তুরস্কের অভিযানের শিকার কুর্দি জনগোষ্ঠী কারা?

মেসোপটেমিয়ান সমতল ভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের একটি নৃতাত্বিক গোষ্ঠী কুর্দিরা

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, মেসোপটেমিয়ান সমতল ভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের একটি নৃতাত্বিক গোষ্ঠী কুর্দিরা

কুর্দি মিলিশিয়াদের হটিয়ে 'সেইফ জোন' বা নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্কের সেনাবাহিনী ৯ই অক্টোবর উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় অভিযান শুরু করে।

সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন এই অভিযানের ফলে স্থানীয় কুর্দি নাগরিকরা জাতিগত সহিংসতার শিকার হতে পারেন এবং এর ফলে ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীরও পুনরুত্থান ঘটতে পারে।

কিন্তু এই কুর্দিরা আসলে কারা? তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ান কেন সীমান্তে 'সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পথ বন্ধ' করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?

কুর্দিরা কোথা থেকে এলো?

মেসোপটেমিয়ান সমতল ভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের একটি নৃতাত্বিক গোষ্ঠী এই কুর্দিরা। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক, উত্তর-পূর্ব সিরিয়া, উত্তর ইরাক, উত্তর-পশ্চিম ইরান এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আর্মেনিয়া অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে রয়েছে।

আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি কুর্দি এসব পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। মধ্যপ্রাচ্যের চতুর্থ বৃহত্তম নৃতাত্বিক গোষ্ঠী তারা।

কিন্তু এই কুর্দিরা কখনো স্থায়ী একটি রাষ্ট্র পায়নি।

আরো পড়ুন:

কুর্দিরা কখনো স্থায়ী একটি রাষ্ট্র পায়নি

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, কুর্দিরা কখনো স্থায়ী একটি রাষ্ট্র পায়নি

বর্তমানে তাদের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সম্প্রদায় রয়েছে। জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তারা একরকম হলেও তাদের ভাষার কোনো স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গী নেই।

কুর্দিদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম এবং উপগোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেও তাদের সিংহভাগ সুন্নি মুসলিম।

কুর্দিদের কোনো রাষ্ট্র নেই কেন?

বিংশ শতকের শুরুর দিকে কুর্দিদের অনেকে নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করে - যেটি কুর্দিস্তান হিসেবে পরিচিত হবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যুদ্ধ জয়ী পশ্চিমা জোট ১৯২০ সালের সেভর্ চুক্তি অনুযায়ী কুর্দিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের ব্যবস্থা নেয়।

তবে তিন বছর পরই ঐ সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায় যখন লুসান চুক্তি অনুসারে আধুনিক তুরস্কের সীমানা নির্ধারিত হয় এবং কুর্দিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয় না। কুর্দিরা তখন নিজ নিজ দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য হয়।

পরের ৮০ বছরে নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য কুর্দিদের নেয়া প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাকেই নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়।

পিকেকে নেতা আবদুল্লাহ ওচালানকে ১৯৯৯ সাল থেকে কারাবন্দী করে রেখেছে তুরস্ক

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, পিকেকে নেতা আবদুল্লাহ ওচালানকে ১৯৯৯ সাল থেকে কারাবন্দী করে রেখেছে তুরস্ক

তুরস্ক কেন কুর্দিদের হুমকি মনে করে?

তুরস্ক এবং সেদেশের কুর্দিদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাসটা অনেক পুরনো।

তুরস্কের জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০ ভাগ জাতিগতভাবে কুর্দি।

কয়েক প্রজন্ম ধরে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ কুর্দিদের বিষয়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করেছে।

১৯২০ এবং ১৯৩০'এর দশকে কুর্দিদের বিক্ষোভের উত্থানের সময় অনেক কুর্দি পুনর্বাসিত হয়, কুর্দি নাম এবং পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, কুর্দি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়, এমনকি কুর্দিদের যে একটি আলাদা জাতিগত পরিচয় আছে সেটিও অস্বীকার করা হয়।

কুর্দিদের সেসময় বলা হতো 'পাহাড়ি তুর্কি।'

১৯৭৮ সালে আবদুল্লাহ ওচালান পিকেকে গঠন করেন, যাদের প্রধান দাবি ছিল তুরস্কের মধ্যে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র গঠন।

