বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী শেষ মুহুর্তে কেন ভারত সফর বাতিল করলেন

- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের দু'জন মন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত ভারত সফর বাতিল করার পর তা নিয়ে নানা আলোচনার মুখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এখন বিজয় দিবসের আগে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ততার কারণে মন্ত্রীরা এই সফর বাতিল করেছেন।
তবে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ভারতের এনআরসি এবং পরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পার্লামেন্টে উত্থাপনের সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ অস্বস্তিতে পড়েছে এবং এই সফর বাতিলের মাধ্যমে তার একটা প্রকাশ দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বৃহস্পতিবার শেষমুহুর্তে তাদের ভারত সফর বাতিল করেন।
ভারতের এনআরসি বা নাগরিক তালিকা নিয়ে যখন বাংলাদেশে নানা আলোচনা চলছিল, তার মাঝেই ভারত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করেছে।
সেই বিল তাদের পার্লামেন্টে উত্থাপনের সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে এখনও সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে। এমন বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে প্রতিক্রিয়া হয়।
এই প্রেক্ষাপটে দু'জন মন্ত্রীর ভারত সফর বাতিলের ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী -- যারা ভারত সফর বাতিল করেছেন, তারা দু'জন নিজেরা এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেননি।
তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছেন, দুই মন্ত্রীর ভারত সফর বাতিলের মধ্যে অন্য কোন বিষয় নেই।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম বলছিলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব বিদেশে থাকার কারণে মন্ত্রী ভারত সফরে যাননি।
"এনআরসি কিংবা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ইত্যাদি যে সমস্ত অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তার সাথে আমাদের দুই মন্ত্রীর ভারত সফের কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং নেই। যেহেতু কয়েকদিন পর আগামী মাসেই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবার দিল্লী সফরে যাবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের জন্য। সেকারণে এখন উনি যাচ্ছেন না।"
"আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসামে যাওয়ার কথা ছিল। আসামে যেহেতু এখন অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব ভাল নয়। এটা চিন্তা করে ভারত সরকারের সাথে কথাবার্তা বলেই আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন যাচ্ছেন না। সেখানকার অবস্থা একটু উন্নতি হলে তখন উনি যাবেন।"
সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য তুলে ধরা হলেও বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই সফর বাতিলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটা অস্বস্তি কাজ করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ অস্বস্তিতে পড়েছে মূলত ভারতের এনআরসি বা নাগরিক তালিকার পর তাদের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এবং অমিত শাহ'র বক্তব্য নিয়ে।
এর আগে পেঁয়াজ নিয়ে ভারতের অবস্থাকে ঘিরেও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। হঠাৎ করে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, এনআরসি বা নাগরিক তালিকা নিয়ে ভারত আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে, বাংলাদেশের উদ্বেগের কিছু নেই।
কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় আড়াইশ জনের মতো আটক হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সীমান্তে বাংলাদেশকে নজরদারি বাড়াতে হয়।
এরমধ্যে নাগরিক সংশোধনী বিল এনে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন অব্যাহত থাকার যে অভিযোগ তোলেন।
সরকারি সূত্রগুলো বিবিসিকে বলেছে, এই পটভূমিতে বাংলাদেশের অস্বস্তির বিষয়কে ভারত গুরুত্ব দিচ্ছে না - এমন একটা ধারণাও বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে। এরই প্রকাশ হিসেবে দু'জন মন্ত্রীর সফর বাতিলের বিষয় এসেছে।

ছবির উৎস, MAJORITY WORLD
তবে অস্বস্তির বিষয় বা প্রশ্ন যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ সরকার কিন্তু সেটা প্রকাশ করছে না।
কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কে অন্য কোনো বিষয়ের প্রভাব পড়বে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং রাজনৈতিক যে প্রেক্ষাপট, তাতে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কে কোনে টানাপোড়েন সৃষ্টি হোক, সেটা চাইবে না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, ভারতও এই অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভাল রাখতে পারেনি। ফলে ভারতেরও বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
ফলে, অস্বস্তি থাকলেও দুই দেশই স্ব স্ব তাগিদ থেকেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে বলে তারা মনে করেন।








