আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না কেন
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
অযত্ন, অবহেলা অবৈধ দখলের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমিগুলো নিশ্চিহ্ন হতে চলছে। সারা বাংলাদেশে এ পর্যন্ত হাজারখানেক বধ্যভূমি শনাক্ত করা হলেও সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫টি।
অথচ ১০ বছর আগে উচ্চ আদালতে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের পক্ষে রায় দেয়া হয়েছিল।
এরপর কয়েক দফা বড় বড় বাজেটের প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও দৃশ্যত কোন পরিবর্তন হয়নি।
শুরু থেকে অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলাসহ আরও নানা অনিয়মের।
দেখে বোঝার উপায় নেই এটি বদ্ধভূমি
ঢাকায় যে বদ্ধভূমিগুলো রয়েছে তারমধ্যে ২৩টি রয়েছে মিরপুর এলাকায়। যার মধ্যে অন্যতম মিরপুর বাঙলা কলেজের বদ্ধভূমিটি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণায় এই বদ্ধভূমির কথা বারবার উঠে এলেও কলেজের ভেতরে এ সংক্রান্ত একটি ফলক ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি।
কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে কলেজের পেছনের জলাশয়টি ঘুরিয়ে দেখান, যেখানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনারা মানুষদের হত্যা করে ফেলে রাখতো।
অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারীটি এই বদ্ধভূমির চারপাশে এখন ময়লার স্তূপ, জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে কলেজের কর্মচারীদের থাকার ঘর এবং শৌচাগার।
জলাশয়টির কিছু দূরেই রয়েছে একটি পুরানো গাছ, সেখানে মানুষদের বেঁধে পিছিয়ে শিরচ্ছেদ করা হতো বলেও জানা গেছে।
কলেজটির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মাসুদ বলছিলেন, তারা ২০০৭ সাল থেকে এই বদ্ধভূমি সংরক্ষণের দাবিতে তারা আন্দোলন করে আসলেও আজ পর্যন্ত তারা আশ্বাস ছাড়া কিছু পাননি।
"আমাদের এখানে নতুন যে শিক্ষার্থীরা আসে, তারা এই বদ্ধভূমি নিয়ে কিছুই জানেনা। অথচ আমাদের বাংলা কলেজ মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার সাক্ষী। আমরা বার বার বলে আসছি, কিন্তু কলেজ প্রশাসন হোক, সরকার হোক কাউকেই আমরা কাজ করতে দেখছি না।" বলেন, মি. মাসুদ।
আরও পড়তে পারেন:
কয়টি বদ্ধভূমি রয়েছে
মিরপুরের কালাপানি বধ্যভূমি এলাকার চিত্রও প্রায় একই। সেখানে গড়ে উঠেছে মসজিদ এবং দোকানপাট।
এছাড়া রাইনখোলা, শিরনিরটেক, সারেংবাড়িসহ অন্যান্য বদ্ধভূমিগুলো পড়ে আছে কোন স্মৃতিচিহ্ন ছাড়া অযত্ন অবহেলায়।
সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত দেশে মোট ২০৯টি বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার কথা বলা হলেও বেসরকারি সংস্থা ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং-এর মতে সারা দেশে পাঁচ হাজার বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে শনাক্ত করা গেছে ৯৪২টি।
অথচ সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫টি।
বদ্ধভূমি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না কেন?
সরকারের সদিচ্ছার অভাবে বধ্যভূমি সংরক্ষণের এই পরিধি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান গবেষক মুনতাসির মামুন।
"মন্ত্রণালয়ে যারা থাকে, তারা বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়, কিন্তু আমাদের সমস্যা হল এই প্রকল্পে যারা থাকেন তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে বিদেশ ভ্রমণ। এরপর দেশে ফিরে তারা সবকিছু ভুলে যান," তিনি বলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন তাদের এসব প্রকল্পের সাথে যুক্ত না করা এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মি. মামুন বলেন, "এই প্রকল্প নিয়ে বর্তমানে যে কমিটি কাজ করে, তারা যদি কোন সুপারিশ দেয়, সেগুলো নিয়ে কোন কাজ হয়না। আমলারা সেগুলো ফেলে রাখেন। সব কাজ তো আমলাদের দিয়ে হবেনা। এখানে অভিজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে, যারা এই বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন।"
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ- এই তিনটি মন্ত্রণালয় মিলে একটি যৌথ শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মুনতাসির মামুন।
সরকার কী বলছে?
২০০৯ সালে এই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের পক্ষে উচ্চ আদালত রায় দেয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকদফা বাজেট বরাদ্দ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
বারবার অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক দুর্নীতি, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা এবং ঠিকাদারদের অনিয়মের।
সবশেষ গতবছর ২৭১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণে ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক।
এরপরও বদ্ধভূমি সংরক্ষণ যে অবহেলিত থেকে গেছে তা স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফুর রহমান।
তবে এই কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বদ্ধভূমির জমিগুলো অধিগ্রহণ করা। কেননা বেশিরভাগ জমিই ব্যক্তি মালিকানাধীন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বদ্ধভূমিগুলো সংরক্ষণে এবং সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেহেতু এটি একটি প্রকল্পের আওতায় চলমান আছে তাই এখানে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই।"
"তবে স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন আবার সেই জায়গাগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। জমি পাওয়াটাই এখন অনেক বড় কাজ। সেটা পেলেই বাকি কাজ আপনা আপনি এগিয়ে যাবে," বলেন মি. রহমান।
বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই বদ্ধভূমিগুলো রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে দ্রুত দখলমুক্ত করা না গেলে নতুন প্রজন্ম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।