের দাবি, যাদের শাসক দল বিজেপির বড় সমর্থক-গোষ্ঠী বলে ধরা হয়।
ওদিকে মি. বেজোস কিন্তু ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে অ্যামাজন অন্তত ১০০০ কোটি ডলার মূল্যের ভারতে তৈরি পণ্য রফতানি করবে - যে 'মেক অব ইন্ডিয়া' নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক বিরাট কর্মসূচী।
ফলে একদিকে দেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা আর পাশাপাশি বিদেশি লগ্নি আকৃষ্ট করার চেষ্টা ভারতকে এক ধরনের উভয় সঙ্কটে ফেলেছে, যা অ্যামাজন-বিতর্ককে কেন্দ্র করে সামনে চলে এসেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের ব্যবসাগুলোর এক সম্মেলন, 'সম্ভব সামিটে' যোগ দিতে তিনদিন আগেই ভারতে পা রাখেন অ্যামাজনের সিইও জেফ বেজোস।
কিন্তু তখন থেকেই দেশের সাড়ে তিনশোরও বেশি শহরে তার বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে দিয়েছেন ভারতের অসংখ্য দোকানদার ও ব্যবসায়ী, স্লোগান উঠছে 'গো ব্যাক অ্যামাজন', 'গো ব্যাক বেজোস'।
ভারতে কনফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া ট্রেডার্সের মহাসচিব প্রভীন খান্ডেলওয়াল বলছিলেন, "প্রতিযোগীদের বাজার থেকে বের করে দিতে অ্যামাজন যেভাবে জিনিসের দাম কম রাখছে বা ডিসকাউন্ট দিচ্ছে তাতে আমরা দেশব্যাপী এই প্রতিবাদে নামতে বাধ্য হয়েছি।"
"বিদেশি লগ্নির সব শর্ত তারা আদৌ মানছে না, ফলে আমরা সরকারকে বলব তাদের পোর্টাল অবিলম্বে ব্লক করে দিতে এবং তাদের ব্যবসায়িক মডেল তদন্ত করে দেখতে।"

ছবির উৎস, Getty Images
আর এক ব্যবসায়ী নেত্রী রিমা মালহোত্রা বিবিসিকে বলছিলেন, "দেশব্যাপী এই বিক্ষোভের মাধ্যমে আমরা জেফ বেজোসকে একটা কথাই বলতে চাই, ব্যবসার নিয়ম না-মানলে তোমাকে আমরা ভারতে টিঁকতে দেব না!"
ভুবনেশ্বরের ব্যবসায়ী প্রণব মহাপাত্র তো এক ধাপ এগিয়ে অ্যামাজনকে তুলনা করছেন ব্রিটিশদের 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি'র সঙ্গেও।
তার কথায়, "ই-কমার্সের নামে এরা এসেছেই স্থানীয় ব্যবসাকে ধ্বংস করে দিতে"।
ভারতে শাসক দল বিজেপির সমর্থনের বড় ভিত্তি এই ব্যবসায়ীরা, তাদের স্বার্থ বজায় রাখতে সরকার নানা পদক্ষেপও নিয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু মুশকিল হল, অ্যামাজন-ওয়ালমার্টের মতো সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আবার বড় বিদেশি বিনিয়োগও দরকার।
ভারতের নামী পলিসি কনসালট্যান্ট প্রশান্ত কুমার রায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এই ব্যাপারটা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী। একদিকে সরকার দীর্ঘদিন ধরে চাইছে বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসুক - আর ওয়ালমার্ট, অ্যামাজনের মতো বড় কোম্পানিগুলি শত শত কোটি ডলারের লগ্নি আনছেও।"
"কিন্তু অন্য দিকে এই বিনিয়োগ আসার জন্য প্রধান যে সহায়তা দরকার, সেটা হল বলিষ্ঠ একটা পলিসি ও পলিসি-র স্টেবিলিটি (নীতি ও নীতির স্থিতিশীলতা)।"
"অথচ আমরা দেখছি এদেশে ই-কমার্স পলিসি খুব ঘন ঘন আর আচমকাই বদলে যাচ্ছে, বেশ কয়েকবার এ জিনিস ঘটেছে। হয়তো ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বা নানা রাজনৈতিক কারণেই সেগুলো করা হচ্ছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
"কিন্তু সেটা বড় বিনিয়োগকারীদের খুব বিপজ্জনক ও হতাশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে", বলছিলেন প্রশান্ত কুমার রায়।
এদিকে জেফ বেজোস নিজে ইতিমধ্যেই ভারতে এসে ঘোষণা করেছেন, আগামী পাঁচ বছরে এদেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে ডিজিটাল চেহারা দিতে অ্যামাজন ১০০ কোটি ডলার লগ্নি করবে।
তিনি আরও বলেছেন, "একুশ শতক হবে ভারতের শতক"।
ভারতের অর্থনীতির বেহাল দশায় অ্যামাজন সিইও-র এই ঘোষণা মোদী সরকারকে খুশি করেছে অবশ্যই, কিন্তু পাশাপাশি কীভাবে তারা দেশের খুচরো ব্যবসায়ীদের শান্ত রাখবে সেটাও বিরাট এক চ্যালেঞ্জ।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রশান্ত কুমার রায় কিন্তু মনে করেন, ভারতে অ্যামাজন ও ছোট ব্যবসাদারদের পাশাপাশিই টেঁকা সম্ভব - আর তাতে উভয়েরই লাভ।
মি রায় বলছিলেন, "দেখুন, ই-কমার্স কিন্তু ভারতে মোট ব্যবসার মাত্র ২ শতাংশ বা তার কাছাকাছি। ফলে ই-কমার্সের জন্য দেশে আর সব ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিষয়টা কিন্তু মোটেও সেরকম নয়।"
"আর ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ব্যবসাটা যারা করছে, তারাও তো বেশির ভাগই সব ছোট ব্যবসায়ী। হ্যাঁ, বড়ও কিছু আছে - কিন্তু সেখানে ৯৯ শতাংশেরও বেশি বিক্রেতা কিন্তু ছোট ট্রেডার্স।"
"পাশাপাশি ব্রিক অ্যান্ট মর্টার, অর্থাৎ ইঁট-কাঠের দোকানও তো আর উঠে যায়নি - তারাও ব্যবসা করছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
"ফলে এই দুটো নিয়েই - একদিকে প্রোটেকশনিজম আর অন্য দিকে ইনভেস্টমেন্টের মধ্যে একটা 'মিডল গ্রাউন্ড' বা মাঝামাঝি রাস্তা অবশ্যই বের করা সম্ভব।"
"এটাও মনে রাখতে হবে, এই ছোট ব্যবসায়ী বা ধরা যাক হস্তশিল্পীরা তো আগে নিজেদের পণ্য বাইরে বেচতেই পারত না। এই ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো তাদেরও জিনিস দেশে-বিদেশে বেচার সুযোগ করে দিচ্ছে", বলছিলেন তিনি।
কিন্তু বিজেপি সরকার তাদের সমর্থক ব্যবসায়ী সমিতিগুলোকে এখনও এই যুক্তি বুঝিয়ে উঠতে পারেনি।
আর সেটা যতক্ষণ না হচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভারতে অ্যামাজনের বিপুল লগ্নির বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।