ছয় বছর পর সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে ঐ সংগঠনটি। সেসময় থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লক্ষ লক্ষ কুর্দি বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

পিকেকে ১৯৮৪ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করার পর থেকে ৪০ হাজারের বেশি কুর্দি নিহত হয়েছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, পিকেকে ১৯৮৪ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করার পর থেকে ৪০ হাজারের বেশি কুর্দি নিহত হয়েছে

১৯৯০'এর দশকে পিকেকে স্বাধীনতার দাবি বাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন চালায়। তবে সেসময়ও সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে তারা।

২০১৩ সালে গোপন আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় আসে তারা।

২০১৫ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধবিরতি অকার্যকর হয়ে পড়ে যখন সিরিয়ার সীমান্তের কাছে কুর্দি অধ্যূষিত শহর সুরুকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩৩ জন তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট নিহত হয়। ইসলামিক স্টেটকে ঐ বোমা হামলার জন্য দায়ী মনে করা হয়।

সেসময় পিকেকে তুরস্কের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তার অভিযোগ আনে এবং তুরস্কের সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

এর ধারাবাহিকতায় তুরস্কের সরকার পিকেকে এবং আইএস'এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, যেটিকে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমন্বিত যুদ্ধ' বলে দাবি করা হয়।

সেসময় থেকে হাজার হাজার মানুষ - যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন - দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে হওয়া সংঘাতে নিহত হয়েছেন।

অগাস্ট ২০১৬ থেকে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সেনা উপস্থিতি অব্যাহত রেখেছে তুরস্ক। সেসময় সীমান্তের ওপারে সেনাসদস্য ও ট্যাঙ্ক পাঠিয়ে ঐ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর জারাব্লুস দখল করে তুর্কি বাহিনী।

এর ফলে কুর্দি বিদ্রোহী বাহিনী ওয়াইপিজি'র নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স ঐ অঞ্চলের দখল নিতে ব্যর্থ হয় এবং আফ্রিন শহরের কুর্দি ঘাঁটির সাথে যুক্ত হয়।

২০১৮ সালে তুরস্কের বাহিনী এবং তাদের সাথে একজোট থাকা সিরিয়ান বিদ্রোহীরা আফ্রিন থেকে ওয়াইপিজি'র যোদ্ধাদের উৎখাত করে। সেসময় অনেক বেসামরিক নাগরিক মারা যায় এবং হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়।

তুরস্কের সরকারের ভাষ্যমতে, ওয়াইপিজি এবং পিওয়াইডি সাবেক পিকেকে'র সাথে সম্পৃক্ত সংস্থা এবং তারা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তুরস্ক সরকার দাবি করে ঐ সংগঠনগুলো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করছে এবং তাদের নির্মূল করা আবশ্যক।

তুরস্কের সেনা এবং পিকেকে'র মধ্যে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত তুরস্কের শহর সিজর (মার্চ ২০১৬)

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, তুরস্কের সেনা এবং পিকেকে'র মধ্যে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত তুরস্কের শহর সিজর (মার্চ ২০১৬)

সিরিয়ার কুর্দিরা কী চায়?

সিরিয়ার জনসংখ্যার ৭ থেকে ১০ ভাগ কুর্দি।

২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার আগে তাদের অধিকাংশের বাস ছিল দামেস্ক এবং আলোপ্পোতে। এছাড়াও উত্তর-পূর্বের শহর কামিশলি, কোবানে এবং আফ্রিন শহরেও তাদের কিছু অংশ বসবাস করতো।

সিরিয়ার কুর্দিরাও দীর্ঘ সময় ধরে অত্যাচারিত এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

১৯৬০'এর দশক থেকে প্রায় ৩ লাখ কুর্দিকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি এবং তাদের জমি অধিগ্রহণ করে ঐসব কুর্দি অঞ্চলকে 'আরব অধ্যূষিত' অঞ্চলে পরিণত করার জন্য আরবদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে হওয়া অভ্যুত্থান যখন গৃহযুদ্ধে পরিণত হয় তখন প্রধান কুর্দি দলগুলো কোনো পক্ষ নেয়নি।

২০১২'র মাঝামাঝি সময়ে দেশের অন্যান্য জায়গায় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সেসব কুর্দি অধ্যূষিত অঞ্চল থেকে সরকারি বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়, যার ফলে কুর্দি দলগুলো সেসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

