এবার গোটা ভারতেই এনআরসি চাইছে বিজেপি সরকার

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারত সরকার এবার সারা দেশ জুড়ে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরির কাজ শুরু করবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে এ কথা ঘোষণা করার পর তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অমিত শাহ জানিয়েছেন, সারা দেশের সঙ্গে আসামেও আবার এই তালিকা করা হবে - এবং আসামের বিজেপি সরকারও বলছে তারা চায় আগের এনআরসি বাতিল করা হোক।
সরকার যদিও আশ্বাস দিচ্ছে সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করা হলেও তাতে কোনও ধর্মের মানুষদেরই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই; মুসলিম এমপিরা অনেকেই কিন্তু তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
মমতা ব্যানার্জির মতো কোনও কোনও বিরোধী নেত্রী আবার সাফ জানাচ্ছেন, তাদের রাজ্যে এনআরসি করতেই দেওয়া হবে না।
বস্তুত আসামে মাসতিনেক আগে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একই ধরনের কর্মসূচি নেওয়ার দাবি উঠছে অথবা এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু বুধবার পার্লামেন্টে বিজেপি এমপি স্বপন দাশগুপ্তর এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়ে দিয়েছেন, আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন রাজ্যে নয় - সরকার এবার গোটা ভারতেই এক সঙ্গে এনআরসি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি জানান, "এনআরসি প্রক্রিয়া এবার সারা দেশেই হবে - আর স্বভাবতই এর ফলে আসামেও সেটা নতুন করে আবার করতে হবে।"
"তবে এখানে আমি আবার একটা জিনিস স্পষ্ট করে বলতে চাই, এতে কোনও ধর্মের মানুষেরই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই - কারণ বৈধ নাগরিকরা যাতে এই তালিকাভুক্ত হতে পারেন তার সব ব্যবস্থাই থাকবে।"
বিরোধী কংগ্রেসের মুসলিম এমপি সৈয়দ নাসির হুসেন অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অমিত শাহ এর আগে বারবার বলেছেন এনআরসিতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই - কিন্তু কখনওই মুসলিমদের নাম নেননি।
ফলে মুসলিমদের এটা নিয়ে ভয় পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক বলেই মি হুসেনের অভিমত।

ছবির উৎস, সৈয়দ নাসির হুসেন / টুইটার
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরএসএন সিং আবার যুক্তি দিচ্ছেন, ভারতব্যাপী এনআরসি হলেও সেটাকে কখনোই ধর্মের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়।
মি সিং বিবিসিকে বলছিলেন, "এটা তো একটা জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপ - এটা নিয়ে আপত্তি যে কীসের আমার তো সেটাই বোধগম্য নয়।"
"বৈধ নাগরিকরা এদেশে থাকতে পারবে, বাকিদের নিজের রাস্তা খুঁজে নিতে হবে - এটাই সোজা কথা!"
"ধর্মীয় নির্যাতনের শিকারদের কথা আলাদা, কিন্তু এটাও তো ভাবতে হবে যারা অবৈধভাবে এদেশে ঢুকে পড়েছে তাদের বোঝা আর আমরা কতদিন টানব?"
এদিকে অমিত শাহের ঘোষণার ঘন্টাকয়েকের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে এক জনসভায় গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি অন্তত কিছুতেই এনআরসি হতে দেবেন না।

ছবির উৎস, Getty Images
মিস ব্যানার্জি মুর্শিদাবাদে বলেন, "বাইরের কিছু লোক বদমায়েশি করে নানাভাবে এনআরসির নাম নিয়ে আপনাদের উত্যক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।"
"কিন্তু আপনারা মাথায় রাখবেন বাইরের আমদানি করা নেতাদের কথায় কান দেওয়ার কোনও দরকার নেই!"
"আমরা যারা এই মাটিতে থেকে লড়াই করছি তারা আপনাদের পাশে আছি - আর আমরা কিছুতেই এই বাংলায় এনআরসি হতে দেব না, দেব না!" বলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে প্রশ্ন উঠছে কেন আসামেও সরকার এখন নতুন করে আবার এনআরসি করার কথা বলছে?
এর পেছনে একটা বড় কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে সেখানে প্রকাশিত তালিকায় লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুর নাম বাদ পড়া - যা রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
আসামের প্রভাবশালী বিজেপি মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বলেছেন, "আমরা চাই এখনকার এনআরসি বাতিল করে দিয়ে আসামকেও গোটা দেশের সঙ্গে নতুন এনআরসি প্রক্রিয়াতে সামিল করা হোক।"
"আর সেখানেও বাংলাদেশ থেকে কোন সালের মধ্যে ভারতে আসা লোকজনের দাবি গ্রাহ্য হবে, সেই কাট-অফ ডেটটাও সারা দেশের জন্য একটাই থাকুক।"
পর্যবেক্ষকরাও মনে করছেন, হিন্দুদের আশঙ্কা দূর করে কথিত অবৈধ বিদেশি তাড়ানোর সফল হাতিয়ার হিসেবেই এখন এনআরসিকে নতুন মোড়কে পেশ করতে চাইছে সরকার।
আর এই পটভূমিতেই আগামিকাল (শুক্রবার) কলকাতার টেস্ট ম্যাচে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার - যার সরকার এনআরসিকে আগাগোড়া ভারতের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' বলেই বর্ণনা করে আসছে।








