তাজরীন অগ্নিকাণ্ড: ‘কেয়ামতের আগে আর মেয়েটাকে দেখতে পাবো না’

অগ্নিকান্ড

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর পরও রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে সাক্ষী হাজির করতে পারছে না বলে মামলায় অগ্রগতি নেই।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনায় করা মামলায় কয়েকদিন পর পর নতুন করে শুধু শুনানির দিনই ধার্য হচ্ছে।

আহত শ্রমিক ও নিহতদের আত্মীয়রা আজ নতুন করে আবার বিচারের দাবি তুলেছেন।

স্বজনদের বিচারের দাবি

এই একই প্রশ্ন তুলছেন আহত শ্রমিক ও স্বজন হারানো পরিবারের অনেকেই। অনেক শ্রমিক এখনো আশপাশেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। অথবা স্বজনরাও অনেকে ওই এলাকাতেই রয়েছেন।

যেখানে তাজরীন গার্মেন্টটি অবস্থিত ছিল সেই জায়গাটির নাম নিশ্চিন্তপুর।

কিন্তু ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যাবেলায় সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বহু মানুষের জীবন অনিশ্চিত করে দিয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া শ্রমিকদের একজন সুমাইয়া খাতুন।

তার মা আমিরন আক্তার বলছিলেন, "তখন আমরা ওই জায়গাতেই ছিলাম। আগুন নিজেরা দেখেছি। আমি ইটখোলায় কাজ করতে গেছিলাম। ইটখোলার উপর দিয়ে ধাউ ধাউ করে আগুন দেখা যাচ্ছিলো। দৌড়ে এসে দেখি কারখানা থেকে কেউ নামতে পারছে না।"

তিনি বলছেন, তার মেয়েই তার সংসার চালাত। এখন মেয়ের ছবি দেখে মাঝে মাঝে চোখের পানি ফেলেন।

তাজরীন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সেই সন্ধ্যায় প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন।

যারা মারা গেছেন, তাদের অনেকেই আগুনে দগ্ধ হয়ে অথবা ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছেন।

ফ্যাক্টরি

ছবির উৎস, STR

ছবির ক্যাপশান, ফ্যাক্টরির নিচে দরজায় তালা লাগানো ছিল বলে অনেকেই পালাতে পারেননি এমন অভিযোগ রয়েছে।

নিচে মুল দরজায় তালা লাগানো ছিল বলে অনেকেই পালাতে পারেননি এমন অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই সেদিন ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন।

যাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচেননি। পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়েছে অনেককে।

হাওয়া বেগম তাজরীন গার্মেন্টসে হেল্পারের কাজ করতেন। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে সেদিন গুরুতর আহত হন।

আরো পড়ুন:

কিন্তু একই কারখানায় কর্মরত তার মেয়ে মেশিন অপারেটর মৌসুমি সেদিন ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।

মেয়ের সাথে তার শেষ সাক্ষাতের স্মৃতি মনে করে এই ঘটনার বিচারের দাবি করেছেন হাওয়া বেগম।

তিনি বলছেন, "লাঞ্চে যখন ছুটি দেয় তখন বাসায় এসে মা-বেটি একসাথে খেয়ে অফিসে ঢুকছি। তারপর ওই ঘটনা যখন ঘটে আমার মেয়ে পাঁচতলায় কাজ করতো আর আমি ছয়তলায়। মেয়ের সাথে আমার আর দেখা হয় নাই। কেয়ামত পর্যন্ত তার সাথে আমার আর দেখা হবে না।"

তিনি বলছেন, "যদি তালাটা না লাগানো থাকতো, অনেকেই হয়ত বাঁচত। আমার মেয়েটাও হয়ত যেকোনো প্রকারেই হোক বের হতে পারতো। একটা দুটো মানুষ না। অতগুলো মানুষ। চোর যদি চুরি করে তাকে তো সাজা-শাস্তি দেয়া হয়। আর এটাতো চুরি না। এটা মারাত্মক। আমার যেমন বুক খালি হইছে, আমার মতো আরও কত মানুষের স্বামী সন্তান গেছে।"

অনেকে জানালার শিক ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

ছবির উৎস, Probal Rashid

ছবির ক্যাপশান, অনেকে জানালার শিক ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

সাক্ষী হাজির করা কেন সম্ভব হচ্ছে না?

অগ্নিকাণ্ডের পর আশুলিয়া থানায় করা মামলার তদন্ত শেষে এর অভিযোগ পত্র দাখিল হয় পরের বছর ডিসেম্বরে।

তারও প্রায় দুই বছর পর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্যাক্টরির মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

গত চার বছরে ৩৫ বার মামলার শুনানির তারিখ ধার্য হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় মামলায় কোন অগ্রগতি নেই।

তাদের বক্তব্য, সাক্ষীদের প্রতি পাঠানো সমন তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু কী তার কারণ?

সমন পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আশুলিয়া থানা পুলিশের। জানতে চেয়েছিলাম আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল হকের কাছে।

তিনি বলছেন, "ধরেন এখানে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক ছিল। ঘটনার সেই সময় সে এইখানে চাকরী করতো। তখন সে এই মামলার সাক্ষী হয়েছে। এখন সে এখান থেকে চলে গেছে। তাদের বর্তমান ঠিকানা ধরে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।"

তিনি আরও বলছেন, "সেক্ষেত্রে তার স্থায়ী ঠিকানায় সমন জারী করার দায়িত্ব সেই এলাকার থানার। তারা স্থায়ী ঠিকানায় যখন সমন পাঠাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে দূরবর্তী স্থান হয়ত কেউ কুড়িগ্রাম, কেউ ঠাকুরগাঁও থেকে নাও আসতে পারে।"

স্বজন

ছবির উৎস, Probal Rashid

ছবির ক্যাপশান, আহত শ্রমিক ও স্বজন হারানো পরিবারের অনেকেই আজ আবারো বিচারের দাবি তুলেছেন।

তিনি বলছেন, তাদের কাছে যেসব সমন এসেছে সেগুলো তারা ঠিকমতোই পাঠিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন কয়েকজন সাক্ষী তারা হাজিরও করেছেন।

সমন পৌঁছানোর জটিলতা মানছেন না শ্রমিক নেতারা

এই মামলায় সাক্ষীর সংখ্যা মোট ১০৪ জন। যাদের বেশিরভাগই সেসময় তাজরীন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিক। এর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ছয়জনকে হাজির করা সম্ভব হয়েছে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিকদের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকলে পুলিশ কেন সমন পৌছাতে পারছে না?

তিনি বলছেন, "আজকেও অগ্নিকাণ্ডের বার্ষিকীতে বহু শ্রমিক এসেছিলো সেখানে। তাজরীনের শ্রমিকদের অনেকের সাথে আমাদেরও ভালো যোগাযোগ আছে। শুধু আমরা না আপনিও যদি চান আপনার পক্ষেও তাজরীনের একশ শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেয়া সম্ভব। এখন কেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বা আশুলিয়ার পুলিশ সমন গুলো সাক্ষীদের পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না, সেটা আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।"

অন্যান্য খবর: