সিটি কর্পোরেশন থেকে কী কী সেবা পাবে জনগণ

ছবির উৎস, Google
চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করার পর থেকে সিটি কর্পোরেশনগুলোর দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজধানী ঢাকার সব এলাকার বাসিন্দারা।
দুই সিটি মেয়রই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন ধরণের মন্তব্যের কারণে ট্রলের শিকার হয়েছেন।
শুধু মশা নিধন নয়, সিটি কর্পোরেশনের আরো অনেক দায়িত্ব রয়েছে নাগরিকদের সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে।
দেখে নেয়া যেতে পারে জনগণ কী কী ধরণের সেবা সিটি কর্পোরেশন থেকে পেতে পারেন।
ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ওয়েব সাইটে গিয়ে তাদের সেবা দেয়ার তালিকা থেকে আলাদা তথ্য জানা যায়।
এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ১৪টি খাতে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ১৮টি খাতে সেবা দেয়ার তথ্য উল্লেখ করেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে যেসব সেবার কথা জানানো হয়েছে তা হল-
রাস্তার বৈদ্যুতিক লাইট, হাসপাতাল, ডিএসসিসি হাসপাতাল, রাস্তা/নর্দমা/ফুটপাত, বাজার, জন্ম নিবন্ধন, ভস্মীকরণ সমাধির স্থান, ব্যায়ামাগার, কমিউনিটি সেন্টার, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, রাস্তার গাড়ি পার্কিং, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার, সঙ্গীত এবং স্কুল, বাসি টার্মিনাল, পাবলিক টয়লেট, পার্ক এবং খেলার মাঠ বিষয়ক সেবা দেয়ার কথা জানানো হয়েছে।
আরো পড়ুন:
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে যেসব সেবার উল্লেখ আছে তা হল-
রাস্তা খননের অনুমতি, নতুন হোল্ডিং নম্বর, হোল্ডিং ট্যাক্স সার্ভিস কার্যপ্রণালী, হোল্ডিংয়ের নামজারী, ডিএএমএফএ, ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়ন পদ্ধতি, জন্ম সনদ, কবরস্থান ব্যবস্থাপনা, ধূমপান মুক্ত-করন নির্দেশিকা, যান-যন্ত্রপাতি ভাড়ার হার ও নিয়মাবলী, কমিউনিটি সেন্টার বুকিং, বহুতল ভবনের জন্য অনাপত্তিপত্র, জিআইএস ম্যাপ ক্রয়, উদ্যোক্তাদের সেবা কেন্দ্র।
এদিকে সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের কাজের পরিধির মধ্যে যেসব কাজের উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর বিভিন্ন ভাগ ও উপ-ভাগ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
১. জনস্বাস্থ্য
কর্পোরেশন নগরীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দায়ী থাকবে এ সম্পর্কিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার থাকলে সেটিও গ্রহণ করতে হবে।
এর মধ্যে আরো যেসব বিষয় রয়েছে তা হল, অস্বাস্থ্যকর ইমারতের ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ গ্রহণ, আবর্জনা অপসারণ, সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপনা, পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত পায়খানা স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা করবে কর্পোরেশন।

ছবির উৎস, Getty Images
২. জন্ম, মৃত্যু এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি
কর্পোরেশনের সীমানার মধ্যে যে সব জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ে হয় সেগুলো বিধান অনুসরণ করে রেজিস্ট্রি এবং এর পরিসংখ্যান ও উপাত্ত সংগ্রহ করা।
৩. সংক্রামক ব্যাধি
নগরীতে সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, এর জন্য প্রয়োজনে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৪. স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন ইত্যাদি
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা, নারী-শিশু-কিশোরদের জন্য কল্যাণকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন
কর্পোরেশন স্বাস্থ্যমূলক শিক্ষাসহ জনস্বাস্থ্যের উন্নতির বিধান কল্পে প্রয়োজনীয় যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৬. হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি
কর্পোরেশন নগরবাসীর চিকিৎসার সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
৭. চিকিৎসা, সাহায্য ও স্বাস্থ্যশিক্ষা
প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সাহায্য ইউনিট স্থাপন ও পরিচালনা, চিকিৎসা বিদ্যার উন্নয়ন, স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও সিটি কর্পোরেশনের কাজের আওতাধীন।
