লেবানন: হোয়্যাটস্ অ্যাপ কর নিয়ে যে বিক্ষোভের শুরু

কয়েক সপ্তাহ ধরে লেবাননে চলছে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এতো বড় বিক্ষোভ হয়নি সেখানে। ইতোমধ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন।
কিন্তু তাতেও শান্ত হননি বিক্ষোভকারীরা। তারা দেশের রুগ্ন অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির অবসান চান।
বিক্ষোভকারীরা দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়।
ধর্মের ভিত্তিতে ক্ষমতার ভাগাভাগির যে ব্যবস্থা দেশটিতে এখন রয়েছে, সেটির পরিবর্তন চায় তারা।
দাবানল এবং হোয়্যাটসঅ্যাপ ট্যাক্স
লেবাননের জন্য অক্টোবর মাস বেশ ঘটনাবহুল ছিল। সরকারও একের পর এক সমস্যা নিয়ে নাকাল হচ্ছিল।
শুরুতে লেবাননের আমদানিকারকরা অভিযোগ করেন, দেশটির বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে মার্কিন ডলারের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
ফলে লেবানিজ পাউন্ড ডলারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না।
গম এবং জ্বালানি আমদানিকারকরা যখন দাবি তোলেন যে তাদের ডলারে অর্থ শোধ করতে হবে, তখন দেশটির পেট্রল স্টেশন এবং বেকারি শিল্প ধর্মঘটে চলে যায়।

ছবির উৎস, EPA
১৪ই অক্টোবর দেশটির পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয় ভয়ানক দাবানল, এবং দেখা যায় আগুন নেভানোর জন্য লেবাননের যথেষ্ট অর্থ ও সরঞ্জামাদি নেই।
সে সময় পার্শ্ববর্তী সাইপ্রাস, গ্রীস এবং জর্ডান আগুন নেভাতে এগিয়ে আসে।
দেশটির সামাজিক মাধ্যমে তখন সরকারের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দেশের দাঙ্গা পুলিশের গাড়ি কিংবা জল কামান কখনো বিকল হয় না, তাহলে অগ্নি-নির্বাপণ হেলিকপ্টার কেন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিকল হয়ে গেলো?
এর কয়েকদিন পরেই সরকার তামাক, পেট্রল এবং হোয়্যাটসঅ্যাপ-এর মতো মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমে ভয়েস কলের ওপর কর বাড়িয়ে দেয়।
সরকার প্রস্তাব করেছে, হোয়্যাটসঅ্যাপস ব্যবহার করতে মাসে ছয় মার্কিন ডলার দিতে হবে।
এই ঘোষণার পরই বৈরুতে বিক্ষোভ শুরু হয়।

ছবির উৎস, Reuters
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরকার কর প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে বছরের পর বছর ধরে চলা অসন্তোষ নতুন করে উঠে আসে।
পরদিন প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পদত্যাগের দাবিতে লেবাননের হাজার-হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে যোগ দেয়।
মূলত তখন থেকেই লক্ষ-লক্ষ মানুষ বিক্ষোভে সামিল হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এবং ব্যাংকসমূহ বন্ধ রয়েছে।
এই জনরোষের কারণ কী?
লেবানন তার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এখন।
দেশটির ঋণের ভার ক্রমে বাড়ছে, তবু আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়ে সরকার নানান অর্থনৈতিক সংস্কার করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষেরা বলছেন, সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণীর বলি হিসেবে তারা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
জিডিপি ও বৈদেশিক ঋণের অনুপাতের হিসাবে লেবানন এই মূহুর্তে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশ।
দেশটির সরকারি হিসাবে দেখা যায়, তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ৩৭ শতাংশ, সার্বিক বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির এক তৃতীয়াংশ জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে।
সেই সঙ্গে সম্প্রতি দেশটিতে মুদ্রার আরেক দফা অবমূল্যায়ন হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।

এছাড়া সাধারণ সেবা পেতেও ভোগান্তির শেষ নেই। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং ইন্টারনেটের ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের।
১৯৭৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশটির অবকাঠামো পুনর্গঠন শেষ হয়নি।
এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী সিরিয়া থেকে দশ লাখের বেশি শরণার্থী এসেছে দেশটিতে। এই সব কিছু মিলিয়ে দেশটিতে একটু-একটু করে অসন্তোষ তৈরি।
সরকার কেন সমস্যাসমাধান করতে পারছে না?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন এর পেছনে বড় কারণ ধর্মীয় বিভেদ।
লেবাননে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮টি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে---চারটি মুসলিম, ১২টি খ্রিস্টান, দ্রুজ সম্প্রদায় এবং ইহুদি ধর্মমত।
১৯৪৩ সালের এক জাতীয় ঐকমত্য অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি পদ সংখ্যাগুরু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে।
আরো পড়ুন:
রাষ্ট্রপতি সবসময় হবেন একজন ম্যারোনাইট খিস্ট্রান অর্থাৎ বিশেষ গোষ্ঠীর সিরিয় খ্রিস্টান। পার্লামেন্টের স্পীকার হবেন একজন শিয়া মুসলিম এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলমান।
পার্লামেন্টের ১২৮টি আসনও সমানভাবে খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়।
১৯৮৯ সালে গৃহযুদ্ধ অবসানের পরেও এই ব্যবস্থা বহাল আছে।
দেশটির এই ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে প্রায়শই অন্য দেশের টার্গেট হয়ে ওঠে লেবানন।
যেমন লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হেযবোল্লাকে ইরান পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, যে গোষ্ঠীটি মূলত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সরাসরি জড়িত। হেযবোল্লা লেবাননের ক্ষমতা কাঠামোতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করতে গিয়ে, প্রায়শই সুশাসনের ব্যপারে ছাড় দিতে হয় রাজনৈতিক নেতাদের।
সুশাসন ছাড়া দারিদ্র দূরীকরণ, দুর্নীতি রোধ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
বিক্ষোভ কি নতুন?
লেবাননে বিক্ষোভ নতুন নয়। কিন্তু শেষবার এরকম বড় বিক্ষোভ হয়েছিল ২০০৫ সালে বোমা হামলায় সাদ হারিরির বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি নিহত হবার পর।
কিন্তু এবারের আন্দোলন কিছুটা ব্যতিক্রমী।
এবারের আন্দোলন একেবারে তৃণমূল থেকে উঠে এসেছে, এবং তাদের নির্দিষ্ট কোন নেতা নেই।
কেবল সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতার দাবি তুলছেন না তারা, নিজ নিজ ধর্মীয় ধর্মীয় গোষ্ঠীকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।