২০১৪'র জানুয়ারিতে প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টি (ওয়াইপিডি) সহ অন্যান্য কুর্দি দলগুলো আফ্রিন, কোবানে এবং জাযিরা'র তিনটি বিভক্ত প্রদেশে 'স্বায়ত্বশাসিত প্রশাসন' প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেয়।

মার্চ ২০১৬'তে তারা আইএস'এর দখলে থাকা কয়েকটি আরব এবং তুর্কি এলাকা নিয়ে 'যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা' প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।

ঐ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে সিরিয়ার সরকার, সিরিয়ার বিরোধী দল, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র।

আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিল ওয়াইপিজি

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিল ওয়াইপিজি

পিওয়াইডি'র দাবি, তারা স্বাধীনতা চায় না, কিন্তু সিরিয়ায় চলমান সংঘাত নিরসনের উদ্দেশ্যে নেয়া যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় কুর্দিদের অধিকার এবং স্বায়ত্বশাসনের বিষয়টি যেন গুরুত্ব পায় তা নিশ্চিত করতে চায়।

প্রেসিডেন্ট আসাদ আলোচনা বা যুদ্ধ, যে কোনোভাবে সিরিয়ার 'প্রতি ইঞ্চি' জায়গা পুনর্দখলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কুর্দিদের স্বায়ত্বশাসনের দাবিও নাকচ করে দিয়েছে তার সরকার।

ইরাকের কুর্দিরা কি স্বাধীনতা পাবে?

ইরাকের জনসংখ্যার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ ভাগ কুর্দি।

ঐতিহাসিকভাবে, আশেপাশের যে কোনো রাষ্ট্রে বসবাসরত কুর্দিদের চেয়ে বেশি নাগরিক অধিকার এবং সুবিধা ভোগ করেছে তারা। কিন্তু তারা অন্যদের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর অত্যাচারেরও শিকার হয়েছে।

১৯৪৬ সালে ইরাকে স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে লড়াই করার জন্য মুস্তাফা বাজরানি কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (কেডিপি) গঠন করেন। তবে তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে ১৯৬১ সাল থেকে।

৭০'এর দশকের শেষদিকে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে আরবদের পুনর্বাসন শুরু করে সরকার। বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ কিরকুক অঞ্চলের কুর্দিদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় পুনর্বাসন শুরু করা হয়।

৮০'র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এই নীতি আরো বিস্তার লাভ করে, সেসময় কুর্দিরা ইরানকে সমর্থন করে।

১৯৮৮ সালে কুর্দিদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত অভিযান শুরু করেন সাদ্দাম হুসেইন, যার অংশ হিসেবে হালাবজা অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়।

১৯৭০ সালে ইরাকের সরকার ও কেডিপি'র মধ্যে শান্তিচুক্তি হলেও তা অকার্যকর হয়ে পড়ে চার বছরের মধ্যেই

ছবির উৎস, Hulton Archive

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭০ সালে ইরাকের সরকার ও কেডিপি'র মধ্যে শান্তিচুক্তি হলেও তা অকার্যকর হয়ে পড়ে চার বছরের মধ্যেই

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যখন ইরাকের পরাজয় হয়, কুর্দি বিদ্রোহীরা তখন বাগদাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ঐ বিদ্রোহ দমনে ইরাকের কর্তৃপক্ষের নেয়া সহিংস পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোট উত্তরে 'নো ফ্লাই জোন' ঘোষণা করে যার ফলে কুর্দিরা সেসব অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

দুই পক্ষের ক্ষমতা ভাগাভাগি সংক্রান্ত একটি চুক্তি করা হলেও ১৯৯৪ সালে ইরাকের কুর্দি দলগুলো চার বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যেই আক্রমণে সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতাচ্যুত হন, ঐ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করে কুর্দিরা।

তার দু'বছর পর উত্তর ইরাকের তিনটি প্রদেশে কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (কেআরজি) প্রতিষ্ঠা করে সেসব এলাকার জোট সরকারের অংশ হয়।

সেপ্টেম্বর ২০১৭'তে কুর্দিস্তান অঞ্চলে এবং ২০১৪ সালে কুর্দি মিলিশিয়াদের দখল করা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর মানুষ একটি গণভোটে অংশ নেয়। সেসময় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এই গণভোটকে অবৈধ দাবি করে এর বিরোধিতা করে।

