নারীদের ভ্রমণে পুলিশের সতর্কতা পোস্টার: গণপরিবহনকে নিরাপদ করতে কী হচ্ছে?

    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

গণ-পরিবহনে একাকী ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা পরামর্শ দিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে পুলিশ বাহিনীর একটি পোস্ট নিয়ে আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

৬ই ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের সচেতন নাগরিক নামের একটি পেইজ থেকে ঐ পোস্ট দেয়া হয়।

সেখানে গণ-পরিবহনে চলাচলকারী নারীদেরকে সম্ভাব্য যে কোন হয়রানি হতে নিরাপদ থাকতে কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ওই পোস্টটিতে মোট ৯টি সতর্কতামূলক ব্যবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। যার মধ্যে শেষের তিনটি পদক্ষেপে প্রয়োজনে ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চাইতে বলা হয়েছে।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

•কোন গাড়িতে যাত্রী সংখ্যা খুব কম হলে সেই গাড়িতে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্ক থাকুন অথবা অধিক যাত্রী সম্বলিত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করুন;

•একা ভ্রমণের সময় গাড়িতে ঘুম পরিহার করুন

•বিভিন্ন স্টপেজে যাত্রী নেমে গিয়ে গাড়িতে যাত্রী সংখ্যা খুব কমে এলে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সতর্ক থাকুন।

•আপনার পরিবারের কাউকে অথবা নির্ভরযোগ্য কাউকে মোবাইল ফোনে কল করে একটু উচ্চ শব্দে (গাড়ির ভিতরে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের শুনিয়ে শুনিয়ে) আপনার গাড়ির নাম, বর্তমান অবস্থান এবং গন্তব্য স্থল সম্পর্কে জানিয়ে রাখুন। এমন কি, সে মুহূর্তে গাড়িতে কতজন যাত্রী অবস্থান করছেন তার সংখ্যা এবং গাড়ির স্টাফসহ যাত্রীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণও জানিয়ে রাখতে পারেন।

•আপনার গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বেই গাড়ির যাত্রীরা নেমে গেলে তাদের সাথে সেই স্টপেজেই নেমে পড়ুন এবং আপনার পরিবারের কাউকে মোবাইলে কল করে সেখানে এসে আপনাকে নিয়ে যেতে বলুন;

•এ সময় আপনাকে নিতে আসা ব্যক্তিটি ঐ স্থানে এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত, প্রয়োজন মনে করলে, আপনার সাথে থাকার জন্য যাত্রীদের মধ্য হতে আপনার দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য কাউকে অনুরোধ করতে পারেন;

তবে এসব পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এবং নারী অধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, এসব পরামর্শ দিয়ে মূলত দায় এড়াতে চাইছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নেবে না?

বীথি সপ্তর্ষি একজন নারী সংবাদকর্মী। কর্মস্থল সেগুনবাগিচা আর বাসা বনশ্রীতে হওয়ায় নিয়মিতই বাসে করে যাতায়াত করেন তিনি।

তিনি বলেন, শেষের তিনটা পয়েন্ট যেখানে ৯৯৯ এ কল করতে বলা হয়েছে সেগুলো ছাড়া, গণ-পরিবহনের একজন যাত্রী এবং নারী হিসেবে আমি অপমানবোধ করেছি।

আমি সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন রাত ১১টা বা তার পরে বাসায় ফিরি। তখন শুধু পুরুষরাই বাসে থাকে। আর তারা ৪-৫ জনের বেশি থাকে না। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব কি নেবে না?

তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে যদি নেমে যাই তাহলে সে জায়গা কি তার জন্য নিরাপদ হবে? এর দায়ভার কে নেবে।

"কারো যদি বাসা থেকে নিতে আসার মতো কেউ না থাকে তাহলে তার নিরাপত্তা কে দেবে?" বলেন মিস বীথি।

তিনি বলেন, "বলা হচ্ছে যে, যাত্রীদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য কাউকে সাহায্য করার অনুরোধ করতে। কিন্তু আমাকে একটু বলে দেবেন কি যে, নির্ভরযোগ্য যাত্রী কেমন হয়? তারমধ্যে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকে? অপরাধ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি কি আমাকে বলবে যে আমি নির্ভরযোগ্য না, আপনি অন্য কাউকে বলেন?"

আরো পড়তে পারেন:

'নারীকে দোষারোপের সুযোগ পাবে'

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব এড়াতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন নারী অধিকারকর্মী সাজেদা হক।

"অবশ্যই তারা তাদের দায়িত্ব এড়াতে চাইছে," বলেন তিনি।

সাজেদা হক বলেন, "আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও। এখানে শুধু আমি সতর্ক হয়ে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো না।"

"আপনি ড্রাইভারকে সচেতন করবেন না, আপনি হেলপারকে সচেতন করবেন না, আপনি অন্য যাত্রীদের সচেতন করবেন না। শুধু নারী হিসেবে আমাকে সচেতন করে তো নিরাপত্তা দেয়া যাবে না," তিনি বলেন।

এধরণের কর্মকাণ্ড চালক এবং হেলপারদের অপরাধ করতে উৎসাহিত করবে বলেও মনে করেন সাজেদা হক।

তিনি বলেন, কোন ঘটনা ঘটলে নারীকে দোষারোপের সুযোগ পাবে তারা।

"তারা বলবে যে আপনার তো সতর্ক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আপনি সতর্ক হননি তাই এমনটা হয়েছে।"

সচেতনতা কার্যক্রম

এবিষয়ে পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা দায় এড়ানোর অভিযোগটি নাকচ করেছেন।

তিনি বলেছেন, নারী ও শিশুদের প্রতি দায় এড়ানোর জন্য এই পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বরং নিজেদের পেইজ থেকে শুধু সচেতনতা তৈরির জন্যই পোস্টটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এটি সঠিকভাবে বোঝার জন্য বা ভুল ধারণা দূর করতে এরইমধ্যে পোস্টারটির কিছু অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও জানান মিস্টার রানা।

তিনি বলেন, সারা দেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনার বিরুদ্ধে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেন।

"এমনকি পুলিশের কোন সদস্য জড়িত থাকলে তাকেও ছাড় দেয়া হয় না," বলেন তিনি।

তিনি বলেন, "শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের সহযোগিতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। যার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরণের পদক্ষেপ আসবে।"

তাদের এ উদ্যোগ নারীদের প্রতি সহিংসতা ঠেকানোর মতো ইতিবাচক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তবে ভাষাগত কোন ত্রুটি থাকলে সেটিও পরিবর্তন করার কথা জানানো হয়।

তবে গণ-পরিবহনে অপরাধ ঠেকানোর জন্য সম্ভাব্য অপরাধীদের উদ্দেশ্যে কোন সতর্কবার্তা বা বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা এবিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।