৮. পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশন প্রণালী
এর আওতায় পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছাড়াও স্নান ও ধৌত করার স্থান, ধোপী ঘাট এবং ধোপা, সরকারি জলাধার ইত্যাদি কর্পোরেশনের আওতাধীন থাকবে।
৯. রাস্তা
কর্পোরেশন নগরের অধিবাসী এবং নগরীতে আগন্তুকদের আরাম ও সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা এবং অন্যান্য যোগাযোগরে ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
এগুলো ছাড়াও সিটি কর্পোরেশনে আইনে সব মিলিয়ে এই কর্পোরেশনের মোট ২৮ ধরণের কাজের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো নাগরিকরা তাদের সুবিধার জন্য পেতে পারেন।
৩৮% লোকবল নিয়ে চলছে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন বলেন, "একটা বাচ্চা যখন জন্ম নেয় তখন তার বার্থ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে তার জীবন শেষে মৃত্যুর সার্টিফিকেটও সিটি কর্পোরেশন ইস্যু করে থাকে। এর মাঝে তার ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে স্তরে সিটি কর্পোরেশনের নানা কাজ রয়েছে।"
"নাগরিক সুবিধার তালিকা আসলে এক বাক্যে বলে শেষ করা সম্ভব নয়," বলেন মিস্টার খোকন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, ফোকাস বাংলা (ফাইল ছবি)
তিনি বলেন, নাগরিক সুবিধার যে বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ দুর্ভোগ পোহায় সেগুলোই আলোচনায় আসে। বাকিগুলো আসলে মানুষের আলোচনায় আসে না।
নাগরিক জীবনের এসব সুবিধা পূরণ করতে গেলে নানা ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কথা জানান মিস্টার খোকন।
"ফুটপাত যে দখল করে আছে তাকে তুলে দিতে হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়," তিনি বলেন।
তবে সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে সিটি কর্পোরেশন কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মেয়র মি. খোকন বলেন, এই মুহূর্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৩৮% লোকবল নিয়ে কাজ করছে।
তবে কিছুদিন আগে জনবল কাঠামো অনুমোদিত হয়েছে এবং শিগগিরই লোকবল নিয়োগ শুরু হবে বলেও জানান দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।
পরিপূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে না নাগরিকরা
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. সারওয়ার জাহান বলেন, নাগরিক সুবিধার অনেক কিছুই পূরণ হচ্ছে না।
উদাহরণ হিসেবে আবর্জনা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরেন মি. জাহান।
তিনি বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে বেসরকারি উদ্যোগে আবর্জনা সংগ্রহের কাজটি চলছে। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার কাজ করছে সিটি কর্পোরেশন।
"তবে সেখানেও ৭৫% কাজ হলেও ২৫% কাজ বাকি থেকে যাচ্ছে," তিনি বলেন।
এছাড়া নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, খেলার মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনাও সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে থাকলেও সেগুলোও ঠিকমত পালিত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মি. জাহান।
তবে এর পেছনে কারণ হিসেবে তিনি শুধু সিটি কর্পোরেশনকে এক তরফা ভাবে দায়ী করতে চান না।
তিনি বলেন, "আমি বলছি না যে, সিটি কর্পোরেশনের দায়ভার নেই। মূল দায়টা তাদের। তবে এখানে আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা সিটি কর্পোরেশনকে তার কাজ করতে অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ দেয় না।"
এক্ষেত্রে তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন অংশ বিশেষ করে নগর পরিচালনার সাথে জড়িত নানা বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়ের সাথে সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ের অভাব একটি বড় কারণ।
এছাড়া সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকারের আওতায় হওয়ার কারণে কিছুটা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।
"আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ক্ষমতায়ন করা হয়নি," মি. জাহান বলেন।
তিনি বলেন, "স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি এর জবাবদিহিতারও ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে নাগরিক সেবা সুনিশ্চিত করা যাবে না।"