গণভোটে অংশ নেয়া ৩৩ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। বাগদাদ কর্তৃপক্ষ ঐ গণভোটের ফল নাকচ করার প্রস্তাব করে।

পরের মাসে ইরাকের সরকার সমর্থক বাহিনী কুর্দিদের দখলে থাকা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর দখল নেয়।

কিরকুক অঞ্চল এবং সেখানকার তেল থেকে পাওয়া আয় শেষ হয়ে যাওয়ায় কুর্দিদের নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের আশা বড় ধাক্কা খায়।

১৯৯১ সালের বিদ্রোহ দমনের পর ইরান ও তুরস্কে ১৫ লক্ষের মত কুর্দি শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ১৯৯১ সালের বিদ্রোহ দমনের পর ইরান ও তুরস্কে ১৫ লক্ষের মত কুর্দি শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়

আইএস'এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দিরা কেন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল?

২০১৩'র মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক স্টেট গ্রুপ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিনটি কুর্দি ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ঐ অঞ্চলে তাদের চালানো একের পর এক হামলা ২০১৪'র মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কুর্দি মিলিশিয়া বাহিনীগুলো প্রতিরোধ করতে থাকে।

জুন ২০১৪'তে উত্তর ইরাকে আইএস'এর আগ্রাসনের ফলে ইরাকের কুর্দিরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের সরকার এমন অঞ্চলে তাদের পেশমার্গা বাহিনী পাঠায় যেখানে ইরাকের সৈন্যদের অবস্থান ছিল না।

২০১৪ সালে আইএস আচমকা আগ্রাসন শুরু করলে বেশ কয়েকটি অঞ্চল থেকে পেশমার্গা বাহিনী সরে আসে। ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘুদের বসবাস ছিল, এমন বেশ কয়েকটি অঞ্চলের পতন হয় - যার মধ্যে একটি হলো সিঞ্জার, যেখানে হাজার হাজার ইয়াজিদিকে আইএস আটক করে রাখে এবং হত্যা করে।

ঐ আগ্রাসন থামাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী উত্তর ইরাকে বিমান হামলা চালায় এবং পেশমার্গাদের সাহায্য করতে সামরিক উপদেষ্টা পাঠায়।

২০১৭ সালে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গণভোট হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৭ সালে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গণভোট হয়

তিন দশক ধরে তুরস্কে কুর্দি স্বায়ত্বশাসনের লক্ষ্যে লড়াই করা ওয়াইপিজি এবং পিকেকে'ও তাদের সহায়তায় যোগ দেয়।

সেপ্টেম্বর ২০১৪'তে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কুর্দি শহর কোবানে'তে হামলা চালায় আইএস, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেয়।

তবে ঐ সংঘাত তুরস্কের সীমান্তের অনেক কাছে হলেও তুরস্ক আইএস ঘাঁটিতে হামলা করা বা তুরস্কের কুর্দিদের সীমানা পার করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেয়া থেকে বিরত থাকে।

২০১৫'র জানুয়ারিতে এক যুদ্ধের পর কুর্দি বাহিনী কোবানের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। ঐ যুদ্ধে অন্তত ১৬০০ মানুষ মারা যায়।

কুর্দি নেতৃত্বাধীন এসডিএফ জোট আইএস এর ঘাঁটি রাকা দখল করে ২০১৭ এর অক্টোবরে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, কুর্দি নেতৃত্বাধীন এসডিএফ জোট আইএস এর ঘাঁটি রাকা দখল করে ২০১৭ এর অক্টোবরে

মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী, সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস জোট এবং একাধিক আরব মিলিশিয়া বাহিনীকে কুর্দিরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করে সিরিয়া থেকে আইএস'কে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করতে।

এখন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় একটি ৩২ কিলোমিটার 'নিরাপদ অঞ্চল' প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করতে এবং ২০ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থীকে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে তুরস্ক কুর্দিদের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান শুরু করেছে।

এসডিএফ বলছে তারা 'যে কোনো মূল্যে' তাদের এলাকা রক্ষা করবে। আইএস'এর বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধে অর্জিত সুফলও ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে দাবি করছে এসডিএফ।

রাশিয়ার মদদপুষ্ট সিরিয়ার সরকারও দেশটির প্রত্যেকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুন:প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে জোর দিচ্ছে।